কক্সবাজারে প্রবল বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জনের মৃত্যু

আন্তর্জাতিক বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

বাংলাদেশে প্রবল বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া কক্সবাজার শহরে একইভাবে আরও ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগে থেকেই অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল এবং আজ বেলা বারটা পর্যন্ত গত চব্বিশ ঘণ্টায় কক্সবাজারে তারা ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

“মূলত অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে। বৃষ্টি কম বেশি এখনো হচ্ছে এবং আগামী দুই থেকে তিন দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোঃ আব্দুল হান্নান।

সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরের যেসব জায়গায় পাহাড়ধসের ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেখানে পাহাড় কেটে গর্ত করে ঘর তৈরি করে নতুন আসা কিছু রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল।

“ক্যাম্পের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক করা হচ্ছিল। অনেককে সরানোও হয়েছে। রাতে ভারী বর্ষণের সময় তিনটি জায়গায় পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে যেখানে পাহাড়ের গর্তে থাকা লোকজন চাপা পড়েছে,” দুর্ঘটনার পর ক্যাম্প- ১১ পরিদর্শন করে আসার পর বলছিলেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার ডলার ত্রিপুরা জানিয়েছেন, ক্যাম্প এলাকায় পাহাড়ের ঢালু জায়গাগুলোতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ভোর নাগাদ তারা উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করেছেন।

পাহাড় ধস কখন হলো

মিয়ানমারে ২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন শুরু হলে প্রায় সাড়ে সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

গত এক বছরেও বিভিন্ন পথে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আর কোনও রোহিঙ্গা আশ্রয় না দেয়ার নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ থামানো যায়নি।

দুর্ঘটনা কেন হলো

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, শরণার্থী শিবিরগুলোর যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেসব জায়গা থেকে আগেও রোহিঙ্গাদের সরানো হয়েছিল।

“কিন্তু নতুন আসা রোহিঙ্গারা আবার এসব জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় স্থানীয়রা পাহাড়ের মাটি কেটে ঘর বানিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাড়া দিয়েছে। আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে গত কয়েকদিন ধরে সতর্ক করেছি। রাতে ব্যাপক ভারী বৃষ্টি হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

দুর্ঘটনাস্থলগুলোর ক্যাম্প- ১১ পরিদর্শন করে এসে মি. রহমান জানিয়েছেন সেই ক্যাম্পেই চার জন মারা গেছে।

“প্রশাসন থেকে আমরা গত কয়েকদিন ধরে সতর্ক করেছি। অনেককে সরানো হয়েছে। এখানে ৯, ১০, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ক্যাম্প ঝুঁকিপূর্ণ। বলতে পারেন মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যোগ হয়েছে। সব জায়গায় পাহাড় কেটে গর্ত বানিয়ে ঘর করা হয়েছে। এগুলোই পাহাড়ধসে চাপা পড়েছে,” বলছিলেন তিনি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আখতারও পাহাড়ধসের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনিও জানিয়েছেন, বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধস হয়েই ঘরগুলো চাপা পড়েছে।

আবহাওয়া আজ কেমন, পূর্বাভাস কী

নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও হতে পারে ভারী বৃষ্টি, বয়ে যেতে পারে ঝড়ো হাওয়া।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলছেন, আজ সকাল পর্যন্ত ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। পরে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৭ মিলিমিটারে।

“স্থল নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কক্সবাজার এলাকায় এখনো কম বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। আগামী দুই তিন দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তিনি জানান যে, বৈরি আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

ঢাকায় আবহাওয়া অফিস থেকে শুক্রবারই দেশের ছয় বিভাগে কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টিরও সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছিল।

ওদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর আজ সকাল ৯টা থেকে আগামী ১০ই জুলাই পর্যন্ত পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার যে পূর্বাভাস দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় আছে।

এতে বলা হয়েছে ৬ই জুলাই দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। আগামীকাল থেকে ১০ই জুলাই পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। সুত্র:বিবিসি ছবি: উবায়দুল হক চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *