ওয়াশিংটনের ক্ষমতার সমীকরণে পরিবর্তন, ইরান ইস্যুতে বাড়তে পারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে ধরাশায়ী করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। এই নির্বাচনী ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি মার্কিন জনগণের বড় ধরনের প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছে ইরান। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের দাবি, মার্কিন জনগণ কার্যত যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ লিখেছেন, ‘বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে, মার্কিনিরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। আমরা এই বার্তাকে সমর্থন করি।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আন্তর্জাতিক প্রভু ও ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থ রক্ষায় নিজেদের জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে তাদের বুঝতে হবে, ইরানের ‘না’ বলার পরিণতি হবে এক দুঃস্বপ্ন।
গালিবাফের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফলকে ইরান নিজেদের অবস্থানের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। বিশেষ করে তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ রয়েছে—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ইরান।
ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের এই বিজয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে আগামী দিনগুলোতে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ট্রাম্পকে বিরোধী দলের কঠোর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক অসন্তোষ, যুদ্ধনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। সামরিক সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে বিতর্ক আরও জোরালো হতে পারে।
ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক ব্যয় ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর বাড়তি নজরদারি চালাতে পারে। একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের দাবিও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলেই যে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাননীতি পুরোপুরি বদলে যাবে, এমনটি নিশ্চিত নয়। ইরান প্রশ্নে ডেমোক্রেটদের অবস্থানও একরকম নয়। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতি কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করবে নতুন কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর।
নির্বাচনের ফলকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চায় তেহরান
ইরানের দৃষ্টিতে ডেমোক্রেটদের বিজয় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ওয়াশিংটনের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তেহরান মনে করছে, মার্কিন জনগণের যুদ্ধবিরোধী মনোভাব উপেক্ষা করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে মার্কিন ভোটাররা সরাসরি ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভোট দিয়েছেন—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং যুদ্ধ, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডেমোক্রেটদের নির্বাচনী বিজয় ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসন জনগণের নির্বাচনী বার্তা কতটা গুরুত্ব দেয় এবং তেহরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার পথে কতটা এগিয়ে যায়।

