বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে বিজয়ের পথে আবদুল এল-সাইয়েদ, মার্কিন রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস | সাঈদ চৌধুরী

আমেরিকা সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

ধর্মীয় পরিচয়কে ঘিরে বিতর্ক, বর্ণবাদী প্রচারণা আর রাজনৈতিক মেরুকরণ— সবকিছুকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বিজয়ের দাবি করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। চিকিৎসক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা এই নেতার প্রচারণায় উঠে এসেছে মানবিক স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিচয়ের রাজনীতি নতুন কিছু নয়। তবে সেই পরিচয় যখন ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কারও রাজনৈতিক সম্ভাবনার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, তখন লড়াইটা আর কেবল নির্বাচনের থাকে না। হয়ে ওঠে সমান অধিকার ও বহুত্ববাদের প্রশ্ন। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের নির্বাচনী লড়াই যেন সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

ভোটের প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে তাঁকে ঘিরে উত্তাপ ছিল তুঙ্গে। সমালোচনা, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণ এবং নানা বিতর্কের মধ্যেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি তিনি। বরং ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকট, স্বাস্থ্যসেবার অধিকার এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারের দাবি।

প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এক বক্তব্যে এল-সাইয়েদ বলেছিলেন, প্রায় এক কোটি মানুষের একটি অঙ্গরাজ্যের মানুষ তাদের সরকারের কাছ থেকে আরও অনেক ভালো কিছু পাওয়ার অধিকার রাখেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি বরং সেই ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ জন মানুষের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাই, যাঁদের কথা আপনারা বলছেন না।’

নির্বাচনের ফল ঘিরে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে চালানো প্রচারণার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেখা সবচেয়ে কদর্য প্রচারণাগুলোর একটির লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল তাঁর নাম ও ধর্মকে।

তবে সেই বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে তিনি তুলে ধরেন অন্তর্ভুক্তিমূলক আমেরিকার স্বপ্ন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল স্পষ্ট—আমেরিকা কারও একার নয়; এখানে সবার জন্যই যথেষ্ট জায়গা রয়েছে।

আবদুল এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পেছনে রয়েছে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি মহামারিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন।

২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তাঁর নিয়োগ জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। জনস্বাস্থ্য খাতে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতির বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করে তোলে।

২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। সেই নির্বাচনে জয় না পেলেও তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে মানবিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।

এল-সাইয়েদের নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্ন। মানবিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপ, সাধারণ মানুষের চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের মতো বিষয় ছিল তাঁর প্রচারণার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি।

তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— মানুষের করের অর্থ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে ব্যয় হচ্ছে?

এই প্রশ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নীতির সমালোচনায় সরব হয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা তাঁর প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এল-সাইয়েদ। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নীতিকে বর্ণবৈষম্যমূলক বলেও সমালোচনা করেছেন তিনি।

২৯ অক্টোবরের এক নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কর দেওয়ার পর সেই অর্থ অন্য কারও সন্তানদের ওপর বোমা ফেলতে ব্যবহৃত হবে— এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন। বরং সেই অর্থ নিজের দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত।

তাঁর আপত্তি শুধু ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সামরিক সহায়তার সামগ্রিক নীতিরই সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের পাশাপাশি মিসর, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নামও উঠে এসেছে।

এল-সাইয়েদের মতে, বিদেশে সামরিক শক্তি জোরদারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে সেই অর্থ স্কুল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে বিনিয়োগ করা উচিত।

মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান এল-সাইয়েদ। নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের ধর্মীয় ও পারিবারিক পরিচয় আড়াল করার চেষ্টা করেননি তিনি। বরং বারবার বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি।

ভোটারদের প্রতিও তাঁর আহ্বান ছিল— তাঁকে বিচার করতে হবে তাঁর নাম কিংবা ধর্ম দিয়ে নয়, বরং তাঁর নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও জনস্বার্থে অবস্থানের ভিত্তিতে।

তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানুষের দৈনন্দিন সংকটের সঙ্গে কারও ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ যেন জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারে, চিকিৎসকের কাছে যেতে পারে এবং নিরাপদ বাতাস ও বিশুদ্ধ পানি পায়— রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।

এল-সাইয়েদের প্রচারণায় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যপন্থি নেতাদের সমর্থনও ছিল। মিশিগানের নির্বাচন দলটির বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

তাঁর নির্বাচনী লড়াই তাই কেবল একটি আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এবং বহুজাতিক সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে আবদুল এল-সাইয়েদের রাজনৈতিক যাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সামনে আনে- পরিচয় নয়, মানুষের অধিকার ও কল্যাণই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল বিবেচনা। বিভাজনের ভাষার বিপরীতে তিনি যে অন্তর্ভুক্তিমূলক আমেরিকার কথা বলেছেন, তার আবেদন শুধু মিশিগানেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে পড়েছে বহুত্ববাদী সমাজে সমান মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্বের বৃহত্তর বিতর্কেও।

* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *