জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা ।। সাজজাদ হোসাইন খান

গল্প-উপন্যাস প্রবন্ধ-কলাম ভ্রমণ-স্মৃতিকথা শিল্প-সংস্কৃতি সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

পঁচিশ.

সূর্য নামছে নিচে দ্রুত। দূরের ঘরবাড়ি গ্রাম গাছের ডালপালা ঝাপসা হয়ে আসছে। নীলের সাগরে সাঁতার কাটছে সুরুজ, না লাল না হলুদ। বিরাট তশতরিতে কে যেনো রেখে দিয়ে গেছে রাজহাঁসের ডিমের একটি কুসুম। উড়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি-কাক দল বেঁধে। ওরা যাচ্ছে কোথায়?

আম্মা বললেন ওরা ওদের বাসায় ফিরছে। দেখো না সন্ধ্যা হয়ে আসলো বুঝি। ঝিকঝাক শব্দে গাড়ি ছুটছে। আমরাও তো বাসায় ফিরছি আম্মা! হ্যাঁ তেমনটাই।

কুমিল্লায়ই এখন আমাদের বাসা। বসবাসের জায়গা। ঝিক ঝিক শব্দ একসময় থেমে গেল। গাড়িও দাঁড়িয়ে গেলো। আম্মা বললেন আমরা এসে গেছি কুমিল্লা। ঐ দেখোনা বড় বড় হরফে লেখা আছে কুমিল্লা। আমিও বানান করে উচ্চারণ করালাম। এরিমধ্যে আব্বা আর মামা এসে হাজির। পেছনে একজন কুলি মালপত্র নিয়ে। কিছু মাথায়, কিছু হাতে।

এখন রিক্সা আমাদের বাহন। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম আমরা কি আবার ঠাকুরপাড়া যাচ্ছি। না, আমরা এবার যাচ্ছি অশোকতলা, জবাবে জানালেন আব্বা। অশোকতলা আবার কোথায়? মনে মনে চিন্তা করলাম ইউসুফ অমর’দের সাথে বুঝি আর দেখা হলো না।

মামা জানালেন ঠাকুরপাড়ার কাছাকছিই অশোকতলা। পুরানো বন্ধুবান্ধবের কথা ভাবছ? অশোকতলায়ও নুতন কতো বন্ধুবান্ধব জুটে যাবে। আমি চুপ থাকলাম। আম্মা হাসলেন।

কুমিল্লার পথ-ঘাটগুলো আগের মতোই। তেমন কোনো অদল বদল নাই। একটি গলিপথে ঢুকলো আমাদের রিক্সা। বেশ অন্ধকার। খাম্বাগুলোতে কোনো বাতি নাই। বাড়িঘরের আলো ঠিকড়ে ঠিকড়ে বাইরে আসছে। তাতে অন্ধকার দাঁড়িয়েই থকলো।

ভাঙ্গারাস্তা, রিক্সা কেবল লাফাচ্ছে। ভয়-বিরক্তি দুটোতেই জড়িয়ে পড়েছি। আব্বা বললেন এইতো এসে গেলাম। এরিমধ্যে আমাদের রিক্সা দুটি একটি একতলা দালানের সিঁড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল।

আশেপাশে আবছা অন্ধকার। এদিকে সেদিকে জোনাকিরা ওড়াউড়ি করছে। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। দূরে দূরে বাড়িঘর মনে হলো। আলো জ্বলছে মিটমিট।

গাছপালা যে প্রচুর অশোকতলায়, বুঝাই যাচ্ছে। এখানে অন্ধকার বেশ গাঢ়। গা ছমছম করছে। রাস্তাঘাটে হালকা মানুষজন। কুকুরের ঘেউ ঘেউ অবিরাম। ঠাকুরপাড়ায় কিন্তু কুকুর টুকুর তেমন ঝামেলা করতো না।

বোঝা গেলো অশোকতলায় এর উলটা ছবি। তালা খুলে আব্বা পা রাখলেন অন্দরে। তারপর আলো জ্বালালেন। মিটমিটে আলো, প্রায় হারিকেনের মতোই। কুকুরের কোলাহলে রাতটা কাটলো। নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ, আয়োজন। অন্ধকারে তেমন কিছু ঠাহর করা যায়নি।

এখন দেখছি ডানপাশে আরো একটি দালান। একই চেহারা, একই রঙের। দুটোই একতলা। সে দালানেও লোকজন বসবাস করে মনে হলো। সামনে বিশাল মাঠ। পুরো বাড়িটি দেয়াল ঘেরা। এলাকাটি বেশ পসন্দ হলো আমার।

ছাব্বিশ.

দূরে বাড়িঘরগুলো আলগা আলগা। গাছপালায় ঠাসা। একটু বাদেই পাশের দালানের লোকজন বাইরে এলো। সূর্য কেবল মাথা তুলছে। লাল হুলুদে চুবানো সে সূর্য। আমার সমবয়সি আছে একজন। ছোটও আছে, বড়ও আছে। ওদের সাথে ভাব হলো, কথা হলো। ওদের আব্বা আম্মারা এলেন আমাদের বাসায়। আম্মার সাথে পরিচয় করার জন্য। পাশাপাশি ঘর, এমনটা তো হতেই হবে।

ঠাকুরপাড়ায়ও প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের ভাব ছিলো। বন্ধুত্ব ছিলো। এক দু’দিন যেতে না যেতেই বন্ধুবান্ধব জুটে গেলো। খেলাধুলা আড্ডা ফাড্ডা, আনন্দ ফুর্তি শরীর আর মনের সাথে ঝুলেই থাকলো।

অশোকতলা আবার কি ধরনের নাম। অসুখ বিসুখের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই তো! আমার চিন্তার এমন ফরফরে অবস্থা দেখে আব্বা হাসলেন। কাছে ডেকে বললেন তেমন কিছু নয়। অশোক এক প্রকার গাছের নাম। এ পাড়ায় অশোক গাছ ছিলো অনেক। এখনো এর কমতি নাই। ঐ যে দেখছো এ গাছের নামই হলো গিয়ে অশোক গাছ। বটগাছ আর অশোক গাছে তেমন কোনো অমিল নাই। কেবল এদের পাতার চেহারায় বেশকম। তাও সামান্য। চট করে বোঝা যায় না। আমাদের বাসার কাছেই পাশাপাশি দুটি অশোক গাছ দাঁড়িয়ে আছে দেখলাম। অশোকতলার আশোকগাছ গুনতে গুনতে পার হলো কয়েক সপ্তাহ।

লেখাপড়া গোল্লায় যাচ্ছে আম্মা আব্বাকে ডেকে বললেন। আব্বাও সায় দিলেন। সেদিন থেকেই বাসায় শুধু বইপত্র খাতা-কলম আর স্কুল পাঠশালা নিয়ে সলা-পরামর্শ। আমিও সজাগ হলাম। এখন শুধু স্কুল-পাঠশালা কল্পনায় ভাসে। বন্ধুবান্ধব কেমন হবে কে জানে। আব্বাও খোঁজখবর নিলেন কাছে পিছে ভালো স্কুলের। আমিও মনে মনে তৈরি হতে থাকলাম। ঘরে বইখাতা নাড়াচাড়া করছি সকাল-রাতে। আম্মাও সঙ্গ দেন মাঝেমধ্যে। রাতে খোঁজখবর নেন আব্বা। বলাতো যায় না কি সব প্রশ্ন-ট্রশ্ন করে বসে স্যাররা। তাই ঝালাই করছি বাংলা ইংরেজি আর ধারাপাত। এরই মধ্যে খোঁজাখুঁজিতে পার হলো আরো কিছু দিন। আব্বা কাছাকাছি চাচ্ছিলেন স্কুল। তখন পাড়ায় পাড়ায় ছিলো না স্কুল-পাঠশালা। ছাত্র-ছাত্রীও ছিলো আঙ্গুলে গোনা।

হঠাৎ করেই একটি স্কুল আবিষ্কার করে ফেললেন আব্বা। খুশি খুশি মেজাজে ফিরলেন বাসায়। আম্মাও খুশি। আমার চোখেমুখেও আনন্দ লাফাচ্ছে। আব্বা আম্মা সলাপরামর্শ করে ঠিক করলেন আগামিকালই শুভ কাজটি সেরে ফেলতে হবে। আমিও মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম। এতো কাছে যে স্কুল থাকতে পারে বুঝতেই পারিনি। এই স্কুলটির পাশ দিয়ে রোজ অফিসে যাই। কিন্তু এটি নজরে আসেনি। আম্মা বললেন এখন তো স্কুল-টিস্কুল বন্ধ, হয়তো তাই বুঝা যায়নি। স্কুলটি খুবই কাছে। বাসা থেকে দেখা যায়। বলতে গেলে মিনিট দুতিনের পথ। আমাকে আর আম্মাকে ইশারা করে দেখালেন। ভাগ্য ভালো অশোকতলায়ই স্কুল মিলে গেল।

আমি আর আব্বা স্কুলটি দেখতে গেলাম। আমার পিড়াপিড়িতে আব্বা রাজি হলেন। এতো কাছে তাই আব্বা আপত্তি করলেন না। ঘুরে ফিরে দেখলাম স্কুলটি বেশি বড় না। বাঁশের বেড়া আর টিনের চালা। পাশে ছোটখাটো একখানা ডোবামতো পুকুর। আসলে এটি একটি বিশাল বাড়ি। চারপাশটা দেয়াল ঘেরা। আশেপাশে গাছগাছালি, নানান কিসিমের ফুল। দেয়ালের বাইরে সে স্কুল। মুশকিল হলো স্কুলের নিজস্ব কোনো মাঠ নাই! যদিও কাছাকাছি খোলা জায়গা জমি আছে। খেলাধুলায় জন্য সেখানে যেতে হবে। হয়তো তাই করে ছাত্রছাত্রীরা।

পরিবেশটি মন্দ না। এরপরও মাঠের বিষয়টি কেমন যেন লাগছিল। বাসায় ফিরলাম। আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, স্কুল পছন্দ হয়েছে? পছন্দ হয়েছে তবে..। তবে আবার কি। আম্মা বললেন মাঠ নাই তাতে কি। তুমি তো সেখানে পড়তে যাচ্ছো, খেলতে নয়। আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আব্বা আমার মনের ধারাপাত পাঠ করে ফেলেছেন। ঠিক আছে, অন্য স্কুলের খোঁজ করছি। আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।

আমরা আশোকতলায় যে বাড়িতে উঠেছি সে বাড়ির মালিকের নাম মজিদ খাঁ। আর এই মাজিদ খাঁর বড় ভাই খান বাহাদুর ইব্রাহিম খাঁ। ঐ যে স্কুলটি দেখে এসেছো সে স্কুলটি খান বাহাদুর সাহেবই প্রতিষ্ঠা করেছেন। দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝ বরাবর সদর রাস্তা। খান বাহাদুর সাহেব বেশ ধনী লোক। লেখাপড়া জানাশোনা মানুষ। শিক্ষার কদর জানেন। তাই নিজের খরচে নিজের বাড়িতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন। রাতের খাবার খেতে খেতে আব্বা এসব কথা জানালেন। আমার দাদার নামও তো আবদুল মজিদ খাঁ। হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ।

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *