হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী সিলেট :
লিবিয়া থেকে গ্রীস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ৯ বাংলাদেশী যুবক নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৭ যুবক। ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে বেঁচে যাওয়া একজনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে। বেঁচে যাওয়া ওই যুবকের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, একই নৌকায় থাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ৫ যুবকের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারা হলেন, পাগলা শত্রুমর্দনের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা।
হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, ‘তার সাথে সর্বশেষ কথা হয় গত ৩১ জুলাই। সেদিন জানিয়েছিলো যে ৩ তারিখ গেমে যাবে। সেদিন ২টি নৌকা রওনা দিয়েছিলো। ১ নম্বর নৌকা থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছিলে যে আমার ভাতিজা ২ নম্বর নৌকায় আছে। পরে আর কোন খোঁজ আসেনি। জেনেছি নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ১০ দিন ধরে তারা সাগরে ভাসছিলো।’
তিনি বলেন, ‘এখন মিশরে অনেককে জীবিত এবং মৃত হিসেবে উদ্ধার করা হলেও হৃদয়ের কোন খোঁজ পাচ্ছি না। সে এখনো নিখোঁজ।’ বাকি আরো দুইটি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি নন। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রভাবশালী দালাল সেসব পরিবারকে আশ্বস্ত করেছে তাদের ছেলেরা বেঁচে আছে। তাদেরকে ঠিকঠাক পেতে হলে কোন কথা বলা যাবে না।
ধারণা করা হচ্ছে নিহত অধিকাংশ যুবকের বাড়িই শান্তিগঞ্জ। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, খাবার ও পানির সংকটে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। মরদেহগুলোতে পঁচন ধরায় সেগুলো সাগরে ফেলে দেয়া হয়।
গত সোমবার রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। নৌকাটি পথে ঝড়ের কবলে পড়লে খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপরও বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে। টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছালে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না, চোখের সামনে নয়জন বাংলাদেশি মারা গেলে তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়। পরে আরও দু’জন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পঁচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৭ জন বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। তাদের পরিচয় এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।

