এমসিএ’র ঈদ পুনর্মিলনী পরিনত হয়েছিল বৈচিত্র্যময় লন্ডনের এক মিলনমেলায়

প্রবাসী যুক্তরাজ্য শিল্প-সংস্কৃতি সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

মুসলিম কমিউনিটি অ্যাসোসিয়েশনের (এমসিএ) আনন্দঘন ঈদ পুনর্মিলনী ডিনার সুধীজনকে বেশ নাড়া দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠক, মেয়র, স্পিকার, কাউন্সিলর, পেশাজীবী ও সমাজসেবী-সহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের অংশ গ্রহনে পরিনত হয়েছিল লন্ডনের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক মিলনমেলায়।  

এমসিএ’র কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট, খ্যাতিমান আইনজীবী ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ ঈদ পুনর্মিলনীতে উপস্থিত সুধীজনকে সাদর আমন্ত্রণ ও প্রাণময় ভালোবাসা জ্ঞাপন করেন। ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের এতজন মানুষ এক ছাদের নিচে একত্রিত হওয়াকে অনুষ্ঠানের সফলতার পাশাপাশি অনুপ্রেরণাদায়ক হিসেবেই উল্লেখ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার হামিদ আজাদ পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে উপস্থিত সকলকে এবং তাদের পরিবারের প্রত্যেককে জানান উষ্ণ ও আন্তরিক ঈদ মোবারক। ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানকে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা এবং একতার দিন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঈদুল আযহা হলো বিজয়ের উদযাপন। এটি শয়তানের অহংকারের বিপরীতে আল্লাহর আনুগত্যের বিজয়। এটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগের উদযাপন। তাই আজকের ঈদ পুনর্মিলনী হলো অসংখ্য বরকতের জন্য মহান স্রষ্টাকে কৃতজ্ঞতা দেখানোর দিন।

মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব হামিদ আজাদ বলেন, মানবজাতি বিশেষ করে মুসলমানরা আজ বিশ্বব্যাপী অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, বৈষম্য ও বৈরিতার মুখোমুখি। তারা অর্থনৈতিক কষ্ট, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সংগ্রাম করছেন। আমরা যখন এখানে ঈদ উদযাপন করছি ঠিক সে সময়ে ফিলিস্তিন-সহ বিশ্বের বহু অঞ্চলে নিরীহ-নিরপরাধ পুরুষ-মহিলা এবং শিশুরা জালিমদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বিধ্বস্ত। তারা নিপীড়ন-নির্যাতন, স্থানচ্যুতি, অভাব এবং ভোগান্তিতে আছেন। আমাদের অনেক ভাই-বোন ভয়-ভীতি ও অনিশ্চয়তা এবং স্বজন ও সম্পদ হারানোর বেদনায় ভারাক্রান্ত। আমাদের প্রার্থনায় তাদের যেন স্মরণ করি এবং তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকি।

এমসিএ’র প্রেসিডেন্ট মানবসেবায় নিয়োজিত থাকা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং ঈমানের উপর অদম্য থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ঈদ আমাদেরকে আরও ভালো মানুষ, আরও ভালো পরিবার, আরও ভালো প্রতিবেশী এবং আরও ভালো নাগরিক হতে অনুপ্রাণিত করে। ঈদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাকা, নৈতিকতা বজায় রাখা এবং আশা ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাদের সকল হতাশা থেকে রক্ষা করবে।

ব্যারিস্টার হামিদ আজাদ বলেন, সমাজে বিভাজন, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মতবিরোধ আমাদের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। এর বিপরীতে ঈদুল আজহা আমাদের জন্য আশা এবং ঐক্যের শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে। হযরত ইব্রাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী হাজরা (আ.) ও ছেলে ইসমাইল (আ.) থেকে আমরা আল্লাহর প্রতি ভরসা, ত্যাগ, ধৈর্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকার শিক্ষা পাই। মহান  আল্লাহ আমাদের উম্মাহর ভিতরের বিভাজন দূর করুন এবং আমাদের হৃদয়কে সত্য এবং ধার্মিকতার উপর একত্রিত করুন। আমাদের উপাসনা, আমাদের ত্যাগ, আমাদের প্রার্থনা এবং আমাদের সৎকর্ম গ্রহণ করুন। ঘৃণার স্থলে আমাদের বোঝাপড়া, দ্বন্দ্বের স্থলে শান্তি এবং হতাশা স্থলে আশা জাগাতে সহায়তা করুন। আমাদের পরিবারকে ভালোবাসার নিয়ামত দিন, আমাদের সম্প্রদায়কে ঐক্য ও সহানুভূতি প্রদান করুন এবং আমাদের বিশ্বকে শান্তিময় করুন। আমীন।

আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে টাওয়ার হ্যামলেটসে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান ইউরোপে সাড়া জাগানো লন্ডন মুসলিম সেন্টারের (এলএমসি) মতো চেনা আঙিনায় স্বভাবজাত ও উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য প্রদান করেন। কোনো রকম কৃত্রিমতা ছাড়াই টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে এলএমসি এবং এমসিএ’র ভূমিকা গুরুত্বের সাথে ব্যক্ত করেন তিনি। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের বিভিন্ন পটভূমি ও বয়সের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা-স্নেহ এবং সুসম্পর্কের জন্য আমাদের কমিউনিটি কোহেশনের গৌরব প্রকাশ করেন মেয়র লুৎফুর রহমান।

ঈদ পুনর্মিলনীতে হেকনি কাউন্সিলের মেয়র ও গ্রীণ পার্টির নেত্রী যোয়ি গারভেট মুসলিম কমিউনিটির সাথে তার দলের নানা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। আগামী দিনে মানবতার কল্যাণে এমসিএ’র সাথে বহুমাত্রিক কর্মপ্রয়াসে সম্পৃক্ত থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি নিকটবর্তী বারা হিসেবে টাওয়ার হ্যামলেটসের সাথেও কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। 

ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নব নির্বাচিত স্পিকার কাউন্সিলর ব্যারিস্টার মুশতাক আহমদ বলেন, এই সন্ধ্যার একটি গভীর অর্থ রয়েছে যা পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। এখানে সম্মানিত পণ্ডিত, প্রবীণ এবং বহু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিত্বরা জড়ো হয়েছেন। যাদের জ্ঞান, চরিত্র এবং ত্যাগের মাধ্যমে দীর্ঘ বছর ধরে আমাদের জীবন গঠন সহায়ক হয়েছে। এই সম্প্রদায়ের স্বার্থহীন সেবা ইস্ট লন্ডনে বেড়ে ওঠা আমাদের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত এবং উন্নত করেছে।

অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেন্টিং কনসালটেন্ট ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী বলেন, মানবজাতি হিসেবে আমরা পরস্পরে ভাই-বোন। তবে প্রতিটি মানুষের ডিএনএ এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ, চিন্তা করার প্রক্রিয়া এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ার কারণে মতের অমিল হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। অনেক কিছুতে আমাদের ভিন্নমত থাকবে। কিন্ত মানুষ হিসেবে এবং মানবতার কল্যাণে আমাদের এক সাথে কাজ করতে হবে। 

ড. বারী আরো বলেন, আমাদের প্রত্যেকের ‘মাল্টিপল আইডেন্টিটি’ বা একাধিক সত্তা রয়েছে। যেমন আমি একই সাথে একজন শিক্ষক, একজন পিতা এবং একজন সমাজকর্মী। সেই নিরিখে বহু-মাত্রিক কারণে আমি শতভাগ বাঙ্গালি, শতভাগ ব্রিটিশ এবং শতভাগ মুসলিম হিসেবে সবখানে কাজ করে থাকি। এটা আমাদের সকলেরে ক্ষেত্রেই প্রয়োজ্য। সুতরাং ব্রিটিশ সমাজের সার্বিক কল্যাণ, সামাজিক সংহতি এবং টেকসই উন্নতির জন্য সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।

এমসিএ’র জেনারেল সেক্রেটারি জনপ্রিয় কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব নুরুল মতিন চৌধুরী সংগঠনের পরিচিত ও বার্ষিক কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, এমসিএ নৈতিক মূল্যবোধের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সততা, সত্যবাদিতা, কর্তব্যপরায়ণতা এবং ন্যায়পরায়ণতার বিকাশ সাধনে সর্বদা সচেষ্ট। আমরা ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান আচরণ এবং মানবাধিকারকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রায় চার দশক থেকে যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সেবা প্রদান করে আসছি। আমাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি সম্প্রদায় গঠন করা যারা বিশ্বাস, সেবা এবং মানবতার কল্যাণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।  

অনুষ্ঠানে ভিআইপিদের মধ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ইস্ট লন্ডন কমিউনিটিজ অর্গানাইজেশনের (TELCO) প্রধান সংগঠক ও সিটিজেনস ইউকের প্রতিষ্ঠাতা এমমানুয়েল গোতোরা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা উচ্চ কন্ঠ, সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় সংস্থাগুলোকে একত্রিত করার আন্দোলনে সক্রিয় এই সংগঠক একটি ভালো ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ তৈরির জন্য সকলের সমন্বিত প্রয়াসের আহ্বান জানান। 

শুভেচ্ছা বক্তব্যে টুগেদার অ্যালায়েন্স চেয়ার কেভিন কোর্টনি চরম-ডানপন্থীদের অপতৎপরতা বিরুদ্ধে সকলকে সতর্ক থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মানবতার পক্ষে কাজ করা এবং শ্রমজীবী শ্রেণীর ঐক্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে সহায়তার আহবান জানান।

এমসিএ’র অ‍্যাসিস্ট‍্যান্ট সেক্রেটারি কাউসার আহমদের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন এমসিএ’র ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল মাসুদ আহমদ। ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট পরিচালনা করেন  রাজু মোঃ শিবলি। সুললিত কন্ঠে কুরআন তেলাওয়াত ও ক্ষুদে শিল্পীদের নাশিদ অতিথিদের মাঝে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এক দারুণ মুগ্ধতা ছড়ায়। সামগ্রীক অনুষ্ঠান এবং মজাদার নৈশভোজ সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *