ইব্রাহীম চৌধুরীর আড্ডা: খুলে যায় স্মৃতির ঝাঁপি, ফিরে আসে ফেলে আসা দিন || সাঈদ চৌধুরী

আমেরিকা যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

কিছু মানুষ আছেন, যাদের সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই কেবল কুশল বিনিময় নয়- কথার সূত্র ধরে খুলে যায় স্মৃতির ঝাঁপি, ফিরে আসে ফেলে আসা দিন। হারিয়ে যাওয়া সময়, পুরোনো মুখ, চেনা শহর, তারুণ্যের দুরন্ত দিন কিংবা জীবনের কোনো এক মায়াময় বিকেল- সবকিছুই যেন আচমকা ফিরে আসে কথার ভেতর দিয়ে।

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন এমনই একজন মানুষ। তার গল্পের সঙ্গে মিশে থাকে হাসি, মায়া, স্মৃতিকাতরতা এবং মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত উষ্ণতা। তার সঙ্গে একটু আড্ডা মানেই যেন জীবনের পুরোনো অ্যালবাম খুলে বসা।

একটু আড্ডা, কিছু পরিচিত মুখ আর কথার সূত্র ধরে কখন যে খুলে যায় স্মৃতির ঝাঁপি- টেরই পাওয়া যায় না। পুরোনো দিনের কত ছবি, কত মুখ, কত গল্প তখন ফিরে আসে মনের পর্দায়। ফেলে আসা শহর, শৈশবের উঠোন, তারুণ্যের দুরন্ত দিন, রাজপথ কিংবা প্রবাসজীবনের নানা অভিজ্ঞতা- সবকিছুই যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা সংস্করণের সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন আমেরিকা থেকে দেশে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তার যাত্রাবিরতি লন্ডনে। এই সুযোগে সতীর্থদের সঙ্গে তার মেলবন্ধনের আয়োজনের নিমন্ত্রণ জানালেন সাংবাদিক আজিজুল আম্বিয়া।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় লেখক ও সংগঠক ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনকে ঘিরে ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যুক্তরাজ্য অনলাইন প্রেসক্লাব। সবার আগেই সেখানে পৌঁছেছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আয়োজনটি পরিণত হলো এক প্রাণবন্ত প্রবাসী মিলনমেলায়।

ইস্ট লন্ডনের চিলড্রেন এডুকেশন সেন্টারে বসেছিল আপনজনের আবহে এক অন্যরকম সন্ধ্যা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জমে উঠেছিল প্রাণখোলা আড্ডা।

পরিচয় আর আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন ঝড়ের গতিতে একটি রসাত্মক বক্তব্য পেশ করলেন। সবাইকে সাবধান করে দিলেন- তাকে খুব ‘মহা কিছু’ ভাবার কোনো কারণ নেই!

মনে হলো, এই আড্ডার জন্য একটি উপক্রমণিকা দরকার। তার লেখার নিজস্ব স্টাইল, প্রাণময় কথা বলার ধরন, রসবোধ এবং স্মৃতিকাতরতা তুলে ধরে দু-একটি কথা বললাম।

ব্যস, ভেঙে গেল আনুষ্ঠানিক দেয়াল। শুরু হলো স্বজন-প্রিয়জনের স্মৃতিমাখা কথামালা।

ফিরে এলো ফেলে আসা দিন। ফিরে এলো হারানো শৈশব। কথার ভেতর দিয়ে যেন হাঁটাহাঁটি শুরু হলো সিলেটের চৌহাট্টা, বন্দর, জিন্দাবাজার আর এমসি কলেজের চেনা গলিপথে। কোথাও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, কোথাও বন্ধুত্বের মায়া, কোথাও রাজনীতির উত্তাপ। আর সবকিছুর আড়ালে মনের গভীরে জমে থাকা সেই চিরকালীন নস্টালজিয়া।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে লন্ডন বারা অব টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার ব্যারিস্টার মুশতাক আহমদ সাহিত্যের মাধুর্য মিশিয়ে বেশ ভাবগম্ভীর এক বক্তব্যে অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন রোজ। সঞ্চালনায় ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল আম্বিয়া।

অতিথি আলোচকদের মধ্যে সাংবাদিক সৈয়দ নাহাস পাশা ও সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন প্রবাসে আমাদের জীবনবোধ ও যাপনচিত্রের নানা দিক তুলে ধরেন।

স্বদেশের আলাপচারিতায় জিন্দাবাজারকে ঘিরে তৈরি হয় আবেগজড়ানো এক জীবন্ত উপাখ্যান। সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন কথায় কথায় ফিরিয়ে আনেন সেই সময়কে- যেখানে তাঁদের যৌবন কেটেছে, রাজনীতির ময়দান কাঁপানো দিনগুলো যেখান থেকে দেখেছেন তারা। কত হই-হুল্লোড়, কত তর্ক-বিতর্ক, কত স্বপ্ন! চায়ের কাপে চুমুক আর সিঙ্গাড়া মুখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেওয়ার সেই চেনা উচ্ছ্বাস যেন মুহূর্তেই ফিরে আসে।

এরপর একে একে নানা বক্তার কথায় উঠে আসে কলেজজীবন। তারুণ্যের উত্তাপ। সেখান থেকে রাজনীতি, আন্দোলন, মানুষের অধিকার এবং সমাজের নানা বাস্তবতার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হয়ে ওঠার গল্প।

যারা মার্ক্সবাদের আলোকে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের কথা বলতেন, পরে পুঁজিবাদী আমেরিকা বা বিলেত চলে এসেছেন- তাঁদের নিয়ে মৃদু ব্যঙ্গ ও রসাত্মক ভঙ্গিতে বক্তব্য দেন সাহসী সাংবাদিক রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী সুয়েব। তার কথায় পুরোনো দিনের আদর্শ, আবেগ আর তারুণ্যের স্বপ্ন যেন নতুন করে রং পেল।

স্মৃতিমাখা সুন্দর বয়ানে সেই সময়কে আরও জীবন্ত করে তোলেন সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী, সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা, সাংবাদিক উর্মি মজহার, ইতিহাসবিদ ফারুক আহমেদ, সাংবাদিক আহাদ চৌধুরী বাবু-সহ আরো অনেকে। তাঁদের কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে এমন এক সময়ের ছবি, যখন রাজনীতি ও সাংবাদিকতা ছিল অনেকের কাছে একে অপরের পরিপূরক। সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধ জায়গা থেকেই তারা নিজেদের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং দেশের ভালো-মন্দের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার স্মৃতি তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান গৌছ সুলতান, সাপ্তাহিক নতুন দিনের সাবেক সাব-এডিটর সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, সাবেক ডেপুটি মেয়র শহীদ আলী, সাবেক স্পিকার আহবাব হোসেন, ড. আনসার আহমদ উল্লাহ, কবি ময়নুর রহমান বাবুল, লেখক মুজিবুল হক মনি, রাজনীতিক সৈয়দ এনাম, এডভোকেট আব্বাস উদ্দিন প্রমুখ- সহ সেকালের রাজনীতি থেকে সাংবাদিকতায় আসা সতীর্থরা।

প্রাণবন্ত এই আড্ডায় আরও ছিলেন অধ্যাপক মিছবা কামাল, সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মনসুর লিলু, নজরুল ইসলাম অকিব, আশিকুল ইসলাম আশিক, মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আবদুস শুকুর, তওফিকা আহমদ, ইমদাদুন খান, আব্দুস সাত্তার, লিপি বেগম, মিছবা মাসুম, নুরুন্নবী আলী, রুমান আহমেদ, ফারজানা করিম তানিয়া, সৈয়দুল ইসলাম, লাভলী রহমান, রুনু মিয়া, শাহীন আহমদসহ আরও অনেকে।

আলোচকদের গল্পের ভেতর দিয়ে উঠে আসে সেই সময়ের মানুষগুলো। তাদের স্বপ্ন, সংগ্রাম, বন্ধুত্ব, রাজনীতি, আদর্শ এবং জীবনের নানা টানাপোড়েন। মনে হচ্ছিল, সময়ের দূরত্ব পেরিয়ে আমরা যেন আবার ফিরে গেছি সেই দিনগুলোতে- যে দিনগুলো কেবল স্মৃতি নয়, মনের ভেতর এখনো টাটকা।

আর এই জায়গাতেই ইব্রাহীম চৌধুরী খোকনের আড্ডার আলাদা সৌন্দর্য। তাঁকে নিয়ে আড্ডা সহজে শেষ হয় না। কারণ আড্ডা তার কাছে কেবল গল্প করার বিষয় নয়। আড্ডা যেন মানুষকে জানার, মানুষকে কাছে টানার এবং সম্পর্ককে আরও গভীর করার এক সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত অবলম্বন।

* সাঈদ চৌধুরী– দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *