বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ: ড. খলিলুর রহমানের ছয় অগ্রাধিকার ও কূটনৈতিক সম্ভাবনা || সাঈদ চৌধুরী

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তব ফলাফলের প্রতিশ্রুতি-ই জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক নেতৃত্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/1852048732428982

বিশ্ব যখন যুদ্ধ ও সংঘাত, জলবায়ু সংকট, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, বৈষম্য, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, তখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

Khalilur Rahman, President of the eighty-first session of the United Nations General Assembly, briefs reporters after having taken the oath of office during the closing meeting of the eightieth session of the General Assembly.

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) নিউইয়র্কে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ২ জুনের নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিসকে ৯৯–৯১ ভোটে পরাজিত করেন। মোট ১৯০টি বৈধ ভোট পড়েছিল। এ নির্বাচন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত সভাপতির পদে অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৮৬ সালে ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হয়েছিলেন সিলেটের কৃতি সন্তান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। চার দশক পর এবার আরেকজন বাংলাদেশি এই পদে অধিষ্ঠত হলেন।

এই অর্জনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নন; তিনি ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সাধারণ পরিষদের সভাপতি।

জাতিসংঘের বিধি অনুযায়ী সভাপতিকে নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং কোনো রাষ্ট্রকে অযৌক্তিক অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না। ড. খলিলুর রহমান নিজেও নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছেন, তিনি সবার সভাপতি হিসেবে কাজ করবেন।

সুতরাং এই সভাপতিত্বকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সরাসরি বাস্তবায়নের একটি নির্বাহী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এর প্রকৃত মূল্য নিহিত রয়েছে আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণ, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি, ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক সমস্যাগুলোকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতায়।

সাধারণ পরিষদের সভাপতি সভা পরিচালনা করেন, আলোচনা ও পরামর্শের পথ তৈরি করেন এবং সাধারণ পরিষদকে প্রতিনিধিত্ব করেন। এই বাস্তবতার মধ্যেই ড. খলিলুর রহমানের ৮১তম অধিবেশনের ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আস্থা চাই নয়, অর্জন করতে হবে:

৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য এটি। (Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All)। অর্থাৎ, আস্থা পুনরুদ্ধার এবং পরিবর্তনকে কার্যকরভাবে পরিচালনার মাধ্যমে এমন একটি জাতিসংঘ গড়ে তোলা, যা সবার জন্য বাস্তব ফলাফল দিতে পারে।

৮ সেপ্টেম্বরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যটি তাঁর পুরো দর্শনের সারকথা তুলে ধরে।: জাতিসংঘের প্রতি আস্থা শুধু চাওয়া যাবে না; সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং মানুষের জন্য বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে সেই আস্থা অর্জন করতে হবে।

এখানেই তাঁর সভাপতিত্বের মূল রাজনৈতিক দর্শন। তিনি জাতিসংঘের আরেকটি উচ্চাভিলাষী ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফলাফলকে (Delivery) গুরুত্ব দিতে চাইছেন। এর অর্থ- শান্তি নিয়ে আলোচনা হলে তার রাজনৈতিক ফল কী, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলে অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, জলবায়ু ক্ষতির কথা বললে অর্থ ও অভিযোজন সহায়তা কীভাবে পৌঁছাবে, আর প্রযুক্তির সুফল নিয়ে কথা বললে উন্নয়নশীল দেশগুলো কতটা অংশীদার হতে পারবে- এসব প্রশ্নকে সামনে আনা।

এই দর্শনকে তিনি ছয়টি পরস্পর-সংযুক্ত স্তম্ভে সাজিয়েছেন। জাতিসংঘের অফিসিয়াল ব্যাখ্যাতেও এগুলোকে বিশেষ ভাবে (Six interlocking pillars) চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক. যুদ্ধের বদলে কূটনীতি:

ড. খলিলুর রহমানের প্রথম অগ্রাধিকার- অস্ত্রের শব্দ কমিয়ে রাজনৈতিক সংলাপ ও কূটনীতির কণ্ঠকে শক্তিশালী করা (‘Silence the Guns, Amplify the Voices)। এখানে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শুধু যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা, শান্তিরক্ষা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে একই কাঠামোর মধ্যে দিয়ে তিনি দেখছেন। জাতিসংঘের অফিসিয়াল কর্মসূচিতে এই স্তম্ভের মূল ফোকাস হবে Peace, Security and Justice for All।

বাংলাদেশের জন্য এই অগ্রাধিকার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ৬০টির বেশি জাতিসংঘ মিশনে দুই লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী প্রায় ৪,৫০০ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নয়টি মিশনে কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ শান্তি ও শান্তিরক্ষা বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রও বটে।

দুই. উন্নয়নকে আবার গতি দেওয়া:

ড. খলিলুর রহমানের পরিকল্পনার দ্বিতীয় স্তম্ভটি হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। No One Left Behind, No Country Left Out এর অধীনে টেকসই উন্নয়ন, SDG বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে থাকা দেশগুলোর সমস্যা গুরুত্ব দেওয়া।

এখানে একটি তথ্যগত বিষয় আছে। প্রচলিতভাবে বলা হচ্ছে, “মাত্র ৩৬ শতাংশ SDG অর্জনের পথে।”বাস্তবে জাতিসংঘের ২০২৬ সালের SDG রিপোর্ট মোতাবেক উপলভ্য ১৩৯টি Assessable target-এর ৩৬ শতাংশ সঠিক পথে রয়েছে অথবা মাঝারি মাত্রায় অগ্রগতি করছে। প্রায় ৪৯ শতাংশ খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং ১৫ শতাংশ ২০১৫ সালের ভিত্তির তুলনায় পিছিয়ে গেছে।

অর্থাৎ ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সমস্যা শুধু নীতি নয়- অর্থায়ন, ঋণের চাপ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোও বড় বাধা।

খলিলুর রহমানের কর্মসূচিতে তাই SDG acceleration-এর পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন, বিশেষ পরিস্থিতিতে থাকা দেশগুলোর প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর রয়েছে। তাঁর সভাপতিত্বের সময়ে ২০২৭ সালের SDG Summit ও Global Sustainable Development Report গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।

তিন. জলবায়ু:

ড. খলিলুর রহমানের পরিকল্পনার তৃতীয় স্তম্ভে কেন্দ্রবিন্দু (Our Planet, Our Pact) জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব। Paris Agreement-এর অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, Loss and Damage এর জন্য অর্থায়ন, জলবায়ু অভিযোজন এবং সবার জন্য আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়া এই কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতিসংঘের অফিসিয়াল কর্মসূচিতে বিশেষভাবে Loss and Damage Fund-কে কার্যকর করা এবং জলবায়ু সহনশীলতাকে সব প্রাসঙ্গিক আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

এখানে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে আন্তর্জাতিক এজেন্ডার একটি সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম এবং অভিযোজন, উপকূলীয় সুরক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে।

তবে সুযোগটি কাজে লাগানোর জন্য শুধু ‘জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন প্রযুক্তি, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রকল্প ও অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে এগোতে হবে।

চার. মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষা:

ড. খলিলুর রহমানের পরিকল্পনার চতুর্থ স্তম্ভের আওতায় মানবাধিকার, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষা এবং সংকটকবলিত মানুষের কাছে বাধাহীন সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বিষয় রয়েছে। (Rights and Protection: Freedom from Fear and Want)।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের বিশেষ গুরুত্ব। উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সরকারের রোহিঙ্গা-বিষয়ক High Representative হিসেবে তিনি পরিস্থিতিটি কাছ থেকে দেখেছেন। জাতিসংঘও ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে।

ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক আলোচনায় দৃশ্যমান রাখার একটি বাড়তি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এখানেও একটি সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট দেশের পক্ষে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো নয়। বরং তিনি শরণার্থী সুরক্ষা, মানবিক অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নগুলোকে বৃহত্তর বৈশ্বিক আলোচনার অংশ করতে পারেন। আর সেখানেই আমাদের সামগ্রিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ রয়েছে।

Participants stand for a moment of silence during the 1st plenary meeting of the eighty-first session of the United Nations General Assembly.
At dais are, from left to right: Secretary-General António Guterres; Khalilur Rahman, President of the eighty-first session of the United Nations General Assembly; and Movses Abelian, Under-Secretary-General for General Assembly and Conference Management (DGACM).

পাঁচ. AI প্রযুক্তি:

ড. খলিলুর রহমানের পরিকল্পনার পঞ্চম স্তম্ভে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সম্ভাবনার পাশাপাশি বৈষম্য, পক্ষপাত, নজরদারি ও অপব্যবহারের ঝুঁকিও গুরুত্ব পেয়েছে। (Innovation with Inclusion)

ড. খলিলুর রহমানের অবস্থান হলো- প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, কিন্তু প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের নয়; কে এর সুফল পাবে এবং কীভাবে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা হবে- সেটি বিবেচ্য বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাবনা বিস্তৃত- ডিজিটাল দক্ষতা, AI শিক্ষা, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, তরুণদের কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব তৈরি করা যেতে পারে।

তবে এখানেও বাস্তবতা হলো, UNGA Presidency নিজে বাংলাদেশের প্রযুক্তি বিনিয়োগ আনবে না। বাংলাদেশকে নিজস্ব বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি কূটনীতিকে এই বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

ছয়. জাতিসংঘ সংস্কার:

ড. খলিলুর রহমানের পরিকল্পনার ষষ্ঠ এবং সম্ভবত সবচেয়ে কাঠামোগত স্তম্ভ জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, সমন্বিত, জবাবদিহিমূলক ভবিষ্যৎ-উপযোগী করা। (We the Peoples, Reimagined) ।

এখানে UN80 Initiative বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- UN80 Initiative ২০২৫ সালে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে শুরু হওয়া জাতিসংঘব্যাপী সংস্কার প্রচেষ্টা। এর লক্ষ্য জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে আরও agile, integrated এবং impactful করা। ২০২৬ সালে সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।

খলিলুর রহমানের বিশেষ ভূমিকা হবে সাধারণ পরিষদকে সদস্যরাষ্ট্র-নির্ভর সংস্কারের একটি চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা। অর্থাৎ তিনি নিজে সংস্কার চাপিয়ে দেবেন না; বরং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমন্বয় ও ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করবেন। তাঁর কর্মসূচিতে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কোথায় সবচেয়ে বড় সুযোগ?

ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্ব বাংলাদেশের জন্য সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সুবিধার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং এটি একটি কূটনৈতিক multiplier- যে সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে আলাদা করে কৌশল তৈরি করতে হবে।

প্রথম সুযোগ উন্নয়ন অর্থায়নে। ঋণের স্থায়িত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রশ্নগুলোকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনা গেলে বাংলাদেশ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পক্ষে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয় সুযোগ জলবায়ু কূটনীতিতে। Loss and Damage সহ জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশকে জোরালো বক্তব্য পাশাপাশি প্রকল্পভিত্তিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের দিকে যেতে হবে।

তৃতীয় সুযোগ রোহিঙ্গা সংকটকে রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনায় ধরে রাখা। মানবিক সহায়তা জরুরি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া সংকটের অবসান হবে না। নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার পরিস্থিতিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রাখা প্রয়োজন।

চতুর্থ সুযোগ Global South diplomacy। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর Global South-এর অভিন্ন স্বার্থ- উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান—নিয়ে বাংলাদেশ একটি সেতুবন্ধনকারী ভূমিকা নিতে পারে।

পঞ্চম সুযোগ প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে। AI governance নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা যখন দ্রুত এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশ তরুণদের digital skills, AI শিক্ষা, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ডিজিটাল সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অংশীদারিত্বের জন্য নতুন সহযোগিতা খুঁজতে পারে।

এই সুযোগগুলোকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে পরিণত না করে বাংলাদেশ চাইলে একটি সমন্বিত “UNGA 81 Development Diplomacy Strategy” গ্রহণ করতে পারে।

ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘে সভাপতিত্ব বাংলাদেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্জন। বিশ্বব্যবস্থার পরস্পর-সংযুক্ত সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিরাট সুযোগ। তাঁর পরিকল্পনাগুলোকে জাতিসংঘ নিজেও আন্তঃসংযুক্ত স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এটি একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক পরীক্ষা এবং বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ।

* সাঈদ চৌধুরী– দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *