হুমায়ূন রশিদ চৌধূরী সিলেট
রাতে বৃষ্টি দিনে তীব্র রোদ। মধ্য শ্রাবনের এমন দিনে নীল আকাশে মেঘের খেলা। নিচে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের হাতছানি। রূপের নদী যাদুকাটা, বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, বারেক টিলা, শিমুল বাগান, জাফলং, পিয়াইন, ধলাই নদী, সবুজ জলের লালাখাল, সাদাপাথর, রাতারগুল, সবুজ চা-বাগান, মাধবকুন্ডের ঝর্ণা, হাকালুকি হাওর সহ সিলেটের শত পর্যটন কেন্দ্রে নানা স্থান থেকে আসা ভ্রমণ পিপাসুরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন মনের আনন্দে।

এসব পর্যটন কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে হাজারো মানুষের জীবিকা। স্থানীয় এলাকার হোটেল রেস্তোরাঁও এখন জমজমাট। পুলিশ প্রশাসন জানায়, ভ্রমণে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সার্বিক সহযোগিতায় প্রশাসন তৎপর রয়েছে। তবে এখানকার অবকাঠামো সেভাবে গড়ে উঠেনি। ফলে পর্যটকরা প্রায়ই বেকায়দায় পড়েন বিভিন্ন জায়গায়। তাদের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরো জোরদার হওয়া প্রয়োজন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিদ্যমান অবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে একটি বিশ্বমানের পর্যটন স্পট করতে চান। তিনি বলেন, সুন্দর অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তুললে সিলেটে ছুটে আসবেন পৃথিবীর নানা স্থানের পর্যটক। ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এরই মধ্যে আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট রেল ষ্টেশন থেকে সুরমা নদী পার হয়ে পর্যটন স্পট জাফলং পর্যন্ত একটি রেল লাইন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন। শনিবার একটি কারিগরি টিম নিয়ে এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

সবুজ পাহাড় ছুয়ে যখন মেঘ উড়ে বেড়ায় তখন তামাবিল লাগুয়া সড়কে চলাচলরত যানবাহন আপনা-আপনি গতিমন্তর হয়ে পড়ে। সবুজ পাহাড়ের সাথে সাদা মেঘের মিতালির দৃশ্যে অবগাহন করে। পর্যটকদের মন আকুলি-বিকুলি করে পাহড়ের গায়ে উড়ে চলা সাদা মেঘের ভেলার পরশ নেয়ার কামনায়। এমন প্রাকৃতিক শুভা সিলেটে আসা পর্যটকদের নয়ন ও প্রাণ জুড়ায়।
নদী ও হাওর টৈটুম্বুর- সে আরেক সৌন্দর্য্য। সুদৃশ্য হাউজবোটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শত পর্যটক। সেখানে রাত্রী যাপন, থাকা-খাওয়া ও দল বেঁধে গান গাওয়া- খোলা হাওর যেন মুখরিত হয়ে উঠে সুরের ছন্দে।
শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একটু স্বস্তির খোঁজে মানুষ ছুটে আসছে সবুজে ঘেরা নির্মল পরিবেশে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদেও আগমনে প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মুখেও। তবে তারা বলছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা, অভ্যন্তরীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাগুলো পাকা ও প্রশস্ত করা, প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের আশপাশে পর্যাপ্ত আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, নারী ও পুরুষ পর্যটকদের জন্য আলাদা এবং স্যানিটেশন সুবিধাসম্পন্ন ওয়াশরুম নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এটা হলে সিলেটের প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠবে বিশ্ব মানের পর্যটন কেন্দ্রে।
গত শুক্রবার উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে ২৫ জনের একটি একটি টিম এসেছিলেন তাহিরপুরের শিমুল বাগান, নীলাদ্রী লেক টাঙ্গুয়া ভ্রমণে। তাদের সাথে ছিলেন ময়মনসিংহ শহরের প্রকৌশলী দম্পতি সহ আরো কয়েকজন। মিম, ইভা, লামিয়া, সিলভিয়া, আরোহী, শাহীন, নাদিম, শামিম, শান্ত, রিয়াজ, হাবিব, পিয়াস, সামিন, আজিজুল, নাজমুল, বিলাশ, জাহিদ, মিখাইল, লিপ্ত, শিপন, হৃদয়, সোহান, রাব্বি আরো অনেকে।

আমিনুর জানালেন, টাঙ্গুয়া, যাদুকাটা, বারেক টিলা, শিমুল বাগান তাদের মুগ্ধ করেছে। প্রকৌশলী নাদিম পারভেজ বলেন, দেশের ভিতর এমন স্পট রয়েছে তা না দেখলে বিশ্বাস হয়না। তিনি বলেন, টেকের ঘাটের কাছে লাকমা ছড়া এক অপর্ব ষ্পট। এটা পর্যটন খাতে বিনিয়োগের উত্তম স্থান। সঠিক অবকাঠামো গড়ে তুললে দেশ বিদেশের পর্যটক হুমড়ী খেয়ে পড়বে।
পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এখানকার প্রাকৃতি নির্মল আনন্দময়। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পর্যটকদের অনেকেই বলেন, সিলেট-ঢাকা সড়কে পথের দুর্ভোগ এবং রেলওয়ের টিকেট সংকট সিলেটে আসার আনন্দ ফিকে হয়ে যায়। তারা সিলেট-ঢাকা ৬ লেন সড়কে কাজ দ্রুত শেষ করা এবং আসা যাওয়ায় রেলের বগি বৃদ্ধি সহ আরো কয়েকজুড়া ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিমানের ভাড়াও অত্যাধিক- যা অনেকের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।
সরকারী ছুটি বা সুযোগ বুঝেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সিলেটের প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। তপ্ত রোদ আর সব ক্লান্তি ভুলে ছুটছেন তারা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণাায়। সবুজ চা বাগানে বা পাথর আর জলধারার মেল বন্ধনে লুটিপুটি খাচ্ছেন।

টাঙ্গুয়ার নীল জলে সাঁতার- সেকি আনন্দ! বর্ষায় সিলেট সীমান্তে সাদাপাথর আর সবুজে মোড়ানো চা বাগানগুলো যেন সৌন্দর্যের পাখা মেলেছে। প্রকৃতি-প্রেমীরা উচ্ছল। মনের খুশিতে ঘুরে ফিরছেন দিন রাত। কেউ কেউ জ্যোতসা রাতের খোঁজে উন্মুখ হয়ে আছেন। জ্যোতসনার আলো যখন হাওরে নামে তখন- এক মায়াবী পরিবেশে সৃষ্টি হয়- যা মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।
পর্যটকদের আগমনে হোটেল-মোটেল সহ নানা রেস্তোরাঁও বেশ জমেছে। দিনের আলোয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে ছুটে চলা। আর রাতে হোটেল রেষ্টুরেন্টের বেলকনীতে বা হাওরে নৌকায় চাঁদের মায়াবী আলোয় সুস্বাদু খানা পিনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন নানা বয়েসের নারী-পুরুষ।

