পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক বা সহকারী চন্দ্রনাথ রথকে বুধবার রাতে গুলি করে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতি।
বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার সময়, উত্তর ২৪ পরগণার মধ্যমগ্রামে রাস্তার উপর চন্দ্রনাথ রথের গাড়িকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
হামলায় তার গাড়ির চালক গুরুতর জখম হন। তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, “পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় এই হত্যা করা হয়েছে”।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে চৌঠা মে। বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি এবং নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সম্ভাব্য তালিকায় যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে মি. অধিকারীও রয়েছেন। আগামী নয়ই মে বিজেপির নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। তারই মাঝে তার অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পরিচিত চন্দ্রনাথ রথকে খুন করা হলো।
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই যে হাসপাতালে চন্দ্রনাথ রথকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার বাইরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন।
রাতেই শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, অগ্নিমিত্রা পাল, রুদ্রনীল ঘোষ-সহ একাধিক নেতা উপস্থিত হন। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তা সহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও রাতেই পৌঁছান সেখানে।
অগ্নিমিত্রা পাল বিবিসিকে বলেছেন, “একজন অ্যাক্টিভ ছেলে যে ভবানীপুরে এলওপি’র (বিধানসভায় বিরোধী দল নেতা শুভেন্দু অধিকারী) নির্বাচনের সময়ে এত সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে, তাকে এভাবে হত্যা করা হলো। এটা অত্যন্ত দুঃখের এবং ক্ষোভের”।
বিজেপি নেতা রুদ্রনীল ঘোষ বুধবার রাতে হাসপাতালের সামনে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “যে নৃশংসতার পরিচয় তৃণমূল দিয়েছে, তা থেকে বলা যায় তারা স্বভাব পরিবর্তন করবে না। আইন আইনের পথে চলবে, কাউকে ক্ষমা করা হবে না”।
বুধবার রাতেই অবশ্য এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছে তৃণমূল। আদালতের পর্যবেক্ষণে সিবিআই তদন্তও দাবি করেছে।
কী ঘটেছিল?
কাজ শেষে কলকাতার উপকন্ঠে মধ্যমগ্রামে তার বাড়িতে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ রথ। গাড়িতে তিনি ও তার চালক ছিলেন। সেই সময় ওই গাড়ি থামিয়ে গুলি করা হয়।
চন্দ্রনাথ রথ ও তার পরিবার শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। তাদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে স্থানীয় এক হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। গাড়ির চালককেও আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসতেই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের একটা অনেকেই যে হাসপাতালে মি. রথকে আনা হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত হন। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভও প্রকাশ করেন। চন্দ্রনাথ রথের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারী ঘনিষ্ঠ
বছর ৪১-এর চন্দ্রনাথ রথ মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের বাসিন্দা। এই অঞ্চল শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
এক সময়ের রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র চন্দ্রনাথ রথ ভারতীয় বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পর শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার পরিবারের সঙ্গে অধিকারী পরিবারের যোগ দীর্ঘদিনের।
মি. রথের মা হাসি রথ বিজেপির সক্রিয় সদস্য। এক সময় পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। প্রথমে তৃণমূলের অংশ হলেও পরে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর মা হাসি রথও গেরুয়া শিবিরেই যোগ দেন।
পুলিশ কী বলছে?
বুধবার রাতেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি রাস্তায় লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে এসেছিল ফরেনসিক টিম। প্রয়োজনীয় নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
বুধবার রাতে পুলিশের মহানির্দেশক সিদ্ধনাথ গুপ্তা বলেছেন, “আমরা তদন্ত শুরু করেছি। হামলার জন্য ব্যবহৃত চার চাকার গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে তার নাম্বার প্লেট ভুয়ো। সেখানে কারচুপি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে তাজা গুলি ও ব্যবহৃত কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে”।
বিজেপি কী বলেছে?
পশ্চিমবঙ্গে সদ্য দুই দফা ভোট সম্পন্ন হয়েছে। বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলার ঘটনা বাদ দিলে মোটের উপর বড়-সড় ঘটনা এড়ানো গিয়েছে বলেও কিছুটা ‘স্বস্তিতে’ ছিল নির্বাচন কমিশন।
কিন্তু চৌঠা মে ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে রাজ্যের একাধিক জায়গা থেকে সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের পার্টি অফিসে ভাংচুর, কর্মীদের মারধরের অভিযোগ তুলছে।
অন্যদিকে, বিজেপি অবশ্য সদস্যদের শান্তি বজায় রাখার কথা বলেছে। পাশাপাশি, তাদের অভিযোগ, বিজেপি কর্মী ‘সেজে’ তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরাই এই ঘটনা ঘটাচ্ছে। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বিজেপির শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, “অন্যকিছু করতে না পেরে শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ককে গুলি করল”।
“অত্যন্ত নৃশংস, মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক একটা ঘটনা। ওর মা আমাদের দীর্ঘদিনের কর্মী। এটা শুধু শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ককে হত্যা নয়, এটা একটা বার্তা দেওয়া”।
বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সরাসরি তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, “এটা সম্ভবত ভবানীপুরে মমতা ব্যানার্জীর পরাজয়েরই ফল… সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে… চন্দ্র খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন। বিরোধী দলনেতার কার্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম তদারকি করত। আমাদের কাছে ভাইয়ের মতো ছিল। ছোটখাটো কাজও সামলাত…”।
“বিজেপির সঙ্গে যার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না, এমন একজন মানুষকে কেন হত্যা করা হলো? জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে…আমরা শান্তি চেয়েছিলাম, কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই আমাদের একজন বুথ কর্মীর উপর হামলা করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন”।
ভোটের ফল প্রকাশের পর বিজেপিকর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেছেন, “গত ১৫ বছর ধরে রাজ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি চলেছে। বুধবারই খড়দহে বোমা পড়েছে, বরাহনগরে ছুরি নিয়ে হামলা চালানো হয়েছে, বসিরহাটে গুলিতে আক্রান্ত হয়েছেন বিজেপিকর্মী”।
তৃণমূল কী বলছে
ঘটনার পরই তৃণমূলের পক্ষ থেকে বিবৃতি প্রকাশ করে চন্দ্রনাথ রথের হত্যার নিন্দা করা হয়। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আদর্শ আচরণবিধি বলবৎ থাকা সত্ত্বেও, গত তিন দিন ধরে বিজেপি-সমর্থিত দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা সংঘটিত নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় আরও তিনজন তৃণমূল কর্মীর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি আমরা”।
“এই বিষয়ে সম্ভাব্য কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি, যার মধ্যে আদালত-পর্যবেক্ষিত সিবিআই তদন্তও অন্তর্ভুক্ত, যাতে দোষীদের অবিলম্বে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা যায়। গণতন্ত্রে সহিংসতা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোনো স্থান নেই এবং দোষীরা যাতে জবাবদিহি করতে পারে দ্রুত তার ব্যবস্থা করতে হবে।” বিবিসি

