যখন বিবেক ঘুমায়, ঘুমায়না জালালাবাদ

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

আহবাব মোস্তফা খান :

কুদরত উল্লাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের ত্রিতল থেকে যখন প্রথম সুরমা নদীর বাতাসে মিশেছিল একটি কাগজের গন্ধ, তখন কে জানতো এই উদ্যোগ একদিন হয়ে উঠবে সিলেটের কোটি মানুষের সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত কথক? সালটা ছিল ১৯৯৩। পহেলা আগস্ট জন্ম নেওয়া দৈনিক জালালাবাদ আজ ৩৩ বছরের সিঁড়ি ভেঙে পা রাখলো গৌরবময় ৩৪ বছরে…।

এটি কেবল একটি সংবাদপত্রের পাতা নয়, সুরমা তীরের প্রাণস্পন্দন, মেঘালয়ের পাদদেশের মুক্ত বাতাস আর ঐতিহ্যের ধ্বনি। এটি কেবল একটি সংবাদপত্রের বয়স বাড়ার গল্প নয়; এটি একটি অঞ্চলের স্বাধিকারচেতনা, সংস্কৃতি, মাটি ও মানুষের নাড়ির স্পন্দনকে কালিতে বেঁধে রাখার ইতিহাস।

স্মৃতির পাতা উল্টালে আজো অগ্রজদের চোখে ভাসে ১৯৯৩ সালের সেই স্নিগ্ধ দিনগুলোর কথা। যখন কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের এমন জয়জয়কার ছিল না, তখন লেড টাইপ আর ঘামে ভেজা হাতে সাজানো হতো জালালাবাদের পাতা।

হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেটের মাটি থেকে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কিন্তু দৈনিক জালালাবাদ সেই কঠিন পথেই হেঁটেছে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে। ঝড়-বৃষ্টি, স্বৈরাচার কিংবা সংকটের মেঘ-কোনো কিছুতেই ম্লান হয়নি এর শিরোনাম। সুরমা নদীর জল যেমন বয়ে চলে আপন ছন্দে, তেমনি এই কাগজটিও প্রবহমান রেখেছে সত্যের ধারা।

আজ ৩৪ বছরের এই অভিযাত্রায় দাঁড়িয়ে চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে। ব্রডশিটের গন্ধমাখা পাতা পেরিয়ে আজ খবরের কাগজ ঠাঁই নিয়েছে পকেটের স্মার্টফোনে, গ্লোবাল ভিলেজের স্ক্রিনে। দৈনিক জালালাবাদ ই-পেপার কিংবা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে আজ সাতসাগরের ওপারে বসা সিলেটি প্রবাসীরাও এক টানে ছুঁয়ে দেখতে পারেন জন্মভূমির ঘ্রাণ। তবুও পেপার কাটার সেই মায়াবী শব্দ, ভোরের চায়ের কাপে খবরের কাগজের প্রথম পাতা ওল্টানোর অনুভূতি আজও অমলিন। এই দীর্ঘ পথচলায় কাগজটি হয়ে উঠেছে সাংবাদিক আর মানুষের মেলবন্ধন।

যখনই কুয়াশাচ্ছন্ন হয়েছে মতপ্রকাশের আকাশ, কিংবা থমকে দাঁড়িয়েছে জনতার অধিকার-দৈনিক জালালাবাদ তখন হাতে তুলে নিয়েছে মুক্তচিন্তার মশাল। স্বৈরাচার কিংবা অন্ধকারের মেঘ ভেদ করে এই পত্রিকা ব্যারিকেডের ভাষা বোঝেনি, বুঝেছে মানুষের বাকস্বাধীনতা। বুঝেছে সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার, মতের বৈচিত্র্য।

এই জনপদের অবহেলিত রাস্তাঘাট, গ্যাস-বিদ্যুতের দাবি-সবকিছুই এই পত্রিকার প্রচ্ছদে রূপ নিয়েছে পরিবর্তনের দাবিনামায়। পাহাড় কাটা রোধে হুংকার, কিংবা পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা-দৈনিক জালালাবাদ কেবল এসব কথাই বলেনি, এঁকেছে সমৃদ্ধ সিলেটের সুন্দরের নকশা। চা-শ্রমিকের না বলা বেদনা, খেটে খাওয়া মানুষের ঘামঝরা মজুরি কিংবা প্রান্তিক মানুষের চোখের জল-মানবাধিকারের নিখাদ ক্যানভাসে এই পত্রিকা ফুটিয়ে তুলেছে বারবার। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখা আর নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার দৈনিক জালালাবাদকে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা। যেখানেই লঙ্ঘিত হয়েছে মানবতা, সেখানেই ত্রাতা হয়ে গর্জে উঠেছে এই সংবাদপত্রের প্রতিটি পঙক্তি। তাইতো বারবার জালালাবাদ হয়েছে প্রশাসনের চোখ কিন্তু জনগণের নির্ভরযোগ্য সেতু।

সবেমাত্র গত হয়েছে রক্তাক্ত জুলাই। চব্বিশের এই জুলাইয়েই রাস্তার পিচঢালা পথগুলো হয়ে উঠেছিল একেকটি তরঙ্গায়িত প্রান্তর, যেখানে স্লোগানে স্লোগানে কেঁপেছিল সরকারের ভিত। পুলিশের টিয়ারশেল, রাবার বুলেট-সব তুচ্ছ হয়েছিলো তরুণের দীপ্ত মিছিলে, চোখেমুখে ছিল না কোনো সংশয়, বুকে ছিল এক সমুদ্র বিশ্বাস। নগরের বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, মদিনা মার্কেট, কি শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়-প্রতিটি মোড়ে মোড়ে প্রদীপের মতো জ্বলেছিল অজস্র প্রাণ। সেদিন আর কারো নয়, পুলিশের বুলেটে নিভেছিলো আমাদেরই স্টাফ রিপোর্টার এটিএম তুরাবের প্রাণ। সেদিনও জালালাবাদ প্রমাণ করেছিল- যখন বিবেক ঘুমিয়ে ছিলো, জুলাইয়ের উত্তাল দিনে জালালাবাদ ঘুমায়নি।

সুরমা বয়ে চলছে আপন বেগে, আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে দৈনিক জালালাবাদ। গণতন্ত্র, উন্নয়ন আর মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার এই কাব্যিক যাত্রা আরো বহুকাল ধরে জাগিয়ে রাখবে জালালাবাদ-এটাই প্রত্যাশা।

তাই এই ৩৪-এর গৌরবে দাঁড়িয়ে আমরা গাইছি আগামী দিনের গান। আজ আবার বলছি জালালাবাদ মানেই তো প্রতিবাদের ভাষা, মিলনের সেতু, সুরমা তীরের প্রহরীর কাগজ! পরিণত এই বয়সে তাই আমাদের প্রত্যয় আরো দৃঢ়। আগামীতেও জালালাবাদে কালির শক্তি হবে আরও শাণিত, কণ্ঠ হবে আরও উচ্চকিত।

লেখাটির ইতি টানছি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার শব্দমালা দিয়ে। সুরমার চরের বাতাসে যখন একটি প্রত্যয়ী দৈনিকের অভাব, ঠিক তখন কতিপয় নির্ভীক স্বপ্নচারী হয়েছিলেন উদ্যোগী। সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর ও তাঁর সহযাত্রীরা হয়তো তখন জানতেন না ঘুমে আচ্ছন্ন প্রাতে কতটা কণ্টকাকীর্ণ হয় আঁধার চিরে আলো আনার পথ। তবুও তাঁরা হেঁটেছিলেন। শীতের কুয়াশা কিংবা বর্ষার রিমঝিম কাগজের গন্ধ মেশানো ঘামে তাঁরা বুনেছিলেন একটি স্বপ্নীল দৈনিকের।

সেদিনের সেই উদ্যোগ আজ মহীরুহ। সেই উদ্যোক্তাদের ত্যাগের ঋণ শুধু সিলেট নয়, দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস সযত্নেই লিখে রাখবে এমনটাই আশা…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *