জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা ।। সাজজাদ হোসাইন খান

গল্প-উপন্যাস প্রবন্ধ-কলাম ভ্রমণ-স্মৃতিকথা শিল্প-সংস্কৃতি সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাত.

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘাটুরা আমাদের গ্রামের বাড়ি। দাদা দাদিরা থাকেন, চাচা ফুপুরা থাকেন। সেখানেই যাচ্ছি আমরা। রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকাফাঁকা। গাড়িটারির নাম নিশানা নেই। হঠাৎ হঠাৎ একটা দু’টা বাস মতো গাড়ি কোথায় যেনো যাচ্ছে। তাও আবার হাত ভাঙা পা ভাঙা। ঢুস মেরে কারা যেনো নাক-মাথা চেপটা করে দিয়েছে। কান্না কান্না আওয়াজ।

এ শহরের পথেঘাটে ঘোড়ার গাড়ি দেখা গেল না। টেক্সি-গাড়ি তাও নজরে এলো না। তাই রিক্সা চললো একরকম দৌড়ে দৌড়ে। পাঁচসাত মিনিটেই শহরের সীমা পার। এবার দু’পাশে গ্রাম- ধানি জমি। সেসব জমি থেকে উড়ে আসছে সুগন্ধি বাতাস। বাতাস কেটে কেটে রিক্সা একসময় পৌঁছে গেল গ্রামে, বাড়ির গেইটে। যে বাড়ির পরিচয় ঘাটুরা খাঁ বাড়ি।

এরি মধ্যে আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি। আব্বা-আম্মা ঘরে ঢুকে গেলেন মুরব্বিদের সালাম জানিয়ে। ফুপুরা চাচারা, চাচাত ভাই-বোনরা, দাদিরা এক মহাজটলা বাড়ির উঠানজুড়ে। আসেপাশের বাড়িঘর থেকেও এলো কারা যেনো।

গ্রামে এলেই এমন দৃশ্য বারান্দা, পুকুরঘাটে, উঠানের মাঝখানটায় ঘুরঘুর করে। এসব হৈচৈ এর ভিতর আম্মাকে খুঁজলাম। মোহাম্মদ আলী ভাইকে তালাশ করলাম। নজর আটকে গেল চাচাতো ভাইবোনদের ভিড়ে। একটা নতুন আনন্দের পুকুরে সাঁতার কাটছি মনে হলো। এরই মধ্যে রাতের পেটে ঢুকে পড়েছে সন্ধ্যা। এখন খাবার আয়োজন, ঘুমের আয়োজন। আব্বা-আম্মার দেখা মিললো এত সময় পর। মোহম্মদ আলী ভাইও যেনো কোত্থেকে বেড়িয়ে এলো।

আমাদের বাড়িটি বিশাল। বিঘার উপরে হবে সীমা। চার ভিটে চারখানা ঘর। একটি বেশ বড়, পাকা ভিটি। দাদা থাকেন এ ঘরে। প্রতিটি ঘরের বারান্দার পাশে ফুলগাছ। কোনটাতে ডালিম গাছ। পেছনের দিকটায় শান বাঁধানো ঘাটলাসহ পুষ্করিনী। যদিও ঘাটলাটি অনেক পুরনো। কোথাও কোথাও ভেঙে ভুঙে হা হয়ে আছে। মাঝখানে বড়সর উঠান। তরজার বেড়া দিয়ে আলাদা করা হয়েছে বাইর বাড়ি আর ভিতর বাড়ি। বাইরেও অনেক বড় উঠান। সে উঠানের শেষ কোনায় বিশাল একটি টিনের ঘর। ঘরের একধারে বাগান। নানান কিসিমের ফুলে ফুলে ঝকমক করে।

বড় বড় দু’টি আলমারি পাশাপাশি। ঠাসাঠাসি করে রাখা বই। এতটুকু ফাঁকফোকর নেই কোথাও। দরজার পাশে একখানা টেবিল, সেখানেও বই গাদাগাদি করা। ঘরটিতে প্রবেশ করলেই মনে হয় কোনো বইয়ের রাজ্যে ঢুকে পড়েছি। চোখ ঘোরালেই বই আর বই। মাঝ বরাবর বিশাল একটি পালং। সে পালঙের মধ্যমণি পীর দাদা। আমার দাদার বড় ভাই। সারা বেলাই শুয়ে বসে কাটান। কারণ তার শরীরের অর্ধেকটা অবশ। ফুপু না চাচা বলেছিলেন, তিনি নাকি অর্ধাংগ রোগী। হাঁটতে ফিরতে অসুবিধা হয়। বেশ কবছর থেকেই নাকি তার এরকম অবস্থা।

অবস্থা যাই থাক বইপত্রের সাথে তার বসবাস। অনেক লোকজন তাকে ঘিরে বসে থাকে। কথা হয়, কি কথা হয় কে জানে। বিশেষ করে বিকালের দিকটায় ভিড় জমতে থাকে। আমিও মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি দেই।

এতো বই! এই বুড়া মানুষটি কি করে এতোগুলো বই পাঠ করে। বইয়ের পাতায় পাতায় কি ছবি আছে? এমন ভাবানা হুট করে ঢুকে পড়ে মাথায়। দূর থেকে বই দেখি, পালঙে শুয়ে থাকা পীর দাদাকে দেখি। এরি মধ্যে তিন চারদিন পার করে ফেলেছি দাদাবাড়িতে। চাচাতো ভাই বোনদের নিয়ে হইহুল্লুড়, দৌড়ঝাঁপ একটা মজার সময়ের পেটে ঢুকে যাচ্ছি মনে হলো।

ঝাপসা হয়ে আসছে ঢাকা, ভিসতিওয়ালা আর বানরের মুখগুলো। এখানে প্রতিবাড়িতেই বাঁশবাগান, বকের ঝাঁক, কবুতরের ওড়াউড়ি। খাঁ-বাড়ির ফুলবাগান তো আছেই। কখন যেনো কুমিল্লার নামও ভুলে গেলাম।

দুপুরের আগের কিছুটা সময় ফাঁকাফাঁকা হয়ে যায়। ভক্তদের আনাগোনা তেমন থাকে না। সাহস করে একদিন ঢুকে পড়লাম পীরদাদার ঘরে। মনে হলো কোনো বইয়ের বাগানের মাঝখান দিয়ে হাঁটছি। কেমন একটা অচেনা গন্ধ মউমউ করছে ঘরময়। উড়ছে প্রজাপতির মতো। পুরানো বইয়ের গন্ধই বুঝি আলাদা, অন্যরকম। বুক টিপটিপ করে। একবার পীরদাদাকে দেখি আর একবার বই বোঝাই আলমারি। বেশ কতক বই দাদার বিছানায়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মোটা পাতলা হরেকরকম বই।

এভাবে দু-তিন দিন ঢুকলাম পীরদাদার ঘরে চুপচাপ। তৃতীয় দিন চোখাচোখি হয়ে গেলো। ইশারায় কাছে ডাকলেন। আমার বুকে তখন ঝিকমিক রেলগাড়ি। দুই কানের লতিতে ঝুলছে আগুনে বাতাস। ভয়ে ভয়ে কাছে ঘেঁষলাম। দাদার ঠোঁট থেকে বেড়িয়ে আসছে শিউলিফুল দল বেঁধে। অল্প সময়ে ভাব হয়ে গেলো পীরদাদার সাথে।

ঘর থেকে যখন আম্মার কাছে ফিরে এলাম দু’পকেটে অনেকগুলো লজেন্সে তখন। লজেন্সগুলো ছিল পীরদাদার উপহার। লজেন্সের লোভে-বইয়ের গন্ধে দাদার ঘরে যেতাম প্রায়ই। যতদিন ছিলাম গ্রামে। দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এলো সময়। আট-দশ দিন পার করে এসেছি এরিমধ্যে।

জাম-কামরাংগা-জাম্বুরা এসব গাছের সাথে কেমন যেন ভাব হয়ে গেছে। একেক গাছের একেক রকম রন্ধ। গন্ধের সাথে মাখামাখি করি সকাল-দুপুর। একটি অন্যরকম মায়ায় জড়িয়ে গেলাম। ফুলে ফুলে ছাওয়া লেবুগাছ। বাড়ির পেছনে বিশাল জংগল। লতা জাতিয় গাছে ঠাসা। সেখানে বাস করে শিয়াল কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে। মাঝে মধ্যে উঠে আসে শিয়ালবাচ্চার কান্না। কুকুর শিয়ালে ঝগড়া তো লেগেই থাকে। সে ঝগড়া দেখতে বেশ মজা।

দুপুরটা যখন নরম হয়ে আসে তখন মোহম্মদ আলী ভাই আমার সঙ্গী হন গ্রামেও। শিয়াল দেখে আসি। হলুদ রঙের চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। কি আশ্চর্য! একটুও ভয় পায় না ওরা। মনে হয় ওদের সাথে যেন অনেক দিনের জানাশোনা আমাদের। বাঁশের মগডালে বসে থাকে বক। কামরাঙা গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সবুজ টিয়া। পাতা আর টিয়া যেন একাকার। ওরা কামরাঙার লোভে আসে। এমনি দৃশ্যের পর দৃশ্য দাঁড়িয়ে থাকে পথ আগলে। গ্রামের পরিবেশটাই যেন কেমন কেমন। সবুজ বাতাসে ডুবে থাকে শরীর। ঝুরঝুর ঝরে বাঁশপাতা মনের উঠানে।

এই উঠান একদিন ছোট হয়ে আসে। আবার শহরের দিকে উড়াল। এবার কুমিল্লা শহর। কদিন আগে থেকেই আম্মার চলায় বলায় কিসের যেন একটা গন্ধ পাচ্ছিলাম। ওড়াউড়ি ভাব মোহাম্মদ আলী ভাইয়েরও। বড় মামা এসে হাজির। বলা নেই কওয়া নেই বড় মামা! ব্যাপার যে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম একটু একটু। এই বড় মামাই ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। ঢাকা ছাড়ার সময়ও সঙ্গি ছিলেন বড় মামা। এমনিতে বড় মামার সাথে খুব ভাব আমার। তাই তার উপস্থিতি আনন্দ আর খুশির উল্লাস চোখে মুখে লাফাতে শুরু করে। সে আনন্দ সারাবাড়ি জুড়েই যেন ছড়িয়ে পড়লো।

আম্মা দৌড়ে এলেন, সাথে বাড়ির অন্যরাও। বড় মামার আদর আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কেউ কেউ। এক সময় নেতিয়ে পড়ে আনন্দ। দুখের বাতাস বইতে শুরু করেছে হালকা চালে। মোহাম্মদ আলী ভাই জানালেন আমরা আগামীকালই রওয়ানা হচ্ছি কুমিল্লার দিকে। এমন একটা খবরের জন্য তৈরি থাকতাম প্রতিদিন। কারণ আম্মা বলেছিলেন যে কোনোদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া অর্থাৎ আমাদের গ্রাম ঘাটুরা ছাড়তে পারি। কেবল আব্বার ডাকের অপেক্ষা। সে ডাক কি শুনে ফেলেছেন আম্মা? হয়েতো হবে।

আট.

আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন। গাড়ির জন্য অপেক্ষা। সময়ের মাঝখান দিয়ে হাঁটাহাঁটি। বিদায়ের ক্ষণটি ছিলো মেঘের রাজ্যে ভাসমান। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে পড়ে এমন একটা ভাব। বারবার আঙ্গুল উঠছে চোখে, দাদি ফুপুদের। চাচাত ভাই-বোনরাও ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। টলমলে চোখে। আমারও কান্না পাচ্ছিল। বিদায়ের চেহারাটা বুঝি এ রকমেরই হয়। ঢাকা ছাড়ার সময়ও চোখে মুখে এসে জমা হয়েছিল এই জাতিয়ই কিছু। শীত শীত হাওয়া। এখানকার বাতাস অবশ্য গরম-ঠান্ডা মিলানো। কুমিল্লা শহর দেখার আগ্রহ আবার গ্রাম ছাড়তেও যেন কেমন কেমন লাগে। বকুলগাছ, রক্তজবা, বাঁশের ডগায় বকের ঝাঁক পথ আগলে দাঁড়ায় বারবার। গাড়ির বাঁশি শহর গ্রামের চিন্তায় এসে ধাক্কা দেয়। ঝিকঝিক শব্দ করে হাজির হয় কালো ইঞ্জিনের রেলগাড়ি। ইঞ্জিনের মাথা থেকে বেরিয়ে আসছে ধুসররঙের ধুয়া, সাথে ফোঁস ফোঁস শব্দ। এসব ইঞ্জিন নাকি কয়লা আর গরম পানিতে চলে। এজন্যেই নাকি এই ধরনের ইঞ্জিনকে বলে বাষ্প ইঞ্জিন। জর্জ স্টিফেনশন নামের কোনো এক ব্যক্তি তৈরি করেছিলেন। সময় তখন ১৮২৯ সাল। বড় মামা না দাদা জানিয়ে ছিলেন মাথায় শিং গজানো রেলের এই কালো ইঞ্জিনের খবর, ঠিক মনে নেই। ইঞ্জিনের তলায় জ্বলছে দাউ দাউ আগুন। ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনটি খুটিয়ে খুটিয়ে জানার। সাহসী মানুষটিকে দেখা। যিনি এই গাড়িটি চালান। কিন্তু বড় মামা আর আম্মার হৈচৈ আমার ইচ্ছাটিতে গুবলেট পাকিয়ে দিলো। আসলে সময়ও ছিল না। ভিড়তে ভিড়তেই আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। তাই চড়তে হলো ধুপধাপ করে। সেই আগের নিয়ম। আমি আর আম্মা মহিলাদের কামড়ায়। বড় মামা আর মোহাম্মদ আলী ভাই পুরুষদের বাগিতে। তখন স্টেশন জুড়ে হৈ রৈ রৈ শব্দ। চা-গরম, সিদ্ধ-ডিম, চানাচুর, কলা আরো কত কি নিয়ে দৌড়-ঝাঁপ দিচ্ছে হকাররা। গাড়িতে উঠতে না উঠতেই চলতে আরম্ভ করল গাড়ি। কে যেন ঘন্টা বাজাচ্ছে ঢং ঢং। অন্যদিকে ইঞ্জিনের ফুঁসফুঁস শব্দ আর বাঁশির আওয়াজ। জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন চলে যাচ্ছে পেছনে। একসময় আড়ালেই চলে গেল।

না রাত না দিন এমন একটা সময় এফুর ওফুর করে মাথা ঢুকিয়ে দিলো রেল স্টেশনের সীমায়। পাগলা মহিশের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে দাঁড়িয়ে গেল গাড়ি। আবার সেই হৈ-হল্লা। গাড়ি থেকে নামা উঠার ঠুকাঠুকি, এক এলাহি কান্ড আরকি। আম্মা তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নামবার জন্য তৈরি হলেন। আমার এক হাত আম্মার হাতে শক্ত করে বাঁধা। ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম আমরা কুমিল্লা স্টেশনে এসে গেছি। আব্বার জন্য আকুপাকু করছিল মন। দরজা বরাবর আসতেই দেখি বড় মামা আর আব্বা। তর সইছিল না একরকম, লাফিয়ে পড়লাম আব্বার কোলে। সাবধানে নামলেন আম্মা। কুমিল্লা স্টেশন অনেক বড়। এদিক সেদিক নজর ফেলে এমনটাই মনে হলো। হকার আর কুলিদের চিৎকার ডাকাডাকি পেছনে ফেলে রেলগাড়ি চলতে শুরু করলো আবার। কোথায় যাবে গাড়ি? পরের স্টেশনের কি নাম কে জানে। এমনি একটা ভাবনা ধাক্কা খেলো মগজে।

রিক্সার টুং টাং শব্দ ভাবনাকে আর বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দিলো না। নতুন ভাবনার সিঁড়িতে পা রাখলাম। হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে আসছে অন্ধকার। লাল বলের মতো সুরজটা উধাও ততক্ষণে। যাত্রীরা যাচ্ছে যার যার ঠিকানায়। ওরাওকি কুমিল্লায় এলো প্রথম, আমাদের মতো। কি জানি হতেও পারে। এরিমধ্যে আব্বা-আম্মা রিক্সায় উঠে পড়েছেন। অন্য রিক্সায় আমি আর বড় মামা। আমাদের রিক্সা আগে বাড়ছে। দু’পাশে দোকানপাট। আলো জ্বলছে মিটমিট। যেনো দোকানগুলোর ফাঁকে ফোকরে বসে আছে আলো আর অন্ধকার জড়াজড়ি করে। সড়কের দু’পাশে বাঁশের খুটির মতো দাঁড়িয়ে ঠাই। বেশ উঁচু লোহার খাম্বা। সেসব খুটির শেষ মাথায় জ্বলছে আগুনকুপির মতো। মনে হচ্ছে আলো আর আঁধারের লড়াই হচ্ছে সেখানে। রিক্সার টুং টাং শব্দ ছাড়া তেমন কোনো হৈ হুল্লুড় নেই আশপাশে। হঠাৎ এক দুখানা বাস-গাড়ি যাচ্ছে, আসছে। এরি মধ্যে অন্ধকারে ডুব দিয়েছে পরিবেশ, রাস্তা-ঘাট। আমরা যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। এ যাওয়ার শেষ যে কোথায় কে জানে। কিছু দূর যাবার পর রিক্সা একটি সরুমতো গালিতে ঢুকে পড়েলো। এ পথে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাস্তারও তিন অবস্থা। রিক্সা যেনো লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে। আমার কেবল ভয় ভয় লাগছিলো। এই বুঝি পড়ে যাবো। বড় মামা শক্ত করে ধরে রাখলেন আমাকে। সে রকম কিছু দেখাও যাচ্ছিল না। আলোর অভাবে। ফাঁকা ফাঁকা ঘরবাড়ি। সেগুলোতে মিটমিট জ্বলছে আলো। রাস্তার দুপাশে কোনো উঁচু খাম্বা আছে বলে মনে হলো না। থাকলে তো আলো জ্বলতো মাথায়। তবে প্রতিটি রিক্সার তলা থেকে আলো বেড়িয়ে আসছে। রিক্সার দুলুনিতে আলোগুলো দুলছে। অবাক দৃষ্টিতে সেই সব আলোর নাচন দেখে বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। উপরে আলো নেই কিন্তু তলায় আলো।

রিক্সাওয়ালারা বোকা নাকি। মাথায় এমন সব ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। বড় মামাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম রিক্সাওলাদের এরকম বোকামির বিষয়ে। বড় মামা হাসতে হাসতে বলেছিলেন এগুলো একধরনের ছোট মতো হারিকেন। যার আলোতে ওরা পথ চিনে চিনে চলে। ভাঙ্গা পথে এ সব ছোট হারিকেন রিক্সাওয়ালাদের সাহায্য করে। সাবধানবাণি শুনায়। সন্ধ্যা হলেই তারা তাদের রিক্সাগুলোর নিচের দিকে বাতিগুলো বেঁধে তবে পথে বের হয়। যারা এমন হারিকেন না রাখবে তাদের বকাঝকা করে, জরিমানা করে পুলিশ। পুলিশ কি? এমন একটি প্রশ্ন করতে যাবো এরিমধ্যে আমাদের রিক্সা একখানা দু’তলা দালানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো।

ঝি ঝি ডাকছে, আওয়াজ শুনে মনে হলো পোকার সংখ্যা কয়েকশ তো হবেই। গোটা তিনেক জোনাকি যাচ্ছে উড়ে। নীল বাতি ঠাহর করতে পাড়লাম না এখানে আলো বেশি না অন্ধকার। এদিক সেদিক নজর ঘোরালাম। তেমন কিছুই দেমাগে ধরা দিলো না। সবই আবছা আবছা। ফাঁকা ফাঁকা বাড়ি-ঘর। অন্ধকারেও এমনটাই মনে হলো। মানুষজনের সাড়াশব্দ কম। বেশ দূরে দূরে আলোর শিখা মিটমিট করছে। রিক্সার টুং টাং শব্দে ভাবনার সূতায় টান পড়লো। এরিমধ্যে আব্বা-আম্মা রিক্সা থেকে নেমে পড়েছেন, নামাচ্ছেন বাক্সপেট্টা। আমি আর বড় মামাও নামলাম। আমাদের সাথের মালপত্র নিয়ে।

নয়.

উঁকিঝুকি দিচ্ছে কারা জেনো। দুর্বল আলোতেও কয়েকটি মুখ। খুব কাছাকাছিই মনে হলো বাড়িগুলো। ওরাও কি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছে। এরিমধ্যে ঘরে ঢুকে পড়েছেন আব্বা। দরজা-জানালা সব খুলে দিলেন। আলো জ্বালালেন। রাস্তার খাম্বার বাতিঘরে? অবাক চোখে দেখছিলাম। ঢাকায় জ্বলতো হারিকেন, কাঁপা কাঁপা আলো। এখানে বিজলী বাতি। এ বাতির আলো ঘরের কোনা-কামছায় দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। হারিকেনের আলো ততটা হাঁটতে জানতো না। বারবার দেখি।

ঘর গোছানো কাজে আম্মা। খাট বিছানা চেয়ার টেবিল নিয়ে ব্যস্ত। ব্যস্ত আব্বা আর বড়মামাও। ঠায় দাঁড়িয়ে দেখি এসব। একবার ঘরে আবার বাইরে নজর ফেলি। আশপাশের বাড়ির বাতি নিবছে এক এক করে। এই সুযোগে দৌড়ে নামছে অন্ধকার। মনে হলো অনেকগুলো ভয় ফিশফাশ শুরু করেছে দরজা জানালার কপাটে ঠেস দিয়ে। আম্মা আমার মনের কাওসালিটা ধরে ফেললেন। দরজা এবং জানালার কপাটগুলো আটকে দিলেন দ্রæত। তারপর আব্বার সাথে কিসব পরামর্শ করলেন।

আম্মার চোখে-মুখে নীরবে বসে আছে আতংক। এ আতংক কি জ্বিন-ভূতের। হয়তো হবে। এখানেও সাবধান বাণী। বারান্দার দু’পাশ ঝুলানো হলো বাতি। আগুন দেখলে জ্বীন-ভূতেরা নাকি ভয় পায়। এমনটা আম্মার ধারণা। কুমিল্লার বাড়িটির দুপাশটায় ছিলো টানা বারান্দা। তারপর বিশাল উঠান। উঠানের শেষ মাথায় দু’টি বড় গাছ! একটি জাম অন্যটি জামরুল। জামরুল গাছের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আম্মাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। চোখের আকাশে ঘুমপরীদের ওড়াউড়ি। এতো অন্ধকারেও ওদের আনাগোনা টের পাচ্ছিলাম। একসময় রাতের আড়ালেই ঢুকে পড়লো ভাবনার প্রজাপতি। পরীদের পায়ে তখন ঘুমপাড়ানি নূপুর বাজছে রিনিক ঝিনিক।

ঘুম যখন ভাঙলো ততক্ষণে অনেকটাই উপরে উঠে গেছে সূর্য। আব্বা তৈরি হচ্ছেন বাইরে বেরুবেন। ঢাকার মতো একই রুটিন আব্বার। সকাল সকাল বাইরে যাওয়া আর দুপুরটা যখন থিতিয়ে আসে আসে ভাব তখন ঘরে ফেরা। আব্বা চলে গেলে কেমন যেনো খালি খালি হয়ে যায় পরিবেশ। কেবল আমি আর আম্মা ঘরবন্দি। মাঝেমধ্যে ওড়ে আসে জাম আর জামরুল পাতায় বাতাসের আছড়ে পড়ার শব্দ। বড়মামা চলে গেলেন। আম্মার চোখে-চেহারায় দুঃখ-বেদনা বসে থাকলো বেশ কদিন! বড়মামার কথা মনে হলেই কান্নারা এসে জড়ো হয় হুটহাট।

ভরাট হয়ে এলো একসময় পরিবেশের ফাকফোকর। আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে মহিলারা আসছেন। কারো কারো সাাথে বাচ্চা-কাচ্চাও। কেউ কেউ আমার বয়সের। ওদের সাথে ভাব হয়ে গেলো। খেলাধুলায় মেতে উঠলাম। আমরা যে দালানটিতে থাকতাম এর পেছনদিকে ছিলো টানা বরান্দা। সামনের দিকটায়ও ছোটমতো আরও একটি খালি জায়গা। এটিকে বারান্দাও বলা চলে। তারপর দু’ধাপ সিঁড়ি ভাঙলেই মাঠ।

বেশ বড়সর মাঠ। মাঠের ধার ঘেঁষে বিশাল দিঘী। পানিতে ভাসছে হাঁস দল বেধে। আমাদের দালানের মুখোমুখি শান বাঁধানো ঘাট বড়জোর পঞ্চাশ গজ দূরত্বে। এ ঘাটে কেউ গোসল করে। কেউ কেউ আবার মশগুল হয় আড্ডায়। দূরে দূরে ঘরবাড়ি। এক দু’টি দালান বাদে আর সব টিনের ঘর। তবে সাড়ি সাড়ি দাঁড়িয়ে আছে নানান কিসিমের গাছ। প্রায় বাড়ির উঠান ঘেঁষে ফুলবাগান। বাতাসে উড়ছে ফুল-পাতার সুবাস। এক মনোলোভা দৃশ্যের মাঝখানে বসে বসে আগে বাড়ে আমার সকাল।

ঢাকা আর কুমিল্লার চেহারা সুরতে ফারাক ছিল বিস্তর। এখানে গাছে গাছে একাকার। পাতায় পাতায় পাখির কোলাহল। আকাশটাকেও মনে হয় অনেক বড়। বহু দূর পর্যন্ত নীলের চাদরে টানটান। হাড়গোড় বেড়িয়ে থাকা ইটবিছানো অলিগলি। নেই বানরের উৎপাত, ঢাকার মতো। ঘোড়ার গাড়িরও দেখা পেলাম না, নতুন জায়গা নতুন দৃষ্টিতেই পরখ করার চেষ্টা করি। মাঝে মধ্যে আম্মাও এসে যোগ দেন। খুটিয়ে দেখেন অচেনা এলাকা। নাম না জানা পাড়া। পরে অবশ্য আব্বা বলেছিলেন এলাকাটির ’নাম ঠাকুরপাড়া।

দশ.

পশ্চিমে হেলতে থাকে ক্লান্ত দুপুর। তখন পাতার ফাঁক গলিয়ে ঝরে সরষেফুল রং নরম রোদ। এই রোদে হাঁটতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আম্মার বারণ। তাই ইচ্ছেঘরের কপাট বন্ধই থাকে। ঢাকায় অবশ্য সাথী ছিলো মোহাম্মদ আলী ভাই। ছাদে বসে দেখতাম বানরের দৌড়-ঝাঁপ। কুমিল্লায়ও ছাদ আছে। আমাদের দালানটিও দোতলা। কিন্তু নেই বানর, ছাদে যাবার সঙ্গী মোহাম্মদ আলী ভাই। মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই বেদনার দিঘীতে সাঁতার কাটলাম কিছু সময়। সুনসান পরিবেশ। এমনিতে ঠাকুরপাড়ায় মানুষজন কম। দু’একটি রিকসা ভাংগা সড়কে হাঁপাতে হাঁপাতে চলাফেরা করে। কোথায় গেলো মোহাম্মদ আলী ভাই। ভাবনারা দাঁড়িয়ে পড়লো হঠাৎ, আম্মার স্পর্শে।

কখন এসে অপেক্ষা করছেন কে জানে। মোহাম্মাদ আলী ভাইয়ের অভাবটা আম্মাই পুরণ করছেন ইদানিং। বিশেষ করে ঘরে। ঘরের কাছাকাছি জায়গাগুলোতে। সুযোগ মিলতেই আম্মার কাছে জানতে চাইলাম মোহাম্মদ আলী ভাই কোথায় গেল। আমরা তো একসাথেই গাড়িতে উঠেছিলাম। অনেকটা নরম কন্ঠেই জবাব দিলেন মোহাম্মদ আলী ভাই নাকি গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন। আখাউড়া না কোন স্টেশনে। সে এলাকায় তার ফুফু না খালা থাকে। কদিন বাদে আবার ঢাকা ফিরে যাবেন। এমন খবরে ব্যথারা আড়মোড় ভাঙতে থাকলো। মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের সাথে কি কখনো দেখা হবে না আর! একটা দুঃখের ¯্রােত বইতে থাকলো নিঃশব্দ। আম্মার সাথে ঘরে ঢুকলাম। বুঝলাম গোসলের সময় হয়েছে।

একটু বাদেই আব্বা ফিরবেন অফিস থেকে। তারপরের নিয়ম ঢাকার মতোই। খাওয়া-দাওয়া এরপর কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম। এ সময়টায় একা একা কাটে আমার। কোনো কোনো দিন ঘুমাতে যাই আব্বা-আম্মার বকাঝকায়। প্রায় দিনই ঘুম আসে না। শুধু ছটফট, এপাশ ওপাশ করেই সময় আগে বাড়ে। জানালার কপাট খুলে আকাশ দেখি। সেখানে একটা কি দু’টা চিল ভাসছে পাখা টান টান করে। একবার ওপরে ওঠে আবার নিচে নামে। এই ওঠা নামা দেখতে দেখতেই আসরের ওয়াক্ত হয়ে যায়। আম্মা-আব্বা তখন নামাজের প্রস্তুতি নেন। আমিও ঘুমের পাঠশালা থেকে ছুটি পাই।

মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের অভাবটা খামচে ধরে মনে, দেমাগে। দৃশ্যের পর দৃশ্য জড়ো হতে থাকে চোখের জমিনে! লোহারপুল বানরের দৌড়-ঝাপ শালবন ভূতের গলি আরো কতো কি। ভাবনারা বেশি দূর আগে বাড়তে পারে না আর। থমকে দাঁড়ায়। বাড়ির সামনের মাঠে খেলার সাথীদের আনাগোনা হৈ-হল্লুড়ের আওয়াজ এসে আছড়ে পড়ে ভাবনার তালুতে। আশপাশের দু’একজনের সাথে ভাব হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ওদের অনেকেই আমার বয়সের, দু’একজন বড়ও হতে পারে। ফুটবল খেলেই বিকালটা কাটতো আমাদের। প্রায় প্রতিদিনই জাম্বুরা ছিলো আমাদের ফুটবল। জাম্বুরার অভাবে কোনো কোনো দিন কাগজের পুটলিই ছিলো ভরসা।

তখনো ক্রিকেটের এমন রমরমা অবস্থা ছিলো না। তাই পাড়ায় পাড়ায় চলতো ফুটবল খেলার ধুম। কি ছোটরা কি বড়রা। আমাদের মতো কম বয়সীদের কাছে জাম্বুরাই ছিলো আসল বলের বিকল্প। তাই খেলতে খেলতে হাড়-মগজ সব বেড়িয়ে আসত জাম্বুরার। এমনটা প্রায়শই ঘটতো। সেদিন নতুন জাম্বুরার সন্ধানে নামতে হতো। আর না হয় খেলার সমাপ্তি। চামড়ার বল নিয়ে মাঠে নামতো বয়স্করা। কিন্তু সে সব বল ছিলো আমাদের নাগালের বাইরে। দূর থেকে শুধু দেখতাম চামড়ার বল মাঠের উত্তর থেকে দক্ষিণে যাচ্ছে। কখনো ভাসছে হাওয়ায়। ছুঁতে ইচ্ছে করতো।

একদিন একখানা বল নিয়ে এলেন আব্বা, জাম্বুরা সাইজের। সেটি ছিলো রাবারের। লাল নীল বেগুনী রং এর। আনন্দ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে চোখে মনে। বল থেকে বেড়িয়ে আসছে একটা ভিন্ন গন্ধ। যে গন্ধ ঝুলে থাকে কদমফুলে। কখন সকাল হবে এরপর কখন বিকাল আসবে সে সব ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। সে রাতে আধপেট খেয়েই ঘুমাতে গেলাম। বালিশের পাশেই রাখলাম নতুন বলটি। কিন্তু ঘুম আর ধরা দিলো না। মনের মাঠে কেবল বল, যাচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। শুয়ে থাকলাম নিঃশব্দ। ঘুমের সাথে আজ আড়ি।

জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *