কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে- বার বার গবেষকদের এমন কঠোর সতর্কবার্তার কারণে এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও জোরালো হয়েছে।
সম্প্রতি কিছু পূর্বাভাসে অত্যন্ত হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে এআই পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, এমন সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি।
তবে এআই জগতের অন্যরা এসব পূর্বাভাসের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বরং বড় উদ্বেগের বিষয় হলো- মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ এআই ব্যবহার করতে পারে। এই ধরনের প্রলয়সংকেতমূলক বার্তা আসছে এআই জগতের একটি অংশ থেকে, যাদের প্রায়ই ‘এআই ডুমার্স'(AI Doomers) বলা হয়।
কিন্তু অনেকেরই বড় প্রশ্ন হলো, এই ‘ডুমার্স’রা ঠিক কীভাবে মনে করেন যে একটি এআই মানবজাতির অবসান ঘটাতে পারে।
গবেষকেরা যেসব সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করছেন, তার কয়েকটি বিবেচনা করেছেন সাইবার সংবাদদাতা জো টাইডি।
পরিস্থিতি এক: অবকাঠামোয় হ্যাক
প্রথম পরিস্থিতিটি সংক্ষেপে তুলে ধরেছিলেন জ্যাকব কক্সটন, যিনি আগে ওপেন এআই এবং পরে অ্যানথ্রপিক-এর গবেষক ছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বেশ নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করেন। তিনি মানবজাতির জন্য ঝুঁকির কথা বলে সতর্ক করেন এবং যুক্তি দেন যে এসব প্রতিষ্ঠান “মানুষের জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে”।
তিনি বিবিসিকে বলেন, এআই-এ “অবিশ্বাস্য গতিতে অগ্রগতি” হওয়ার ফলে যেসব বিষয় আগে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন “বাস্তবে পরিণত হচ্ছে”।
একটি ‘সুনির্দিষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে তিনি বলেন, “এআই পৃথিবী যেসব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে, সেগুলোতে হ্যাক করতে পারে”। তার কল্পিত পরিস্থিতিতে একটি নিয়ন্ত্রণহীন এআই ব্যবস্থা ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে পারে।
যদি এআই এসব ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিদ্যুৎ, তাপ নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া অগণিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। আরও এগিয়ে গিয়ে কেউ কেউ এমনও বলেছেন যে পারমাণবিক বিপর্যয়ও সম্ভব হতে পারে।
পরিস্থিতি দুই: এআইয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
পরবর্তী পরিস্থিতিটি এসেছে বিস্তারিত ও প্রভাবশালী, তবে একই সঙ্গে অত্যন্ত অনুমাননির্ভর, গবেষণাপত্র ‘এআই ২০২৭’ (AI 2027) থেকে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে একদল এআই গবেষক এটি প্রকাশ করেন। এর সহলেখক থমাস লারসেন সম্প্রতি বিবিসিকে বলেন, প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে প্রযুক্তির অগ্রগতি আরও দ্রুত হয়েছে। তিনি যে পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেটির বর্ণনাও দেন।
তিনি বলেন, পরিস্থিতিটি এমন হতে পারে যে “এআই নিজেকে বারবার উন্নত করছে এবং তা ক্রমে এমন এক এআইয়ে রূপ নিচ্ছে, যার হাতে বিপুল সংখ্যক রোবটের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। অর্থনীতির অধিকাংশ প্রত্যক্ষ কাজ তখন এসব রোবট সম্পাদন করবে। কিন্তু সেটি মানুষের জন্য উপকারী নয়, বরং নিজের স্বার্থসিদ্ধি নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছে। এরপর শেষ পর্যন্ত এটি একটি জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা অধিকাংশ মানুষকে হত্যা করবে। তারপর এটি নিজেই রোবটনির্ভর অর্থনীতি চালিয়ে যাবে এবং মানুষের আর প্রয়োজন থাকবে না।”
পরিস্থিতি তিন: একটি লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া
আরেকটি পরিস্থিতিতে মানবজাতির সমাপ্তি ঘটে ভুলবশত। তথাকথিত ‘পেপারক্লিপ ম্যাক্সিমাইজার হাইপোথিসিস’ দুই দশকেরও বেশি আগে কল্পনা করেছিলেন সুইডিশ দার্শনিক নিক বোস্ট্রম। তিনি এটিকে একটি ‘চিন্তার পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে একটি কাল্পনিক এআই ব্যবস্থার একমাত্র লক্ষ্য হলো যত বেশি সম্ভব কাগজের ক্লিপ তৈরি করা।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এটি আমাদের ঘৃণা করে না বা মানুষের ওপর ক্ষুব্ধও নয়। কিন্তু এটিই তার একমাত্র লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে ক্ষমতা বৃদ্ধি বা আরও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠার মতো কিছু সহায়ক উপ-লক্ষ্য তৈরি হতে পারে।”
“এরপর ধারণাটি হলো, কাগজের ক্লিপ বা অন্য যেকোনো লক্ষ্য অনুসরণ করা যথেষ্ট শক্তিশালী কোনো সত্তার এমন উপ-লক্ষ্য থাকতে পারে, যা মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কারণ তাকে থামানোর জন্য মানুষ না থাকলে সে আরও বেশি কাগজের ক্লিপ তৈরি করতে পারত।”
প্রথমবার এই পরিস্থিতির বর্ণনা দেওয়ার দুই দশক পর বোস্ট্রম বিবিসিকে বলেন, এই ‘কার্টুনধর্মী’ কাহিনির উদ্দেশ্য ছিল দেখানো যে, কোনো অতিবুদ্ধিমান ব্যবস্থার মানবতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে নির্দিষ্ট শত্রুভাবাপন্ন লক্ষ্য থাকার প্রয়োজন হয় না। তিনি বলেন, এখন তিনি এআই সম্পর্কে ‘দ্বিধাবিভক্ত’। এর সম্ভাব্য সুফল নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত, তবে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।
পরিস্থিতি চার: অজানা
এআই নিরাপত্তা নিয়ে আরেকটি মতবাদ রয়েছে, যার মতে অতিবুদ্ধিমান এআই কীভাবে বা কেন মানুষকে হত্যা করতে পারে, তা অনুমান করার চেষ্টা করাই অর্থহীন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই যুক্তি তুলে ধরেন আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশান ফর সেইফ অ্যান্ড এথিক্যাল এআই – এর সভাপতি স্টুয়ার্ট রাসেল।
তিনি বলেন, “যদি আপনি কল্পনা করেন যে শিম্পাঞ্জিদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, ঠিক কীভাবে মানুষ তাদের বিলুপ্ত করে দেবে, তাহলে তাদের পক্ষে উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন হবে। কারণ আমরা যা করি, তারা তা বোঝে না।”
“আমরা নানা পরিস্থিতি কল্পনা করতে পারি… কিন্তু আমি মনে করি, আলোচনাটি এই ধারণার ওপর নির্ভর করতে হবে যে আমরা যখন মানুষের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান কিছু তৈরি করব, তখন কী ঘটবে সে বিষয়ে আমাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।”
মাইক্রোসফট এআই -এর প্রধান মুস্তাফা সুলেইমান-ও সম্প্রতি এ বিতর্কে অংশ নেন। তিনি সতর্ক করেন, এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত নয়, যা নিজেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে, অর্থ উপার্জন করতে পারে এবং সম্পদের মালিক হতে পারে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, এর অর্থ হবে “মূলত সিলিকনভিত্তিক একটি নতুন প্রজাতির বীজ বপন করা”, যা “মানবতাকে যতই গুরুত্ব দিক বা ভালোবাসুক না কেন, নিঃসন্দেহে সম্পদের জন্য আমাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে”।
এসব কতটা বাস্তবসম্মত?
সবকিছুই বেশ হতাশাবাদী এবং অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনায়। কিন্তু এআই জগতে এমন একটি উল্লেখযোগ্য এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চকণ্ঠ গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মনে করে এই পরিস্থিতিগুলোর কিছু বা সবই বাস্তব সম্ভাবনা, যদিও সেগুলো অবশ্যম্ভাবী নয়।
সাম্প্রতিক উদ্বেগের পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে ওপেন এআই, অ্যানথ্রপিক এবং মেটা-এর এআই এজেন্টগুলোকে ঘিরে সাম্প্রতিক কিছু নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ এবং হ্যাকিংয়ের ঘটনা। সাইবার নিরাপত্তা জগতের কেউ কেউ জোর দিয়ে বলছেন, মডেল নির্মাতাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার কর্তৃপক্ষ সিআইএসএ-এর সাবেক প্রধান এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন আয়োজনকারী আরএসএ কনফারেন্স -এর প্রধান নির্বাহী জেন ইস্টারলি বলেন, “এই যন্ত্রগুলো, নিরলস, অবিরাম লক্ষ্যপূরণে সচেষ্ট এবং অত্যন্ত সক্ষম যন্ত্রগুলো যা-ই করুক না কেন, তা তাদের নির্মাণপদ্ধতির ফল।”
তিনি বলেন, “মূল কথা হলো, আপনি যদি প্রযুক্তি নির্মাতা হন, তাহলে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আপনার সক্ষমতা নকশা, উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং সরবরাহ করা উচিত।” আবার এমনও অনেকে আছেন, যারা মনে করেন এআইয়ের ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা মানবজাতির অবসান ঘটানোর পর্যায়ের নয়।
বিজ্ঞানী ও লেখক গ্যারি মার্কাস দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা ও আইনি বিধিনিষেধ ছাড়া বড় এআই কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছেন। তবে তিনি মনে করেন না যে এই প্রযুক্তি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তিনি বলেন, “এআই যদি সত্যিই মানবজাতির ওপর বড় ধরনের ক্ষতি চাপিয়ে দিত, বা তা করতে চাইতও, যা নিজেই বড় প্রশ্ন, তাহলে মানুষ পাল্টা প্রতিরোধ করত!”
“আমরা সব ডেটা সেন্টার ধ্বংস করে দিতাম এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালাতাম। তাই সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, অর্থাৎ কেউই বেঁচে থাকবে না এবং কেউ পুনর্গঠনও করবে না, এমনটা আমি কল্পনা করতে পারি না।”
মার্কাস মনে করেন, বর্তমানে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে, অথচ মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ এআই ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালাতে পারে, এমন তুলনামূলক বেশি সম্ভাব্য সমস্যার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হচ্ছে না।
প্রলয়সংকেতমূলক পরিস্থিতিগুলো বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চললেও ওপেন এআই, অ্যানথ্রপিক এবং মেটা-সহ বিভিন্ন এআই প্রতিষ্ঠান এখন প্রকাশ্যে উন্নয়নকাজের গতি কমানো এবং নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণায় বেশি মনোযোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করছে।
লারসেন বলেন, “এআই নিরাপত্তা অবশেষে যে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য ছিল, তা পাচ্ছে দেখে আমি সত্যিই খুব খুশি।” তিনি যোগ করেন, “আমি আশা করছি, এই বড় সামাজিক প্রতিক্রিয়া এমন একটি কার্যকর নীতিগত জবাব তৈরি করবে, যা সত্যিই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।”
তবে প্রকৃত আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজন হবে। আর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিশ্বাস করেন এআই নিরাপত্তা নিয়ে ভয়-আশঙ্কা একটি ‘প্রতারণা’। বিবিসি

