মিডিয়া যতদিন জাগ্রত থাকে, একটি সমাজও ততদিন জাগ্রত থাকে: বিরোধী দলীয় নেতা আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান

সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

মুনশী ইকবাল সিলেট

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, গণমাধ্যম সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। একটি স্বাধীন, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমই সমাজকে সজাগ রাখে। মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনে। তিনি বলেন, মিডিয়াকে বলা হয় সমাজের আয়না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন কোনো কিছু আড়াল থাকে না, তেমনি একজন প্রকৃত সাংবাদিকও কোনো তথ্য বিকৃত বা পরিবর্তন না করে মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরেন। এ কারণেই সাংবাদিকদের সমাজের বিবেক বলা হয়। মিডিয়া যতদিন জাগ্রত থাকে, একটি সমাজও ততদিন জাগ্রত থাকে। আর বিবেকের মৃত্যু হলে সমাজেরও মৃত্যু ঘটে।

শনিবার (১ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে দৈনিক জালালাবাদের ৩৪তম বর্ষ পদার্পন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জালালাবাদ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি এই পত্রিকার প্রতি একটি অনুরোধ রাখব- আমাদের অঙ্গীকার ছিল জালালাবাদ কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হবে না, এটি হবে জনগণের মুখপাত্র। কোন দল কখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে, সেটি আল্লাহ তাআলার ফয়সালা। কিন্তু জালালাবাদকে অবশ্যই নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

তিনি বলেন, এই নীতিগত অবস্থান বজায় রাখতে গিয়ে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের রোষানলে পড়তে হয়, তাতেও আপত্তি নেই। এমনকি এ পথে চলতে গিয়ে যদি পত্রিকাটি বন্ধও হয়ে যায়, তবুও নীতির প্রশ্নে যেন কখনো আপস করা না হয়। পত্রিকার পৃষ্ঠাসংখ্যা ছোট হতে পারে, কিন্তু তার সংবাদ অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে এবং জনগণের কথা বলতে হবে।

জামায়াত আমীর আরও বলেন, সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে যদি কোনো সংবাদ আমার বিরুদ্ধে যায় কিংবা আমার দলের বিরুদ্ধেও যায়, তবুও জালালাবাদ যেন সত্য প্রকাশে পিছপা না হয়। একটি গণমাধ্যম যখন নির্ভয়ে সত্য তুলে ধরে, তখন মানুষের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতি বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকটের কথা উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আজ আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো আস্থার সংকট। মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করতে চায় না। আমি প্রত্যাশা করি, দৈনিক জালালাবাদ তার বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে এই আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে সমাজকে সহায়তা করবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবাদপত্র সোসাইটির ভ্যানগার্ড। আর গণমাধ্যমের দুটি অংশ নিউজ ও ভিউজ। নিউজ হচ্ছে হুবহু তথ্য তুলে ধরা। আর ভিউজে গণমাধ্যম তার মতাদর্শ অনুযায়ী রঙ মাখিয়ে তুলে ধরে। সেটা জনগণ গ্রহণ করবে কি না, সেটা জনগণের বিষয়। কিন্তু আমরা নিউজ ও ভিউজের মধ্যকার পার্থক্য গুলিয়ে ফেলি।

তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, সাংবাদিকরা নিজেরা জিতে, জাতিকে জিতাবেন। গণমাধ্যম চতুর্দিক থেকে দেখে, যতদিন এভাবে দেখেছে, ততদিন জাতি গতি পেয়েছে। আমি শফিকুর রহমান কালো হলে কালোই বলবেন, ভালোবাসার কারণে সাদা বানাবেন না। তাতে কোনো আপত্তি নেই। এতে আমিও ভূল শোধরাবো। এটা করলে জাতি সঠিক পথে চলবে।

বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সংকট আস্থার জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আস্থার সংকট ফিরিয়ে আনতে না পারলে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না। যে দেশের পাসপোর্টের মান সবচেয়ে বেশি, তারাই তত মর্যাদাবান জাতি। যে দেশের পাসপোর্টধারীর বিনা ভিসায় সবচেয়ে বেশি দেশে যেতে পারেন, তারাই সবচেয়ে মর্যাদাবান। সেই জায়গায় আমাদের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল।

গণমাধ্যম সবচেয়ে পাওয়ারফুল মন্তব্য করে জামায়াত আমীর বলেন, গণমাধ্যম যতদিন সঠিক পথে থাকে, সেই দেশ ততদিন সঠিক পথে থাকে। সাংবাদিকরা বীরের জাতি। বীররা কখনো হারে না। আপনারা জিতবেন, জাতিকে জিতাবেন।

বক্তব্যের শেষে তিনি দৈনিক জালালাবাদ পরিবারের উত্তরোত্তর সাফল্য, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু কামনা করে মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করেন এবং দেশের গণমাধ্যমে সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার ধারা আরও শক্তিশালী হোক, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর-এর সভাপতিত্বে ও যুগ্ম বার্তা সম্পাদক আহবাব মোস্তফা খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী, মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেটস্থ ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারী রাজেশ ভাটিয়া, জালালাবাদ সিন্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, সিলেট প্রেসক্লাব সেক্রেটারী মোহাম্মদ সিরাজুল ইাসলাম।

শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সিলেট ইউনাইটেড জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের আহবায়ক কবির আহমদ সোহেল, সিলেট প্রেসক্লাব সহ-সভাপতি ফয়ছল আলম, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিলেট ব্যুরো প্রধান শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল, ইমজা সেক্রেটারী আনিস রহমান, ফিলিপাইনের ক্রিস্টিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ওয়াদুদ টিপু, সিলেট মেট্রোপলিটন জার্নালিস্ট ইউনিয়নের সভাপতি বদরুদ্দোজা বদর, সিলেট বিভাগীয় ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন, দৈনিক কাজির বাজারের বার্তা সম্পাদক সোয়েব বাছিত। শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন জালালাবাদের সিনিয়র রিপোর্টার মুনশী ইকবাল। অনুষ্ঠান শেষে দোয়া পরিচালনা করেন কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফিজ মিফতাহুদ্দিন আহমদ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, আল রাইয়্যান হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. হোসাইন আহমদ, ফুলকলি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ডিজিএম জসিম উদ্দীন খন্দকার, দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার, দৈনিক সংগ্রামের সিলেট ব্যুরো প্রধান কবির আহমদ, সিলেট প্রেসক্লাবের পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মুহিবুর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক চৌধুরী দেলোয়ার হোসেন জিলন, আমিরুল ইসলাম এহিয়া, এখন টিভির রিপোর্টার সন্দিপন শুভ, সিনিয়র ক্যামেরাপার্সন এসএ আলমগীর, দেশ টিভির ক্যামেরা পার্সন সোহেল আহমদ।
জালালাবাদ পরিবারের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র রিপোর্টার তামিম মজিদ ও এমজেএইচ জামিল, স্টাফ রিপোর্টার মামুন পারভেজ, অনলাইন ইনচার্জ মারুফ হাসান, স্টাফ ফটোগ্রাফার জয়নাল আবেদীন আজাদ, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক আব্দুস সাত্তার মুন্না।

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বলেন, আমার বুদ্ধির উন্মেষ হয়েছে পত্রিকা পড়ে। আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন যুগভেরী পত্রিকায় কবিতা লেখি। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশের গণমাধ্যম ঘুমে থাকলেও জালালাবাদ ঘুমায় না। সারা দেশের সঠিক তথ্য তুলে ধরে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। জালালাবাদ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনার এ ধারা অব্যাহত রাখবে।

তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ধরে রাখতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে তরুণদের আত্মত্যাগ ধরে রাখতে হবে। শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের নামে একটি সড়কের নামকরণের প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, নানা মত পথ থাকবে। তবে মত পথের কারণে শহীদদের অবদান যাতে খাটো করে না দেখা হয়।
সিলেট মহানগর বিএনপির এমদাদ হোসেন চৌধুরী, বলেন, জালালাবাদ জনগণের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করুক। জনগণের সঠিক তথ্য তুলে ধরুক। সত্যিকার অর্থে জনগণের গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। এটাই আশা করি।

সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতির ইতিহাস তুলে ধরে সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনে জালালাবাদ সিলেটের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। তারা সকল রক্তচক্ষু উপক্ষো করে সাহসী সাংবাদিকতার মাধ্যমে সিলেটের ঐতিহ্য ও সম্প্রীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, বস্তনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় দৈনিক জালালাবাদ কখনোই আপোষ করেনি। ফ্যাসিবাদ আমলেও এই পত্রিকা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সঠিক তথ্য জনগণের কাছে তুলে ধরেছে। অন্যায় ও ভয়ের কাছে কখনো মাথা নত করেনি। তিনি দৈনিক জালালাবাদের উত্তোরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেটস্থ ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারী রাজেশ ভাটিয়া বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে কাজ করছে হাইকমিশন। দু’দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বন্ধন অটুট থাকুক, এই কামনা করি। তিনি অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনকে আমন্ত্রণ জানানোয় দৈনিক জালালাবাদকে ধন্যবাদ জানান।

সিলেট প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম শহীদ সাংবাদিক এটিএম তুরাবের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সিলেটের সংবাদপত্রের নানান সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সিলেটের আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলো সগৌরবে টিকে আছে। সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দৈনিক জালালাবাদ সেই গৌরবের অংশীদার। তিনি জালালাবাদ পত্রিকার সাহসিকতা ও নীতির প্রশ্নে আপোষহীন থাকার প্রশংসা করেন।
জালালাবাদ সিন্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল হান্নান জালালাবাদের সুখে দুখে যারা অতীতে ছিলেন এবং বর্তমানে আছেন, সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

স্বাগত বক্তব্যে দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর শুরু থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত জালালাবাদের দীর্ঘ এই পথযাত্রায় নানান স্মৃতি তুলে ধরেন। এসময় তিনি জালালাবাদের যাত্রাকালীন সময়ে বর্তমান আমীরে জামায়াতসহ বিশিষ্টজের অবদানের কথা স্বীকার করেন। তিনি জালালাবাদ সিলেটবাসীর আস্থার জায়গা অক্ষুন্ন রেখে আগামীতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জালালাবাদের সহকারী সম্পাদক কবি নিজাম উদ্দীন সালেহ। তিনি জালালাবাদের দীর্ঘ যাত্রাপাথের নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আসার স্মৃতির কথা তুলে ধরেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *