সাঈদ চৌধুরী
রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) বাদ আসর নিজ বাড়ির পার্শ্ববর্তী জকিগঞ্জ থানাবাজার মাদ্রাসা (শাহী ঈদগাহ) মাঠে অনুষ্ঠিত মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেছেন, প্রবীন শিক্ষক ও সমাজসেবী, জকিগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমীর মাস্টার আব্দুল খালিক সারাটা জীবন ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছিলেন আত্মনিবেদিত। তিনি একটি কল্যাণমুখী, ইনসাফভিত্তিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ গঠনের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। নিজে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত পথে জীবন-যাপন করেছেন এবং সন্তানদেরও পরিচালিত করেছেন। তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ ও সুদৃঢ় ঈমানে অধিকারী।
জানাজার পূর্বে উপস্থিত মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান, সাবেক জকিগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র বিএনপি নেতা ইকবাল আহমদ, মাজলিসুল মুফাসসিরীন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী, বিশিষ্ট শিল্পপতি জাতীয় পার্টি নেতা সাইফুদ্দিন খালেদ, খেলাফত মজলিশ নেতা মখলিছুর রহমান চৌধুরী, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাবেক প্রধান শিক্ষক কুতুব উদ্দিন, মাওলানা আব্দুল বাছিত প্রমুখ।
পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পিতার জন্য দোওয়া কামনা করে বক্তব্য রাখেন ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও সিলেট মহানগর জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি, বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী সিরাজুল ইসলাম শাহীন।
জকিগঞ্জ উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারী সরওয়ার হোসেনের পরিচালনায় আলোচনা পর্বে বক্তারা মরহুমের ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ, দ্বীনের পথে অবিচলতা, জ্ঞানার্জন ও শিক্ষকতা, সদাচরণ ও পরোপকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং মহান মাবুদের কাছে তাঁর রুহের মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করেন।
জানাজায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির হাফিজ মাওলানা আনোয়ার হোসেইন খান, হাজী কুদরতউল্লাহ জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব হাফিজ মাওলানা মিফতাহ উদ্দিন, সাবেক জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সিলেট জেলা জামায়াত সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন, সাবেক দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদ, জকিগজ্ঞ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা জালাল উদ্দিন, কানাইঘাট জামায়াতের আমীর মাওলানা কামাল উদ্দিন ,সাবেক আমীর মাওলানা আব্দুল করিম, সাবেক জকিগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম রোকবানী চৌধুরী জাভেদ, জামায়াত নেতা ফয়জুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুর রহিম, কানাইঘাট উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা ফয়সল আহমদ, ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট জেলা ও জকিগঞ্জ উপজেলা নেতৃবৃন্দ সহ বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের এলাকাবাসী। জানাজা অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা গণমাধ্যমের কাছে প্রবীন শিক্ষক ও জামায়াত নেতা মরহুম আব্দুল খালিক সাহেবের আমল ও আখলাকের প্রশংসা করেন।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম শাহীন। জানাযার পরে মরদেহ খাটিয়ায় বহন করে মরহুমের জীবনের স্মৃতিময় হাজারিচক জামে মসজিদ প্রাঙ্গনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মসজিদ সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জীবনের দীর্ঘ সময়কাল তিনি এই মসজিদের মোতাওয়াল্লী ছিলেন।
দাফন শেষে উপস্থিত সকলকে নিয়ে জেলা জামায়াত আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান মোনাজাত পরিচালনা করেন। তারপর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ জনদের সাথে কিছু সময় অতিবাহিত করে আবারো দোআ পরিচালনা করেন মরহুমের বড়ছেলে সিরাজুল ইসলাম শাহীন।
এদিকে, প্রবীন শিক্ষক ও সমাজসেবী মরহুম আব্দুল খালিকের প্রতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছে জকিগঞ্জ উপজেলার সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘জোবেদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ কর্তৃপক্ষ। এই স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্টাতা শিক্ষক মরহুম আব্দুল খালিক। সিলেট থেকে মরদেহ সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় মরহুমের দীর্ঘদিনের স্মৃতি বিজড়িত ক্যাম্পাসে রবিবার বেলা ১১টায়। সেখানে তখন এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী শেষবারের মতো তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই মিলে অশ্রুসিক্ত নয়নে মহান আল্লাহর দরবারে মরহুমের রুহের মাগফিরাতের জন্য দোওয়া করেন। উল্লখ্য, ১৯৭৮ সালে স্কুল প্রতিষ্টার সূচনা থেকে কর্মজীবনের প্রাণবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে ১৯৯৯ সালে এখান থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) বাদ আসর হাজারিচক জামে মসজিদে মাস্টার আব্দুল খালিক স্মরণে আলোচনা ও দোওয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মরহুমের কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন জকিগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা জালাল উদ্দিন, ইসলামী ছাত্র শিবিরের থানা সেক্রেটারী নাজিম আহমদ চৌধুরী এবং মহল্লার পক্ষে জনাব রানু মিয়া।
মরহুমের বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম শাহীন বাবার স্মৃতি বিজড়িত মহল্লাবাসীর প্রতি তাঁর মরহুম পিতা, পরিবার ও নিজের জন্য বিশেষভাবে দোয়ার দরখাস্ত রাখেন। পিতার ইন্তেকালের পর থেকে জানাজা, দাফন ও দোয়ায় অংশগ্রহণ-সহ সামগ্ৰিক কার্যক্রমে অকৃত্রিম সহযোগিতার জন্য এলাকাবাসী এবং সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।
মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের যারা আজ আর আমাদের মাঝে নেই- তাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণে রেখে আমাদের সকলকে মসজিদের হক আদায়, নিয়মিত জামাতে শরিক হওয়া ও সন্তানদের মসজিদ মূখী করতে সচেষ্ট হওয়ার আহবান জানান সিরাজুল ইসলাম শাহীন। একইসাথে মহল্লার ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য বজায় রাখার অনুরোধ করেন। তিনি ইসলামী আন্দোলনের ভাইদের প্রতি দ্বীনি দাওয়াত জকিগঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঘরে সঠিকভাবে পৌছিয়ে দেয়ার পূর্বসূরীদের আমানতের কথা স্মরণ করে দেন।
অনুষ্ঠানে কুরআন তেলাওয়াত ও দরূদ পাঠ শেষে হাজারিচক জামে মসজিদের ইমাম সাহেব মোনাজাত পরিচালনা করেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জকিগঞ্জ উপজেলা শাখার সাবেক আমীর, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক মাস্টার আব্দুল খালিক গত শুক্রবার (৩ জুলাই ২০২৬) রাত ১০টা ২৫মিনিটে সিলেট শহরে ইন্তেকাল করেন। ছাত্র জীবনে ১৯৬২ সালে তিনি ইসলামী ছাত্র সংঘে এবং কর্মজীবনে ১৯৬৮ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে জকিগঞ্জে দায়িত্বপালন করেন। এ সময় তৎকালীন আমীরে জামায়াত ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আজম জকিগঞ্জের কালীগঞ্জ সফর করেন।
মরহুম আব্দুল খালিক দীর্ঘদিন জকিগঞ্জ থানা জামায়াতের নাযেম ও পরবর্তীতে আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি ও সমবায় সমিতি এসোসিয়েশনেরও সেক্রেটারী ছিলেন। এছাড়া হাজী তৈয়ব আলী মহিলা মাদ্রাসা ও ইলাবাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং হাজারিচক জামে মসজিদের মোতওয়াল্লী ছিলেন। ৮৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি স্ত্রী, ২ ছেলে, ১ মেয়ে, নাতি-নাতনি-সহ বিপুল সংখ্যক গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
উল্লেখ্য, মাস্টার আব্দুল খালিকের শারিরিক অবস্থার অবনতি হলে ২ জুন সকালে বিরোধীদলীয় নেতা ও আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এমপি তাঁকে দেখতে সিলেট শহরের বাসভবনে যান এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। ৩ জুলাই শুক্রবার রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। রবিবার জানাজা শেষে তাঁকে হাজারিচক জামে মসজিদ সংলগ্ন পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অশ্রুসিক্ত বিদায় নিয়ে পিতা-মাতার কবরের পাশেই শায়িত হলেন মাস্টার আব্দুল খালিক।
আল্লাহর জমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের সংগ্রামে নিবেদিত মরহুম আব্দুল খালিক সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই বলতেন, ”জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে কি না এটা বড় বিষয় নয়, দেশের মানুষ জামায়াতকে প্রাণভরে ভালোবাসে- মৃত্যুর আগে এই দৃশ্য দেখে যেতে পারছি, এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া।”
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

