বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার অর্থ ব্যয়ের কর্তৃত্ব নিয়ে কী হচ্ছে

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

রাকিব হাসনাত বিবিসি

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থ বরাদ্দের কর্তৃত্ব নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনায় বিরোধের পাশাপাশি ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের মধ্যে।

মঞ্জুরি কমিশন ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, আগে গবেষণার জন্য সরকারি অনুদানের অংশ ইউজিসির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পেতো এবং তারাই বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে সে অর্থ বিতরণ করতো। কিন্তু চলতি বছর সরকার ইউজিসির মাধ্যমে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত গবেষণা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করবে। তাদের মতে, গবেষণার বিশাল কার্যক্রম দেখভাল করার সক্ষমতাই মঞ্জুরি কমিশনের নেই।

যদিও মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলছেন যে, তারা ইতোমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। “উপাচার্যদের একটি টিম নিয়ে কমিশনের অর্থ ও রিসার্চ বিভাগ একটি নীতিমালা তৈরি করবে যাতে সরকারের সিদ্ধান্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাতন্ত্রতা, দুটি বিষয়ই সমুন্নত থাকে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অধ্যাপক আহমেদ।

শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডঃ এস এম হাফিজুর রহমান বলছেন, গবেষণার অর্থ ব্যয়ের এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত থেকে সরিয়ে নিলে অর্থ ছাড় করাকে কেন্দ্র আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সূচনা করবে এবং এটি গবেষকদের জন্য নেতিবাচক হবে।

গবেষণায় বরাদ্দ এতদিন যেভাবে হত

যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রতিবছর বিশ্বের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করে। ২০২৬ সালে কিউএস গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। সেরা দুশোর মধ্যে জায়গা পেয়েছে বুয়েট ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে সবসময় প্রশ্ন থাকলেও মাঝে মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক জার্নালেও প্রকাশ হতে দেখা যায়।

শিক্ষকরা মনে করেন, গবেষণার জন্য সময়, সুযোগ ও অর্থের সংস্থান কম থাকাটাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন গবেষণা না হওয়ার জন্য দায়ী।

ইউজিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের কমিশনের মূল বাজেটে গবেষণা খাতে ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, এখানকার গবেষণা কার্যক্রমের জন্য এতদিন মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে যে বরাদ্দ আসতো সেটি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ছাড় হতো।

“মূলত ডিনদের মাধ্যমে আবেদনগুলো ফ্যাকাল্টিতে জমা পড়ার পর সেগুলো যাচাই বাছাই করত একটি কমিটি। গবেষণা প্রজেক্ট ও মেধার ভিত্তিতে যাচাইয়ের পর সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হত। অনুমোদন পাওয়ার পর প্রশাসন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের দুই তৃতীয়াংশ মঞ্জুর করতো,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম।

মি.আলম জানান যে, এরপর গবেষণা শেষ তা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া ও সেমিনারে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। এরপরেই চূড়ান্ত কিস্তির টাকা পেতেন শিক্ষকরা।

কিন্তু এখন কী হবে

মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলছেন, ওভালেপিং বা দ্বৈততা এড়াতে অর্থমন্ত্রণালয় গবেষণার অর্থ বরাদ্দ কমিশনের মাধ্যমে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ গবেষণা মঞ্জুরির অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে না দিয়ে সরাসরি ইউজিসি নিজেই বিতরণ করবে।

এখন ইউজিসির অধীন আছে ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে সরকার যে অনুদান দিয়ে থাকে সেটি আসে ইউজিসির মাধ্যমেই। যেমন চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন হয়েছে তাতে সরকার দিবে প্রায় সাড়ে নয়শ কোটি টাকা।

এই টাকার মধ্যেই একটি অংশ থাকতো গবেষণার জন্য। অর্থাৎ সরকার ইউজিসির মাধ্যমে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে টাকা দিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা প্রজেক্টে অর্থায়ন করতো।

কিন্তু ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ বলছেন, এবার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যেভাবে অর্থ দেওয়া হতো সেভাবে না দিয়ে কমিশনের মাধ্যমে দেওয়ার জন্য।

“বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্বেগ কাজ করছে। তারা মনে করছে একাডেমিক স্বাধীনতা ও গবেষণার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। অন্যদিকে সরকার বলছে তারা যে অর্থ দেয় সেখানে দ্বৈততা পরিহার করে অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হোক,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. আহমেদ।

তিনি বলেন, সরকারের অবস্থান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণার স্বাধীনতা- দুটোকেই সম্মান দিয়ে এ বিষয়ে সমন্বয়ের কাজ করবে ইউজিসি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যেই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের সাথে এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন।

“উপাচার্যরা একটি টিম তৈরি করবেন ও ইউজিসির অর্থ ও রিসার্চ বিভাগের আলোচনা করে একটি নীতিমালা তৈরি করবেন। কোন দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় নিবে, কোনটা কমিশন করবে- সেটাও তারা চিহ্নিত করবেন। মূল লক্ষ্য হলো গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দ পেতে দীর্ঘসূত্রিতা যেন না হয়, অর্থ ছাড় ও গবেষণা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সেটি নিশ্চিত করা,” বলছিলেন তিনি।

“আমরা কি করবো, ওনারা কি করতে পারেন। সমন্বয়টা কিভাবে করা যায় সেটাই খুঁজে দেখা হচ্ছে—আমি মনে করি বড় ধরনের উদ্বেগ আর থাকবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী বলছে

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে গবেষণায় বরাদ্দের নতুন নিয়মের বিরোধিতা করেছেন শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ডঃ মোঃ আল মোজাদ্দেদী আলফেছানী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা আগের মতোই গবেষণার বরাদ্দ পেতে চান।

“আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৭ টি গবেষণা ব্যুরো ও সেন্টার আছে। শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এখান থেকে এমএস, এমফিল ও পিএইচডি হয়। এগুলো তদারকি করার সামর্থ্য তো ইউজিসির নেই। আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়কে আগের মতো বরাদ্দ দেওয়া অব্যাহত রাখলে এসব কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তার মতে, গবেষণা বরাদ্দে বাধা আসলে সেটিকে তারা স্বাধীনভাবে গবেষণা কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ বলেই মনে করবেন। “আগের মতো বরাদ্দ না এলে গবেষণা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। আমরা তাদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছি যে, গবেষণা সেন্টার থেকে শুরু করে কিভাবে আমরা এই অর্থ ব্যয় করি,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম বলছেন, সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের কারণে গবেষণা কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্বাধীন ভূমিকা ছিল তা সংকুচিত হবে। “এটি শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ করেছে। আমাদের মনে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশনের কেউ কেউ খবরদারি করতে চাইছে। যা শিক্ষকদের উদ্বিগ্ন করছে। গবেষণার সামান্য টাকার জন্য শিক্ষকরা কী ইউজিসির বারান্দায় বারান্দায় ঘুরবে?” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. আলম।

শিক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডঃ এস এম হাফিজুর রহমানও বলছে, গবেষণার অর্থ বরাদ্দ ইউজিসির হাতে গেলে বরাদ্দ ছাড়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হবে। “মঞ্জুরি কমিশন এখন যা আছে, সেটাই তদারকি করতে পারছে না। আবার গবেষণার জন্য এদেশে ফান্ডিং এমনিতেই যথাযথ পাওয়া যায় না। ভালো গবেষণার জন্য আরও দরকার। আরও বেশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হলে সেটি গবেষকদের জন্য নেতিবাচক হবে,” বলছিলেন মি. রহমান।

মামুন আহমেদ বলছেন, গত ৯ই জুলাই তিনি উপাচার্যদের সাথে এ বিষয়ে যে বৈঠক করেছেন সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করার কোনও সম্ভাবনাই নেই। “এই অর্থ ছাড়ের নীতিমালা করবো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে আলোচনা করেই। তার ভিত্তিতেই অর্থ ছাড় হবে। তাই এ নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই,” বলছিলেন তিনি।

এর আগে ইউজিসির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “গবেষণা খাতে দ্বৈততা পরিহারের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন পদ্ধতি আরও সহজ, স্বচ্ছ ও গবেষক-বান্ধব করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা, গবেষণার অগ্রাধিকার ও বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য ক্ষুণ্ণ হবে না”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *