সাঈদ চৌধুরী
https://www.facebook.com/reel/1547940320677587
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনায় (The Student-Led Uprising and the Future of Post-Revolutionary Bangladesh) অংশ নিয়েছেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
আরো ছিলেন শিক্ষাবিদ ও সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. নাবিলা ইদ্রিস ও বিএনপির অন্যতম পলিসি মেকার ড. আলিয়ার রহমান। তাদের সুন্দর ও সাবলীল উপস্থাপনা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

রোববার (১৪ জুন ২০২৬) সন্ধ্যায় অক্সফোর্ড ইউনিয়নের আন্তর্জিতিক এই মঞ্চে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নিয়ে বেশ তথ্য সমৃদ্ধ বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথি সাদিক কায়েম ও হাসনাত আবদুল্লাহ।
আলোচনায় অক্সফোর্ড ইউনিভার্সির শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ের লেখক ও গবেষক এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।

অক্সফোর্ড ইউনিয়ন সোসাইটিতে সাধারণত এমন ব্যক্তিদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়, যাদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, চিন্তা বা নেতৃত্ব বিশ্বপর্যায়ে আলোচনা হয়।
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশে বিশ্বময় আস্থার প্রতীক হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে অক্সফোর্ড ইউনিয়ন। এটি বিশ্বের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রপ্রধান, নোবেলজয়ী, বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী ও চিন্তাবিদদের আলোচনার মঞ্চ হিসেবে পরিচিত। ফলে আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাতিমান একাডেমিক ও নীতিনির্ধারণী মহলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এটি।

অক্সফোর্ড ইউনিয়নে বক্তৃতা বা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও বিল ক্লিনটন, ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, মার্গারেট থ্যাচার, টনি ব্লেয়ার ও বরিস জনসন-সহ অসংখ্য রাজনীতিক। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং এবং পাকিস্তানের ইমরান খান, আমাদের নোবেলজয়ী ড মুহাম্মদ ইউনূস-সহ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বরা।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহন, শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী সরকার সংশ্লিষ্টদের ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পলায়ন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই আন্দোলনের প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে জুলাই যোদ্ধারা অনুষ্ঠানে বিষদ আলোচনা করেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলনে যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাজপথে লড়াই করেছেন এবং গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ভাবনা ও দিকনির্দেশনাও তুলে ধরেন জুলাই বিপ্লবের দুই অগ্রসেনানী ভিপি সাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি।

জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অবস্থান কী হবে? প্যানেল ডিস্কাসনে এমন প্রশ্নের জবাবে ‘ইউরোপে হিটলার ও নাৎসি বাহিনীর যে পরিনতি হয়েছে, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিনতি হবে’ বলে মত প্রকাশ করেন ভিপি সাদিক কায়েম।
আর হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি বলেন, আমরা এখানে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ একসঙ্গে বসে আলোচনা করছি। কিন্তু এই আলোচনার টেবিলে আওয়ামী লীগের কোন স্থান নেই। তাদের বাকি জীবন জিল্লতির মধ্যে কাটবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, They are barking in the street, and there is no seat for them here.
ভিপি সাদিক কায়েম শহীদ আবু সাইদ ও শহীদ আবরার ফাহাদ-সহ শীর্ষ জুলাই শহীদদের নাম উল্লেখ শুরু করে ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় তাদের আত্বত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। যারা বাংলাদেশের স্বৈরাচার ও আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের কালজয়ী প্রতীক। তাদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণের জন্ম দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম ও সংহতির শক্তিশালী প্রতীক ‘কেফিয়া’ পরিধান করে মানবতায় জয়গান গেয়েছেন এই জুলাই যোদ্ধা সাদিক কায়েম।
আলোচনার শুরুতে হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি নিজেকে রাজমিস্ত্রীর সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে গৌরবদীপ্ত পক্তিমালায় মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। অক্সফোর্ড ইউনিয়নের এই মঞ্চে এক সময় পাকিস্তানের ইমরান খানের বক্তব্যের কথা স্মরণ করেন তিনি। হৃদয়গ্রাহী কন্ঠে হাসনাত আব্দুল্লাহ তার বেড়ে ওঠার গল্প ও দেশ গড়ার আকাঙ্খাও তুলে ধরেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার সংগঠক, যুক্তরাজ্যের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো ড. নাবিলা ইদ্রিস পলাতক শেখ হাসিনা কর্তৃক রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে মেধাবী ও প্রতিবাদী জনতাকে গুম ও খুনের তদন্ত সংশ্লিষ্ট অনেক ঘটনা বর্ণনা করেন।

গোপন বন্দিশালায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হতো- সেই শ্বাসরোধ ও আতঙ্কের কথা শুনে উপস্থিত অনেকে অস্রুসিক্ত হয়েছেন। গুম কমিশনের তদন্তে রাষ্ট্রীয় গুমের এসব লোমহর্ষক বিবরণ উঠে এসেছে বলে জানান ড. নাবিলা ইদ্রিস।
ড. আলিয়া রহমান জুলাই বিপ্লবের প্রভাব ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেন।

অক্সফোর্ডের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে আলোচনার মধ্যদিয়ে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়করা বিশ্বদরবারে তাদের ম্যাসেজ পৌঁছে দেওয়ার এটা ছিল এক অনন্য সুযোগ। এর মধ্য দিয়ে ভিপি সাদিক কায়েম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি’র সাথে বিশ্বমঞ্চে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব!
জুলাই যোদ্ধারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ও বক্তব্য তুলে ধরাটা ছিল তাদের দূরদর্শী নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশী তরুণ প্রজন্মের নেতাদের এমন সক্রিয় অংশগ্রহণ আমাদের প্রবাসী প্রজন্মকেও ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক


