সাপ্তাহিক বাংলামেইল ‘ঈদসংখ্যা’ বিলেতের বাংলা প্রকাশনায় সৃষ্টি করেছে নতুন মাত্রা

প্রবাসী বাংলাদেশ যুক্তরাজ্য সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

অন্য রকম এক আবহ সৃষ্টি হয়েছিল সাপ্তাহিক বাংলামেইল কর্তৃক বর্ণীল ‘ঈদসংখ্যা’র প্রকাশনা অনুষ্ঠানে। বই,ম্যাগাজিন,স্মারক বা বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন বা সাহিত্য আড্ডার প্রথাগত গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে।

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বুধবার (১৩ মে ২০২৬) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় বিলেতে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা অংশ নিয়েছিলেন। লেখার মান বিবেচনার পাশাপাশি কাগজের পুরুত্ব ও ছাপার উজ্জ্বলতায় বাংলামেইল ‘ঈদসংখ্যা ২০২৬’ বিলেতের বাংলা প্রকাশনায় নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছে বলে বক্তারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

সাপ্তাহিক সুরমা’র সাবেক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাসনের সভাপতিত্বে এবং বাংলামেইল সম্পাদক সৈয়দ নাসির আহমদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক সুরমার প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক কবি ফরিদ আহমদ রেজা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি মাহবুব মোহাম্মদ।

আলোচনায় অংশ গ্রহন করেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি বারিস্টার তারেক চৌধুরী, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী, দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক সাঈদ চৌধুরী, সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক কবি আহমদ ময়েজ, লেখক ও গবেষক ফারুক আহমদ, কবি ও ছড়াকার দিলু নাসের, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজিবুল হক মনি, এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ গল্পকার সায়েম চৌধুরী, সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি কবি মোহাম্মদ ইকবাল, দ্য সানরাইজ টুডের সম্পাদক এনাম চৌধুরী, লেখক উদয় সংকর দুর্জয় প্রমুখ।

‘ঈদসংখ্যা সংস্কৃতি : বাঙালির উৎসব ও সৃজনধারা’ শীর্ষক আলোচনার মাধ্যমে সাজানো হয়েছিল প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ঈদসংখ্যা কখন থেকে বেরিয়েছে সে কথা থেকে শত বছরের উল্লেখযোগ্য ঈদসংখ্যা সমূহের স্মৃতিচারণের সংমিশ্রণে আলোচনায় সৃষ্টি হয় দারুণ মোহময় পরিবেশ।

আমি (সাঈদ চৌধুরী) সাপ্তাহিক বাংলামেইলের বর্ণীল ‘ঈদসংখ্যা’ বিলেতের বাংলা প্রকাশনায় যে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছে, তা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রথম ঈদ সংখ্যার ইতিহাস সম্পর্কে যে তথ্য বিভ্রান্তি রয়েছে সে দিকে লেখকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।

আসলে, ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে মাসে মাসিক আল্ ইসলাহ পত্রিকার ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বিশেষ সংখ্যা বলতে যা বুঝায় সে বিবেচনায় এটি ছিল প্রথম ঈদ সংখ্যা। সিলেট থেকে প্রকাশিত নুরুল হক সম্পাদিত সে সময়ের ঈদ সংখ্যায় কবি সুফিয়া কামাল (সুফিয়া এন হোসেন) লিখেছেন ‘আমাদের ঈদ’, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ‘চাঁদ রাত’, মুহাম্মদ আব্দুল বারী ‘সার্থক ঈদ’। ‘পবিত্র ঈদল ফেতর’ ও ‘হজরত শাহজালালের জীবনচরিত’ নামে দুটি প্রবন্ধও ছিল।

বাংলাদেশে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাস-সহ বিবিধ উপাদানে ঈদ সংখ্যাগুলো ঢেলে সাজানো হয় সকল স্তরের পাঠকের চাহিদার আলোকে আকর্ষণীয় ও সুদৃশ্য। ফলে তা পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে, মন টানে বা মুগ্ধ করে। অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখক বছরের সেরা লেখাটা জাতীয় দৈনিকের ঈদ সংখ্যায় দিয়ে থাকেন।

নতুন লিখিয়েদের সাহিত্য জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ারও একটি বড় সুযোগ ‘ঈদসংখ্যা’। এতে যাদের লেখা স্থান পায় তারা হন আনন্দিত, উল্লসিত। প্রকাশিত লেখাটি বন্ধু-স্বজনদের দেখিয়ে নতুনেরা হন হৃষ্ট। এটা পড়ে কেউ পুলকিত হলে লেখক বিজয়ের আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। উদীয়মান লেখকদের বহু নির্ঘুম রাতের কষ্ট তখন হাওয়ায় মিশে যায়। নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায় তারা আবারো কলম চালায় জোর কদমে। তাই ‘ঈদসংখ্যা’ বা বিশেষ সংখ্যা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের স্মৃতি লেখক জীবনে থাকে তরতাজা স্মৃতিময়। এই অনুষ্ঠানে সেটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে।

ঈদসংখ্যা সংস্কৃতি নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি ফরিদ আহমদ রেজা সুদুর অতীতের সুখস্মৃতি বর্ণনা করেন। তিনি বাংলামেইলের সাথে সম্পৃক্ত নতুন প্রজন্মের লেখিয়েদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও চিন্তা ভাবনার প্রশংসা করে বলেন, তারা আমাদের চেয়ে অনেক মেধাবী। সৈয়দ নাসির সম্পাদিত ঈদ উপলক্ষে বাংলামেইল কর্তৃক প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাকে ‘একটি মানসম্মত ঈদসংখ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি শুধু পাঠকের বিনোদনের জন্য নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি দলিল হয়ে থাকবে।

সভাপতির বক্তব্যে নজরুল ইসলাম বাসন আমাদের সাহিত্য-সাংবাদিকতায় বিশেষ সংখ্যার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিলেতের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে ‘ঈদসংখ্যা’ প্রকাশের মাধ্যমে বাংলামেইল একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি বারিস্টার তারেক চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম শুধু সংবাদ পরিবেশন করে না, সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেও শক্তিশালী করে। বাংলামেইলের এই উদ্যোগ তারই উদাহরণ।

লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী ঈদসংখ্যা পড়ার স্মৃতি রোমন্তন করে বলেন, বাংলাদেশে আমরা ঈদ সংখ্যা পড়ে অভ্যস্ত। বাংলামেইলের এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। এর পেছনে যারা কাজ করেছেন, সৈয়দ নাসির-সহ সবাইকে অভিনন্দন।

সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক কবি আহমদ ময়েজ ছোট বেলায় পারিবারিক লাইব্রেরিতে মাসিক মোয়াজ্জেম, সওগাত ইত্যাদি ঈদসংখ্যা পড়ার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বাংলামেইল ঈদ সংখ্যার গুণগত দিক তুলে ধরে বলেন, প্রবাসে মান সম্পন্ন ঈদ সংখ্যা প্রকাশ সহজ নয়, এ ধরণের মমনশীল কাজে ব্যবসায়ীরা সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক ও গবেষক ফারুক আহমদ বাংলামেইল ঈদ সংখ্যার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এটি একটি ইউনিক প্রকাশনা। এতে অনেক তথ্য ও বৈচিত্র রয়েছে।

কবি ও ছড়াকার দিলু নাসের বলেন, বেশি প্রশংসা করলে কেউ মনে করবেন, আমি আমার ভাইয়ের প্রশংসা করছি। বাংলামেইলের ঈদ সংখ্যায় সম্পাদকের দায়িত্ব, সৃজনশীলতা ও রুচির পরিচয় বিশেষভাবে ফুটে ওঠেছে।

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুজিবুল হক মনি বলেন, সংস্কৃতিচর্চা ছাড়া কোনো কমিউনিটি এগিয়ে যেতে পারে না। এই ধরনের আয়োজন প্রবাসী নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখবে।

এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ ও গল্পকার সায়েম চৌধুরী বলেন, ঈদ সংখ্যার সাথে আমাদের একটা আবেগ জড়িয়ে আছে। বাংলামেইল সে আবেগটা উসকে দিয়েছে। তাদের ঈদসংখ্যাটা আমাদেরে সেই ৯০ দশকে নিয়ে গেছে। সম্পাদক সৈয়দ নাসির আমহদকে জানাই বিনম্র কৃতজ্ঞতা ।

সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি কবি মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এমন উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

দ্য সানরাইজ টুডের সম্পাদক এনাম চৌধুরী বলেন, বৃটেন থেকে এটি একটি অসম্ভব কাজ। আমি অবাক হয়েছি যে, এখান থেকে সেই অসম্ভবটি করে ফেলেছেন সম্পাদক সৈয়দ নাসির।

মূল প্রবন্ধে কবি মাহবুব মোহাম্মদ বলেন, ঈদসংখ্যা বাঙালির সৃজনশীল চর্চার অন্যতম বড় ক্ষেত্র। এই ধারার মাধ্যমে নতুন লেখক, কবি ও চিন্তকদের বিকাশ ঘটে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক আব্দুল কাদির চৌধুরী মুরাদ, রেজাউল করিম মৃধা, ইমরান আহমদ, রিয়াদ রায়হান, কবি সৈয়দ ফরহাদ, সৈয়দ জাবিরসহ কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা।

আলোচনা সভায় অতিথিরা বাংলামেইল ঈদসংখ্যার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চায় এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

বৈচিত্র্যময় সাহিত্য, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, ভ্রমণগদ্য ও সমকালীন শোবিজ অঙ্গনের লেখায় সমৃদ্ধ এবারের বাংলামেইল ‘ঈদসংখ্যা’য় প্রবন্ধ লিখেছেন ফরীদ আহমদ রেজা, মোহাম্মদ মারুফ, মালেকুল হক, নোমান বিন আরমান, ফায়যুর রাহমান, ওয়াহিদ রোকন, নাহিদা আশরাফী, এডভোকেট খালেদ চৌধুরী, সারওয়ার-ই আলম, নাওয়াজ মারজান ও হুসাইন ফাহিম।

এই সংখ্যায় সংযোজিত হয়েছে শেখ লুৎফের উপন্যাস ‘বিষপিঁপড়া’ ও প্রয়াত কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর একগুচ্ছ অপ্রকাশিত কবিতা। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে লিখেছেন মোস্তাক আহমাদ দীন, সুমনকুমার দাশ ও মোক্তাদির ইবনে ছালাম। ‘সবিশেষ’ বিভাগে রয়েছেন লুৎফর রহমান রিটন। ইতিহাস বিভাগে লিখেছেন আবু মকসুদ ও হেলাল হামাম। স্মৃতিগদ্য লিখেছেন সৈয়দ মবনু ও ফারুক আহমদ। গল্প বিভাগে সায়েম চৌধুরী, মজিবুর রহমান, আহমদ হোসেন হেলাল, আসেফ আব্দুল্লাহ ও ফারজানা আক্তারের লেখা স্থান পেয়েছে।

* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *