১৭০০ বছরের পুরোনো ভারতীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নিলামে উঠছে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

এক হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো ভারতীয় রাজপরিবারের সংগ্রহে থাকা এক অসাধারণ পিতলের অ্যাস্ট্রোল্যাব নিলামে তোলা হবে। এটি মূলত হাতে বহনযোগ্য জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ‘কম্পিউটার’।

বিরল এই যন্ত্রটি আগামী ২৯ এপ্রিল লন্ডনের আর্ন্তজাতিক নিলাম প্রতিষ্ঠান সোথবিতে নিলামে তোলা হবে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

সোথবির ইসলামিক ও ভারতীয় শিল্পকলা বিভাগের প্রধান বেনেডিক্ট কার্টার বিবিসিকে বলেছেন, বস্তুটি ‘সম্ভবত এ যাবৎকালে সবচেয়ে বড় এবং এটি এর আগে কখনো প্রদর্শিত হয়নি’।

জানা যায়, এটি মূলত জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মান সিংয়ের রাজকীয় সংগ্রহে ছিল। তার মৃত্যুর পর এটি তার স্ত্রী তৎকালীন অন্যতম সুন্দরী রমনী মহারানী গায়ত্রী দেবীর কাছে হস্তান্তরিত হয়। এরপর তার জীবদ্দশায় এটি একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যায়।

অ্যাস্ট্রোল্যাব হলো বহুস্তরবিশিষ্ট ধাতব ডিস্ক জাতীয় একটি যন্ত্র। অতীতে এটি সময় নির্ধারণ, নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়, মক্কার দিক নির্ধারণ এবং আকাশের গতিবিধি বোঝার কাজে ব্যবহৃত হতো।

অক্সফোর্ড সেন্টার ফর হিস্ট্রি অব সায়েন্স, মেডিসিন অ্যান্ড টেকনোলজির ডক্টর ফেডেরিকা জিগান্তে বলেন, এগুলো মূলত একটি ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্বের দ্বিমাত্রিক উপস্থাপনা। আমি এগুলোকে আধুনিক স্মার্টফোনের সঙ্গে তুলনা করি, কারণ এগুলো দিয়ে অনেক কিছু করা যায়।

তিনি আরও জানান, অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহার করে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের সময়, ভবনের উচ্চতা, কূপের গভীরতা ও দূরত্ব নির্ণয় করা যেত। এমনকি জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী ভবিষ্যৎ অনুমান করতেও এটি ব্যবহৃত হতো।

অ্যাস্ট্রোল্যাবের উদ্ভব প্রাচীন গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে এবং অষ্টম শতকে এটি ইসলামি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ইরাক, ইরান, উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেনের উৎপাদনকারী হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

বিশেষ এই যন্ত্রটি সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে তৈরি হয়েছিল। কাইম মুহাম্মদ এবং মুহাম্মদ মুকিম নামক দুই ভাই আগা আফজাল নামক একজন অভিজাত মুঘল ব্যক্তির জন্য যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন। ওই ব্যক্তি তখন লাহোর প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন এবং উচ্চপদে সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের অধীনে কাজ করতেন।

এই যন্ত্রটির ওজন প্রায় ৮ কেজি ২০০ গ্রাম, ব্যাস প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতা প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার। সাধারণ অ্যাস্ট্রোল্যাবের তুলনায় এটি প্রায় চার গুণ বড়।

এতে পারস্য ভাষার পাশাপাশি দেবনাগরী লিপিতে সংস্কৃত ভাষায় নক্ষত্রের নাম খোদাই করা রয়েছে, যা এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতাকে তুলে ধরে।

অ্যাস্ট্রোল্যাবটিতে ৯৪টি শহরের নাম, তাদের দ্রাঘিমা-অক্ষাংশসহ এবং ৩৮টি নক্ষত্র নির্দেশক রয়েছে। এছাড়া এতে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ভাগ করা ডিগ্রি চিহ্নসহ পাঁচটি নির্ভুল প্লেট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যন্ত্রটি শুধু বড় ও সুন্দরই নয়, অত্যন্ত নির্ভুলও, যা দিয়ে মহাজাগতিক বস্তুর উচ্চতার সঠিক কোণ নির্ধারণ করা যায়।

সোথবি জানিয়েছে, এর উৎকৃষ্ট অবস্থা ও রাজকীয় ইতিহাসের কারণে জাদুঘর ও সংগ্রাহকদের মধ্যে এটি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করবে। এর সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ১৫ থেকে ২৫ লাখ পাউন্ড।

এই বিরল বস্তুটি ২০১৪ সালে ১০ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে এই যন্ত্রটি সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের দখলে রয়েছে। অ্যাস্ট্রোল্যাবটি ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত লন্ডনের সোথেবির গ্যালারিতে প্রদর্শিত হবে। ইউএনবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *