ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কি ইউরোপে পৌঁছতে পারে?

আমেরিকা ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

নিক এরিকসন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক ঘাঁটির দিকে তেহরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ থেকে মনে করা হচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যদিও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারেনি ওই ক্ষেপণাস্ত্র, তবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আইডিএফ জানিয়েছে যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রথম এত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো।

 

তেহরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, ইরানের সংবাদমাধ্যম মূলত বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোকে উদ্ধৃত করেই প্রতিবেদন করছে।

বিশেষজ্ঞরা এখন ওই ব্যর্থ হওয়া হামলাটির প্রভাব কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, সেই চিন্তাভাবনা করছেন। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু কী কী হতে পারে, সেই ভাবনাও চলছে। যেমন, ভবিষ্যতে বার্লিন, প্যারিস এবং লন্ডনসহ ইউরোপের রাজধানী শহরগুলি কি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে?

যুক্তরাজ্যের একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী বলেছেন যে, ইরানের কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র আছে যা লন্ডনে পৌঁছতে পারে বলে আইডিএফ যে দাবি করছে, তার “প্রমাণ করার মতো কোনও ভিত্তি নেই”।

কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে নি

বিবিসির ফার্সি বিভাগের ঘোনচেহ হাবিবিয়াজাদ জানাচ্ছেন, “ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নজরদারিতে আছে।”

“যদিও তেহরান জোর দিয়ে বলেছে যে তার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবেই প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি জাতীয় প্রতিরোধ কৌশলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তবে বিশ্লেষকরা যুক্তি দেন যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানানোয় অগ্রগতি হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাব নিকেশ বদলিয়ে দিতে পারে,” জানাচ্ছেন মি. হাবিবিয়াজাদ।

তেহরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ দূর করার জন্য আলোচনা চলছে মাত্র এক মাস হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার সম্ভাবনা যখন তৈরি হচ্ছিল, তখনই ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ শুরু করে।

চাগোস দ্বীপপুঞ্জ – যার একটি অংশেই রয়েছে দিয়েগো গার্সিয়া, তা ইরান থেকে প্রায় তিন হাজার আটশো কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সিএনএন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়ে প্রতিবেদন করেছে। তবে এ-ও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওই ক্ষেপণাস্ত্রগুলির কোনোটাই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে নি।

এর মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশপথেই ফেটে যায়, অন্যটিকে প্রতিহত করেছে একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। এই প্রতিবেদনগুলি যে সঠিক, তা নিশ্চিত করতে পেরেছে বিবিসি।

এই ঘটনার পরপরই আইডিএফ জানায়, ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেকগুলি শহর এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইসরায়েলের বাহিনী এ-ও বলে যে গত বছরই তারা জানিয়েছিল, তেহরান এই ধরনের ক্ষমতা সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চাইছে।

আইডিএফের চিফ অফ স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির চাগোস দ্বীপপুঞ্জের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

“ইরান চার হাজার কিলোমিটার পাল্লার দুটি ধাপের এক আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলির ইসরাইলে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে ছিল না,” মন্তব্য ওই ইসরায়েলি সেনা কর্মকর্তার।

তার কথায়, “এগুলির রেঞ্জ এখন ইউরোপের রাজধানীগুলি পর্যন্ত পৌঁছেছে। বার্লিন, প্যারিস ও রোম সবই সরাসরি ঝুঁকির পরিধির মধ্যে রয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্যের জয়েন্ট ফোর্সের কমান্ডের সাবেক প্রধান জেনারেল স্যার রিচার্ড ব্যারনস সহ অন্য বিশেষজ্ঞরা বিবিসিকে বলেছেন, ওই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত এবং সেগুলি কতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তার পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

জেনারেল ব্যারন বলছিলেন,”আগে আমরা ভেবেছিলাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটার এবং দিয়েগোর দূরত্ব তিন হাজার আটশো কিলোমিটার।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের রেঞ্জ বেড়েছে?

ইরান এতদিন পর্যন্ত বলে এসেছে যে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে একটি স্ব-আরোপিত সীমারেখা আছে, যার পরিধি ১,২৪০ মাইল বা দুই হাজার কিলোমিটার। যার অর্থ, ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের হানার দূরত্বের মধ্যেই ছিল, তবে ইউরোপ তার মধ্যে পড়ত না।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২০২১ সালে বলেছিলেন যে এর পিছনে রাজনৈতিক যুক্তি ছিল, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল না। সামরিক শীর্ষ কর্তা ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের বিরোধিতার স্বত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছি।।

তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে হুমকি বজায় রাখতে চেয়েছিলেন – কিন্তু ইউরোপকে ব্যতিব্যস্ত করতে চাননি, কারণ তাদের সঙ্গে তো কোনো সংঘাত ছিল না। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইরানের একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছিলেন যে আইআরজিসি একটি আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফলভাবে পরীক্ষা চালিয়েছে – যদিও তিনি ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

ক্ষেপণাস্ত্রের পরিধি কতটা?

‘টাইমস অফ ইসরায়েল’ পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তারাও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে ইরানের মহাকাশ কর্মসূচির অর্থ হতেই পারে যে, তারা এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে যা দিয়ে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায় এবং প্রয়োজনে যাতে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।

কয়েকজন বিশ্লেষক এ বিষয়ে একমত। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. কারিন ভন হিপেল বিবিসিকে বলেন, “যদি ধরে নেওয়া যায় যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়েগো গার্সিয়ায় পৌঁছেছে। ইরানিরা আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করছে যা ১০ হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যদিও আমরা এখনও সেগুলি কার্যক্ষেত্রে দেখিনি।”

এর অর্থ হলো ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলি সম্ভবত আমেরিকা মহাদেশেও পৌঁছাতে পারে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারত মহাসাগরে যে হামলা চালানো হয়েছে, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যে ঊর্ধ্বসীমা একসময়ে ছিল, তা তুলে নেওয়া হয়েছে।

‘এটি ট্রাম্পের যুদ্ধ’

তবে কেউ কেউ বলছেন যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে আগেই প্রতিহত না করা হলেও সেগুলি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারত কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের গৃহায়ন মন্ত্রী স্টিভ রিড বিবিসিকে বলেছেন, “ইরান যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্যবস্তু করছে বা তারা চাইলেই করতে পারবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন নেই।”

ইরান এখনও এই ধরনের দূরপাল্লার হামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ইতোমধ্যে আয়ত্ত করেছে কী না, বা এত বেশি দূরত্বে ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা তাদের আছে কী না, সেটা আলোচ্য বিষয়।

আপাত ভাবে বিষয়টির একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে ইরান কখনই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে চায়নি বরং তেহরান তাদের অভিপ্রায় এবং প্রতিরোধের ব্যাপারে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছিল।

“বিষয়টা এমন নয় যে ইরান কালকেই লন্ডন বা প্যারিসে আক্রমণ করবে, তবে আমি মনে করি যে তারা নিজেরা যাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তার জন্যই আরও একটি যুক্ত তৈরি করা হল,” লন্ডনের ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, প্রাক্তন ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে তেল-আভিভ ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজে কর্মরত ড্যানি সিত্রিনোউইৎজ।

এই সপ্তাহে ভারত মহাসাগরের ঘটনাবলি নিয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াকেও জনমত গঠনের একটি প্রচেষ্টা বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

ইউরোপে নেটোর সাবেক ডেপুটি কমান্ডার জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফ বিবিসিকে বলেছেন, “আমেরিকা ও ইসরায়েলের পাশাপাশি অন্য আরও যত বেশিসংখ্যক দেশও যাতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষের পরিধি যাতে আরও বিস্তৃত হয়, এটা নিজের স্বার্থে অবশ্যই বলবে ইসরায়েল।”

তার কথায়, “এটা আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। এটি ট্রাম্পের যুদ্ধ, যে সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট দিশা বা কৌশল কিছুই নেই। একটা বিপজ্জনক ফাঁদে আটকিয়ে গেছে বিষয়টা। আমাদের বলা হয়েছিল যে ছয় মাস আগেই পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে আসা এ নিয়ে কোনো কথাই আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *