আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
ভিডিও নিউজ: https://www.facebook.com/reel/876402291835866
সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আল্লাহ আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কবুল করলে ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে কোথাও বৈষম্য-বেইনসাফ করা হবে না।

সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাঠের জনসমুদ্রে আমীরে জামায়াত সিলেটবাসীর কাছে ভোট চেয়ে বলেন, বিগত ৫৪ বছর অনেককে দেখেছেন। আমাদেরকে ভোট দিয়ে একবার দেখেন। আমাদেরকে দেশ সেবার সুযোগ দিলে প্রতিটি এলাকার নায্য অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সোয়া ৪টায় সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে হবিগঞ্জ ও নিজ উপজেলা কুলাউড়ায় জনসভায় ভাষণ দিয়ে দুপুরে হেলিকপ্টার যোগে সিলেট এসে পৌঁছান।
আমীরে জামায়াত ঘড়ির কাটায় বিকেল ঠিক ৩টা ৩৫মিনিটে জনসভায় ভাষণ দিতে শুরু করেন এবং ২৫ মিনিটের বক্তৃতা ও এমপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে সোয়া ৪ টা পর্যন্ত মঞ্চে অবস্থান করেন। ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসমুদ্র ‘দাড়ি পাল্লা, ইনশাআল্লাহ – সব দেখেছি বার বার দাড়িপাল্লা এইবার’ শ্লোগানে মুখরিত সমাবেশে জামায়াত আমীর বলেন, আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না। আপনারা মনে কষ্ট নেবেন না। আমি এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।
ডা. শফিকুর রহমা বলেন, আমি এই সিলেটের সন্তান। কারো ভাই, কারো চাচা, কারো দাদা। আমি এখানে জামায়াত আমীর হিসেবে দাঁড়াইনি। আমি আপনাদের সন্তান হিসেবে দাঁড়িয়েছি আপনারা অনেককে সুযোগ দিয়েছেন। আমাদেরকে একবার সুযোগ দেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে আমরা এই সিলেটকে পাল্টে দেবো। সিলেটের যে যৌক্তিক দাবি-দাওয়া তা পূরণ করবো। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের কোথাও বৈষম্য করা হবে না।

আমীরে জামায়াত বলেন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর নামেই আন্তর্জাতিক, কাজে নয়। জামায়াতকে দেশ সেবার সুযোগ দিলে ওসমানী বিমানবন্দর পূর্নাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিনত করা হবে। এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানের ফ্লাইট উঠানামা করবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ বিমানের ম্যানচেষ্টার রুট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটা বন্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। আমরা ক্ষমতায় গেলে নতুন রুট চালু করা হবে।
সিলেটকে বাংলাদেশের সবচেয়ে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ অঞ্চল উল্লেখ করে আমীরে জামায়াত বলেন, কিন্তু দু:খের বিষয়, সিলেটবাসী গ্যাস পায় না। সিলেটের নদীগুলো মরা বানানো হয়েছে। মদ গাঁজা সিলেটকে অস্থির করে রাখে। আমরা এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। আমরা ক্ষমতায় গেলে সিলেটের যে নায্য হিস্যা রয়েছে, সেটা বুঝিয়ে দেবো।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। এই দেশের প্রবাসী যারা মধ্যপ্রাচ্যে যায়, অনেকে সেখানে ইন্তেকাল করেন, তাদের লাশ সম্মানের সঙ্গে দেশে নিয়ে আসা হবে। যারা বিদেশে গিয়ে রুজি রোজগারের আগেই মারা যান, তাদের পরিবারের দায়িত্ব সরকার নেবে।

প্রবাসীদের নিয়ে যারা মশকারা করেছে, তাদেরকে ধিক্কার জানিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, এবার প্রবাসীরা প্রথম বারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে আমরা ক্ষমতায় গেলে আগামীতে সকল প্রবাসীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করবো। তিনি বলেন, দূষণে ভুগছে দেশের নদীগুলো। আমরা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের নদীগুলোর জীবন দেওয়া হবে। সুরমা কুশিয়ারা শুধু বইয়ে নদী নয়, বাস্তবে জীবন্ত হবে।
আমীরে জামায়াত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার ব্যাপারে দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে বলেন, তাদের জন্য ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত। কৃষি প্রধান এলাকাকে কৃষি শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জেলের হাতে জাল থাকবে। হাওরের মাছের ঘের জেলেরাই পাবে। চা শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজার ছেলে রাজা, রাণীর ছেলে রানী হবে, আমরা সেই ধারা পাল্টে দিতে চাই। চা শ্রমিকের ছেলে-মেয়েও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে।
মুখ থুবড়ে পড়া উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, সিলেটে একটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এতিমের মতো পড়ে আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রুগ্ন। আমরা ক্ষমতায় গেলে এসব কলেজকে রুগ্ন অবস্থা থেকে প্রাণ দেওয়া হবে। বাংলাদেশের সবজায়গায় সুষম উন্নয়ন হবে। তবে সিলেট আর বঞ্চিত হবে না।
পটপরিবর্তনের পর একজন জালিমের বিরুদ্ধেও জামায়াত প্রতিশোধ নেয়নি মন্তব্য করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা বলেছিলাম, যারা আমাদের উপর জুলুম করেছে, আমরা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তখন অনেকে সমালোচনা করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নেতা-কর্মীরা কথা রেখেছে। আমাদের দলের কেউ জুলুম করে নাই, মামলা বাণিজ্য করে নাই। একজন জালিমের বিরুদ্ধেও দল হিসেবে জামায়াত প্রতিশোধ নেয়নি। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদেরকে বলেছি, কেউ ক্ষুদ্ধ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আদালতে যেতে পারেন। তার ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

তিনি বলেন, আমি তখন বলেছিলাম, আমরা যারা মজলুম ছিলাম, আমরা যেন জালিম না হই। একজন সেন্সিবল নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব থেকেই সেটা বলেছি। কিন্তু একটি পক্ষ কথা রাখে নাই। এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমাদের কর্মীরা আমাদের কথা রেখেছে। তারা কোনো জুলুম ও মামলা বাণিজ্য করেনি। যারা ৫ আগস্টের পর নতুন করে জুলুম করেছে, বিবেকের আদালতে তাদের বিচার করবে জনগণ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করে তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে কেউ ঘুষ দেওয়া এবং নেওয়ার সাহস পাবে না। সকল নাগরিক সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। বিগত ৫৪ বছর বিদেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে জানিয়ে জামায়াতের আমীর বলেন, কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না টাকা পাচার করেনি। সবাই কম বেশি পাচারে জড়িত। এটা জনগণের হক। এই হক যদি স্বেচ্ছায় দিয়ে দেয়, তাহলে অভিনন্দন জানানো হবে। আর যদি না দেয়, তাহলে রাষ্ট্র পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে বের করে আনবে।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হলে দেশের উন্নয়ন হবে। ৫ বছরে বাংলাদেশের চেহারা পাল্টে যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, একদল আছে মা বোনদের সম্মান দিতে জানে না। আমি সম্মানের কথা বললে তারা মিসাইল ছোঁড়ে। চোর ধরা পড়েছে, তবুও তারা চোরের পক্ষে সাফাই গায়। যেন চোরের মায়ের বড় গলা।
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। একসঙ্গে ভোট ও গণভোট। আমরা শুধু ভোট দেবো না, ভোট কেন্দ্র পাহারা দেবো। প্রতিটি কেন্দ্রে দুর্গ গড়ে তুলবো, যাতে কোনো সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ ভোট চুরির সাহস না পায়।
এডভোকেট জুবায়ের বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ঋণখেলাপী প্রার্থীকে প্রত্যাখান করবে জনগণ। ক্ষমতায় গেলে সিলেটের সব যৌক্তিক দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া হবে। তিনি সিলেটের সবকটি আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহবান জানান।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বলেন, লন্ডন থেকে একজন মুফতি এসেছেন, উনাকে আমীরে জামায়াত দ্বিতীয় বারের মতো বিতর্কের আহবান জানিয়েছেন, কিন্তু তিনি সাহস পাচ্ছেন না। এ কেমন গুপ্ত আচরণ। তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হতে চান। প্রধানমন্ত্রী হতে হলে ১৮ কোটি মানুষের নেতা হতে হয়।
রাশেদ প্রধান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নয়া জালিম বিএনপি ভোটকেন্দ্র দখল করতে আসলে লাল কার্ড দেখিয়ে দেবেন।
সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী ও ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নতুন ইতিহাস রচিত হবে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির পরিবর্তে উন্নয়নের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক রাজনীতির পরিবর্তন আনতে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে হবে।
ইসলামি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, আমরা একটি উন্নত মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চেষ্টা করছি। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে রাজনৈতিক হানাহানিতে মানুষ খুন হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লার বিজয়ে নতুন বাংলাদেশের ইতিহাস রচিত হবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান সিলেট উন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ক্ষমতায় গেলে ওসমানী বিমানবন্দরকে পূর্নাঙ্গ বিমানবন্দরে রুপ দেবে জামায়াত। চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নদী ভাঙন রোধ-সহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
মাওলানা হাবিবুর রহমান আরো বলেন, আমীরে জামায়াত প্রধানমন্ত্রী হলে সিলেটের চেহারা পাল্টে দেওয়া হবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, সেক্রেটারি মুহাম্মদ শাহজাহান আলী ও সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীনের যৌথ সঞ্চালনায় জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুর রহমান, সিলেট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, সিলেট মহানগর জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, সিলেট জেলা যুব জামায়াতের সভাপতি মাওলানা লোকমান আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী, সিলেট মহানগর আমীর মাওলানা এমরান আলম, সিলেট জেলা খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা ইকবাল হোসাইন প্রমুখ।

জনসভায় সিলেট-১ আসনের ১১ দলীয় জোট প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট-২ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসিব আলী, সিলেট-৩ আসনের প্রার্থী মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন রাজু, সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী জয়নাল আবেদীন, সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান, সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সুনামগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান, সুনামগঞ্জ-৩ আসনের প্রার্থী শাহীনূর পাশা চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের প্রার্থী এডভোকেট শামস উদ্দিন ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানির হাতে দাঁড়িপাল্লা, রিকশা ও দেওয়াল ঘড়ি তুলে দেন ডা. শফিকুর রহমান।

তবে সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী এডভোকেট শিশির মনির দিরাই-শাল্লায় নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকায় তার পক্ষে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিলেট অঞ্চলের দায়িত্বশীল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন জামায়াত আমীর।

