এম জে এইচ জামিল সিলেট
সিলেটজুড়ে হঠাৎ করে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত বেশী দামেও মিলছেনা গ্যাস। অতিরিক্ত দামের কারণে অনেকে ডিলার ও সাব ডিলার দোকান বন্ধ করে রেখেছে। ফলে সিলেটে রীতিমত গ্যাসের হাহাকার দেখা দিয়েছে।
ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটারদের দাবী, সিলেটে চাহিদার ৪০ ভাগ সিলিন্ডারও মিলছেনা। পাইকারী কেনার খরচ সরকার নির্ধারিত দাম থেকেও বেশী হওয়ায় অনেকে ডিলার ও সাব-ডিলাররা চাহিদার অর্ধেকের কম গ্যাস ক্রয় করছেন। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলে ৩০টি কোম্পানীর মধ্যে মাত্র ৩টি কোম্পানী বাজারে সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। এতে একদিকে চাহিদা পূরণ হচ্ছেনা, অপরদিকে অতিরিক্ত দামের কারণে জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, রোববার (৪ জানুয়ারী) সিলিন্ডার গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। দেশে ভোক্তাপর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির দাম ঘোষণা করেছে। গত ডিসেম্বরে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জানুয়ারী মাসে গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে। তাই কিছু কিছু ব্যবসায়ী সিলিন্ডার গ্যাস মজুত করে রাখেন। বেশী দামে বিক্রি করতে অনেকেই বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারী) থেকে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেন। কেউ কেউ দোকান বন্ধও রাখেন। ফলে গত ৩ দিন ধরে নগরীর অনেক দোকানে বেশী দামেও মিলেনি গ্যাস সিলিন্ডার।
রোববার (৪ জানুয়ারী) সরকারীভাবে দাম ঘোষণার পর কেউ কেউ দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করে। সরবরাহ কমা থাকার দোহাই তোলে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করেন। সরকার নির্ধারিত মূল্য মোতাবেক ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৩০৬ টাকা হলেও সিলিন্ডার প্রতি ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। রিটেইলার ও সাব ডিলারদের অভিযোগ ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে পাইকারী বেশী দামে সিলিন্ডার ক্রয় করতে হচ্ছে। তাই তাদেরকেও বাধ্য হয়ে বেশী দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাদের মুনাফা আগের চেয়ে বরং কমেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফা করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবী জানিয়েছেন রিটেইলার ও সাব ডিলাররা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন বছরের ১ম দিন থেকে ১২৫৩ টাকার এলপিজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। এরপরও অনেক এলাকায় মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকেই সরবরাহ নেই, তাই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাব বলছে, বিইআরসির নীরবতায় বাজারে বড়ধরনের কারসাজি চলছে। শুধু সিলেট নয়, দেশজুড়েই এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নগরীর শামিমাবাদ এলাকার বাসিন্দা শাহরিয়ার হাসান স্থানীয় খুচরা দোকান থেকে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে দেখেন দোকান বন্ধ; দোকানদারকে কল করলে জানান, তার কাছে কোনো গ্যাসের সিলিন্ডার নেই। এরপর তিনি পুরো এলাকা ঘুরেও গ্যাস কিনতে পারেননি। বেশি দাম দিয়েও গ্যাস না পেয়ে তিনি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে বাসায় ফেরেন। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতির শিকার ইতঃপূর্বে আর কখনো হননি।
নগরীর সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা মাওলানা আনওয়ার হোসাইন জানান, ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার গ্যাস নগরীর কয়েকটি এলাকায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত আম্বরখানা থেকে শনিবার দুপুরে কিনেছেন ১৮০০ টাকায়। তবে রোববার সেটি ২০০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখেছেন তিনি। দাম বাড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে দোকানদাররা সরবরাহের সংকটের কথা জানান।
বিইআরসি ও এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, শীতের সময়ে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজ সংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯ জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তারপর চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। আমদানি খরচ বাড়ায় কিছু কোম্পানি বাড়তি দাম রাখতে পারে।
সিলেটের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বড় ডিলারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট জেলায় মাসে ৮০ হাজার টি ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার। যা চাহিদার সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। এতে বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলে আগে ৩০টি কোম্পানী সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহ করলেও বর্তমানে মাত্র ৩টি কোম্পানী সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। ফলে সংকট ক্রমশই বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে দামের উপরও।
এ ব্যাপারের সিলেটের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সিলিন্ডার গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটর কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী মো. কামাল হোসাইন দৈনিক জালালাবাদকে জানান, গত ডিসেম্বর মাস থেকে কোম্পানীগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া যারা দিচ্ছে তারাও বর্তমানে বাজারের খুচরা দামে আমাদেরকে সরবরাহ করছে। সিলিন্ডারের সরবরাহের পরিমাণ কমলেও আমাদের জনশক্তি কিন্তু ঠিকই আছে। ফলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার আমাদেরকে ১৪০০ টাকায় পাইকারী বিক্রি করতে হচ্ছে। সেই সুযোগে সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা হয়তো অতিরিক্ত মুল্যে বিক্রি করছে। এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের।
তিনি বলেন, আমাদের ক্রয়মূল্য ও পাইকারী বিক্রিমূল্যের বিষয়টি নিয়ে আমরা ভোক্তা অধিকারের সাথে আলাপ করেছি। শীঘ্রই আমরা তাদের সাথে বৈঠকে বসে এ ব্যাপারে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিবো। আপাতত আমাদেরকে ক্রয়মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য করে ১৫০০ টাকা দরে সিলিন্ডার বিক্রি করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সিলেট জেলার সহকারী পরিচালাক দেবানন্দ সিনহা দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, সিলিন্ডার গ্যাস সংকট শুধু সিলেট নয়, সারাদেশেই চলছে। দুয়েকদিন থেকে এ সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা ব্যবসায়ীদের ডেকেছিলাম। তারা বলেছেন যে, তাদের ক্রয়মূল্য বর্তমান বাজার মূল্য থেকেও বেশী ফলে তাদেরকে বেশী দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা তাদেরকে কোম্পানীর কাছ থেকে ক্রয় করার রশিদ জমা রাখতে নির্দেশ দিয়েছি। শীঘ্রই এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে তাদেরকে নিয়ে আমরা বসবো।

