সাঈদ চৌধুরী
জুলাই বিপ্লব, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করা, সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী আইনজীবীদের পেশাদার সংগঠন ‘লিগেল নেক্সাস ইউকে’র নেতৃবৃন্দ।
ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/973868819108185
সংগঠনের সভাপিত ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও ব্যারিস্টার ওয়াহিদ মাহবুবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম। প্যানেল স্পিকার ছিলেন ব্যারিস্টার ও সলিসিটর মোঃ নুরুল গাফফার, ব্যারিস্টার ও সলিসিটর মওদুদ আহমেদ খান এবং সিনিয়র সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান।

অনুষ্ঠানে লিগেল নেক্সাস ইউকের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্দুর রউফ রুবেল সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রম তুলে ধরেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন সলিসিটর এনামুল হক শাহীন। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ইসলামী ব্যাংক প্রবাসী গ্রাহক পরিষদের আহ্বায়ক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গোলাম মোর্তুজা সিআইপি।
‘জুলাই বিপ্লব, গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কার : সামনের পথ’ (July Revolution, Referendum and the Constitutional Reform: a way forward) শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাস, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ, জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার হয়।

গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও অস্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে বলে সতর্ক বার্তা প্রদান করলেন প্রধান আলোচক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদ দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, বরং এর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ব্যবস্থার সামগ্রিক সংস্কার এবং গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও আইনের শাসন ভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
রাষ্ট্রচিন্তক ও অভিজ্ঞ আইনজীবী শিশির মনির বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশ বারবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে, নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেখা দেয়। এ সময় ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠে আসে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে। এ পরিবর্তনের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

স্বাগত বক্তব্যে লিগেল নেক্সাস ইউকের সভাপতি ব্যারিস্টার ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পরও গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়। অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারীদের প্রতি অনুষ্ঠানে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।

আলোচনায় বলা হয়, সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন এক বিষয় নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের মাধ্যমে প্রকাশিত জনমতের যথাযথ প্রতিফলন এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের আইনি ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে। পাশাপাশি নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা আরও বলেন, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহি, ক্ষমতার ভারসাম্য, মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা অপরিহার্য। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে না পারে, সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আলোচনায় প্যানেল স্পিকার হিসেবে অংশ নিয়ে ব্যারিস্টার ও সলিসিটর মো. নুরুল গাফফার বলেন, সময়ের প্রয়োজনে এবং জাতীয় স্বার্থে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব জনগণের।

সিনিয়র সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান গণভোট এবং জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নে জনগণের মতামতের যথাযথ প্রতিফলনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করে দাবি করেন, সংবিধানটি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এটি কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুমোদিত ছিল না।

ব্যারিস্টার ও সলিসিটর মওদুদ আহমেদ খান গণতন্ত্র, গণভোট এবং সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি দেশের প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সর্বোচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরাসরি গণভোট কিংবা বিপ্লবী পরিবর্তনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় আনেন।
সাংবিধানিক সংস্কারে জনগণের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জটিল সাংবিধানিক বিষয়ে গণভোট কতটা কার্যকরভাবে জনগণের প্রকৃত উদ্বেগ ও মতামত তুলে ধরতে পারে, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাংবিধানিক বিষয়ে তাঁদের বোঝাপড়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে লিগেল নেক্সাস ইউকের (Legal Nexus UK) সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আব্দুর রউফ রুবেল সংগঠনের কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, লিগেল নেক্সাস আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবীদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা, পেশাগত যোগাযোগ এবং আইন ও সংবিধান বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময়ের ক্ষেত্র তৈরি করতে কাজ করছে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি আইন পেশাজীবীরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় অর্থবহ অবদান রাখতে পারবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে আলোচকেরা জুলাই বিপ্লব, গণভোট, কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ ও বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন।

ব্যারিস্টার নজরুল আরো বলেন, জুলাই বিপ্লবের চূড়ান্ত সাফল্য কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মাপা যাবে না, বরং দেখতে হবে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি কিনা যা গণতন্ত্র, ন্যায্যতা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, মানুষের মর্যাদা এবং আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
সাংবিধানিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাংবিধানিক সংস্কার যেন কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির স্বার্থে না হয়, এটি অবশ্যই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করবে এবং এটি নিশ্চিত করবে যেন কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।
ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসন থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনীতিক ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম মনে করেন, রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্য এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
পরিশেষে, লিগ্যাল নেক্সাস ইউকের পক্ষ থেকে সকলের মূল্যবান অংশগ্রহণ ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের দিকে আমাদের পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন এবং পুনরায় সবাইকে সালাম জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।

সংবিধান সংস্কার, গণভোট ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের মাধ্যমে দেশের চলমান সাংবিধানিক সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে ব্যারিস্টার ওয়াহিদ মোহাম্মদ মাহবুব বলেছেন, জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এ বিপ্লব গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে কেবল সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের মধ্যেই বিপ্লবের সাফল্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতটা কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, মৌলিক ও মানবাধিকার সুরক্ষিত করা যায় এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন রাষ্ট্র পরিচালনায় নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।

তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের চরিত্র, রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতা এবং অর্থবহ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে। দেশের বর্তমান সাংবিধানিক সংকট নিরসনে একটি সুস্পষ্ট, আইনসম্মত ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

সমাপনী বক্তব্যে প্রধান আলোচক, প্যানেল আলোচক, অতিথি এবং আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

