সরোয়ার আলম, দেশ রূপান্তর
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘রাতের বেলায়’ ভোট নেওয়ার রহস্য উদঘাটন করতে প্রায় ছয় মাস ধরে পুলিশের সবকটি ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করেছে। এতে রাতের কারিগরদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের তথ্য জানা গেছে। পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে জানা গেছে, রাতের ভোট সম্পন্ন করতে লেনদেন হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন ক্যাডারদের পেছনে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকার একাংশ কয়েকটি খাতে দেওয়ার পর উদ্বৃত্ত অর্থ মেরে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
তদন্তে জানা যায়, অর্থ সংগ্রহের পেছনে আওয়ামী লীগের ছয় প্রভাবশালী নেতা সব ধরনের কলকাঠি নেড়েছেন। তারা দেশ ও বিদেশে অবস্থান করা ব্যবসায়ী ও অন্যান্য খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের ভোট সম্পন্ন করতে নির্বাচনের তিন মাস আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের হাইকমান্ড। এর পেছনে কাজ করেছেন পুলিশের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্তা। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারে থাকলেও বাকিরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাতের ভোটাধিকার জালিয়াতির কুশীলব কারা, তা উদঘাটন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতা ধরে রাখতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ছিলেন অনেকটা বেপরোয়া। গণতন্ত্র হত্যার মতো নির্দেশনাকে মেনে তা বাস্তবায়ন করতে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন পুলিশ, প্রশাসন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। যারা এসব কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের পরিচয়ও উদঘাটন করা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করতেই ‘ভোট কলঙ্কের’ প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন তারা। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার আগের সরকারের নানা অবিচার সামনে নিয়ে আসছে। বিশেষ করে রাতের ভোটের বিষয়টি জোরালোভাবে তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। যারা রাতের বেলায় ভোট নেওয়ার কারিগর ও সহায়তাকারী, তাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় পুুলিশের নাম সবচেয়ে বেশি। সাবেক আইজিপি, পুলিশের সবকটি ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, থানার ওসি, ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টর, জেলা প্রশাসক ও থানার নির্বাহী কর্মকর্তার নাম। তাছাড়া রাতের ভোটের আরেক কারিগর হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের নাম রয়েছে।
রাতে ভোট নিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ৩ মাস আগে : পলিশ সূত্র জানায়, প্রায় ছয় মাস আগে পুলিশ সদর দপ্তর, সবকটি ইউনিট ও কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা আলাদাভাবে তদন্ত করে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বলা হয়েছে, ২০১৮ এর জাতীয় নির্বাচনের মাস তিনেক আগে গণভবনে বিশেষ বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে শেখ রেহানা, তারেক আহমেদ সিদ্দিকী, সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। রাতের ভোট করতে একটি বাজেট ধরা হয়। বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করতে শেখ রেহানা, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা দেশ ও বিদেশে থাকা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন।
ধাপে ধাপে দেওয়া হয় অর্থ : প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৮ হাজার কোটি টাকা দেয় শেখ রেহানাকে। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উভয় খাত জিম্মি করেই করা হয় এ চাঁদাবাজি ও লুটপাট। যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা ধরে রাখা। এসব অর্থের মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরাসরি দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে। বাকি ৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে নেন ছয় পরিকল্পনাকারী। অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় হয় রাজনৈতিক অপারেশন, মাঠপর্যায়ের ম্যানেজমেন্ট এবং গোপন কার্যক্রমে।
রাতের ভোট শেষ করতে পুলিশের জন্য ওই সময় বরাদ্দ করা হয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, যা ধাপে ধাপে নগদ আকারে পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ অর্থ পৌঁছানোর চেইনও ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো। সালমান এফ রহমান, এইচ টি ইমাম এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব হারুন উর রশিদ, উপসচিব ধনঞ্জয় দাস, সিটিটিসির তৎকালীন ডিসি প্রলয় কুমার জোয়ার্দারসহ আরও কয়েকজন নগদ অর্থ পরিবহন ও হস্তান্তরের কাজে যুক্ত ছিলেন। কয়েক দিন ধরে পর্যায়ক্রমে এ টাকা পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছানো হয় বলে সত্যতা মিলেছে অভ্যন্তরীণ তদন্তে।
দ্বিতীয় ধাপে যারা অর্থ বিতরণ করেন : প্রতিবেদনে বলা হয়, সুষম বিতরণের উদ্দেশ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের এলআইসি শাখায় গড়ে তোলা হয় একটি গোপন ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক। এই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন অনেকেই। তাদের হাত ধরেই জেলা, রেঞ্জ, মেট্রোপলিটন ইউনিট, র্যাব ও অন্যান্য বিশেষ ইউনিটে ভোট ডাকাতির টাকা পৌঁছে যায়। ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বরের পর থেকেই তৎকালীন ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার, আটটি রেঞ্জের ডিআইজি, আটটি মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার এবং বিশেষ ইউনিট প্রধানদের হাতে এ অর্থ তুলে দেওয়া হয় বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ভোট ডাকাতির ঘটনায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা নজিরবিহীন।
রেঞ্জ ও জেলায় বরাদ্দের পরিমাণ : একেকটি জেলার জন্য বরাদ্দ ছিল ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা। রেঞ্জ পর্যায়ে দেওয়া হয় ৫ থেকে ১৫ কোটি টাকা। ডিএমপি ও অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনাররা পান ২ থেকে ৭ কোটি টাকা করে। থানা পর্যায়ে ওসিরা পান ১০ লাখ টাকা, ওসি তদন্ত ও অপারেশনস পান ৫ লাখ আর এএসপি ও সার্কেল পর্যায়ের কর্মকর্তারা পান ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করে। আবার কোনো রেঞ্জকে ১৫ কোটি আবার কোনো রেঞ্জকে ৫ থেকে ৭ কোটি দেওয়া হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ রেঞ্জের তৎকালীন রেঞ্জের ডিআইজিদের মাধ্যমে অর্থ বণ্টন করা হয়। তাদের সবাইকেই রাতের ভোট শেষ করায় পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ, বিপিএম বা পিপিএম পদকে ভূষিত করা হয়।
ইউনিটগুলোতে যে পরিমাণ অর্থ বণ্টন : তদন্তে জানা যায়, বেনজীর আহমেদ র্যাবের নামে নেন ১০০ কোটি, এসবির অতিরিক্ত আইজি মীর শহীদুল ইসলাম নেন ৫০ কোটি আর তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী পুলিশ সদর দপ্তরের নামে নেন অন্তত ১৫০ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য ইউনিটের প্রধানরা নেন ৭ থেকে ১০ কোটি টাকা। এ অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো নির্বাচনের দিন ও আগের রাতে ‘নীরব কার্যকর’ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তত ৫২ জন কর্মকর্তা এ অপারেশনে অংশ নেন। তাদের অধীনে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা কেন্দ্র দখল, ব্যালটভর্তি, বিরোধী এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং ভোটের ফল ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশে : পুলিশের তদন্তে বেরিয়েছে, তালিকাভুক্ত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, দুবাই ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, পুলিশ পরিদর্শক, এসআই, সার্জেন্ট, এএসআই, নায়েক কনস্টেবলরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত আছেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, পুরস্কারের জন্য তাদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পদোন্নতি ও পুরস্কৃত করার পেছনে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক ও ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের পদক তালিকায় বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছেন। তাদের পদোন্নতির পাশাপাশি ভালো স্থানে পদায়ন করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নৈশভোটে যারা সব ধরনের সহায়তা করেছেন, তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকাটি সরকারের শীর্ষ মহলের পাশাপাশি দুদকের কাছেও পাঠানো হয়। তদন্তে জানা যায়, রাতের ভোটের কনসেপ্টটি প্রথমে পুলিশের মাধ্যমেই এসেছিল।
ওবায়দুল কাদের ছিলেন সার্বিক ব্যবস্থাপনায় : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি মহানগর, জেলা, বিভাগীয়, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীকে নিয়ে নির্বাচনে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। নেতাদের নির্দেশে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট কেটে ফেলা হয়েছিল। পরে ব্যালট পুড়িয়ে আবারও হিসাব করে ভোট ভরা হয় বাক্সে।

