প্রতিটি সফরই শিক্ষণীয় ও স্মরণীয়। তবে কিছু কিছু সফর অবিস্মরণীয় হয়ে থাকে। বার্সেলোনা সফর তেমনই একটি। বেশ কিছু ফরমাল ও ইনফরমাল সমাবেশ করেছি। তরুণ, যুবক ও বয়স্ক মিলে কয়েকশ আল্লাহর বান্দার সঙ্গে মিশেছি। এ সকল ভাই-বোনদের অনাবিল ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি।
অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে চারদিনের চমকপ্রদ এক সফর শেষ করে স্পেনের বার্সেলোনা থেকে লন্ডনে ফিরলাম। আলহামদুলিল্লাহ। বার্সেলোনায় ইতিহাসের অলিন্দে ঘুরে প্রেরণার মুক্তা আহরণ করেছি। এক চমৎকার অভিজ্ঞতা ও উৎসাহব্যঞ্জক স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এসেছি। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য মনের গভীর থেকে অনেক অনেক দোয়া ও ভালোবাসা।
স্পেনের ইতিহাস মুসলিম উম্মাহর বিজয় ও গৌরবের ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার ইতিহাস, ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, হতাশ-নিষ্পেষিত মানুষের মনের আকাশে আশার ধ্রুবজ্যোতি জ্বালানোর ইতিহাস।
অন্যদিকে, স্পেনের ইতিহাস মুসলিম উম্মাহর বেদনাদায়ক পরাজয়ের ইতিহাস, অবর্ণনীয় নিপীড়নের ইতিহাস, গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবার ইতিহাস।
পরস্পরবিরোধী ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী এই ভূমিতে সফর করতে গিয়ে কখনো ভারাক্রান্ত হয়েছি, আবার কখনো বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়েছি।
৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের অন্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন আদলে, যে বার্সেলোনা কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই মুসলমানদের করতলগত হয়, কালের আবর্তে শাসকশ্রেণীর দ্বীন-বিমুখতা ও নৈতিকতার অধঃপতনের কারণে স্পেনের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ঐতিহাসিক এ শহর থেকেও ইসলামের নাম-নিশানা মুছে যায়।
প্রায় হাজার বছর পর, ১৯৬০ সাল থেকে অভিবাসী হিসেবে আবার মুসলমানদের আগমন শুরু হয়। আলহামদুলিল্লাহ, এমসিএ (MCA) এবং আরো কিছু মুসলিম সংগঠনের বদৌলতে বার্সেলোনা-সহ সমগ্র স্পেনে দ্বীনের দাওয়াত ও পুনর্জাগরণের কাজ শুরু হয়েছে। যে ভূমিতে সব মসজিদ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে আজ বেশ কয়েকটি মসজিদ প্রাণবন্ত দাওয়াহ ও শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
এ সফরে প্রতি সকালে সুগন্ধি লাগিয়ে ঈদের পোশাকে নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে ও প্রশান্তির সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করা ছিল আমার জীবনের অন্যতম প্রশান্তিদায়ক অভিজ্ঞতা। তারুণ্যে উজ্জীবিত এক ঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং তাদের ঈমানদীপ্ত ভিশনের স্বাদ গ্রহণ করা ছিল গোটা সফরের তৃপ্তির অন্যতম উৎস।
তরুণদের স্বপ্ন, সাহস, দরদ, জানার আগ্রহ এবং পরিবর্তনের প্রত্যয় আমাকে উজ্জীবিত করেছে। তাদের ভালোবাসা আমাকে নতুন আশায় উদ্দীপ্ত করেছে। সে দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন তাদের মধ্য থেকেই আমাদের একেকজন রাহবার হয়ে উম্মাহকে মুক্তির মঞ্জিলে পৌঁছে দেবে- ইনশাআল্লাহ।
ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বার্সেলোনার অলিগলিতে হাঁটার চেষ্টা করেছি। তারিক বিন জিয়াদের পদচিহ্ন অনুভব করার চেষ্টা করেছি। তারিক বিন জিয়াদ মসজিদটি দেখে দূর অতীতে ঘুরে বেড়িয়েছি।
বার্সেলোনার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে এবং ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে বারবার কেন জানি কাবার প্রভূর দয়া কামনায় বিভোর হয়ে পড়ছিলাম, এই আশায় যে, মহান মাবুদ এ জমিনকে আবারো সত্যের আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত করবেন। ইনশাআল্লাহ।
তিন সপ্তাহ আগে তুরস্কের আনাতোলিয়ায় একদল মহিমান্বিত ইসলামী স্কলারদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে জ্ঞান ও প্রেরণাদায়ক আমলের এক অসাধারণ পরিবেশে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ঠিক দেড় সপ্তাহের ব্যবাধানে আবারও উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী আরেকটি অভিজ্ঞতা— যা এক আলোকিত ভবিষ্যতেরই হাতছানি…
খোদার বিধানে মুখরিত হবে
এ অপয়া পৃথিবী,
লিখে রাখ অঙ্গীকার—
হে সাহসী কলম।
রাতের আঁধার কেটে জ্বলে উঠে
আলো-ঝলমল দিন,
নবীন সাথীরা চলো সম্মুখে—
আশা দীপ্ত, শঙ্কাহীন।
* ব্যারিস্টার হামিদ হোসাইন আজাদ এমসিএ’র কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট, খ্যাতিমান আইনজীবী ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব

