চার.
বাসার একটু দূরেই একটা টিলা মতো জায়গা, সেখানে বিশাল বিশাল গাছ। রবিঠাকুরের কবিতার মতো ‘তাল গাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে। সব গাছ ছড়িয়ে। উঁকি মারে আকাশে।’ এখানকার গাছগুলো তালের নয়। শালবন, মোহাম্মদ আলী ভাই বলেছিলেন। বিকালটা কাটতো সেই শালবনে, প্রায় দিন। ঝরতো হলুদ পাতা মাথায়, শরীরে। বাতাস উড়িয়ে নিতো ঝরা পাতা। পূর্ব থেকে পশ্চিমে, কখনো উত্তর থেকে দক্ষিণে। তখন শব্দ হতো ঝমঝম। মনে হতো পাতাগুলোর বোঁটায় কারা যেন বেধে দিয়েছে শত শত নূপুর। নূপুরের বাজনা শুনতে শুনতেই ফুরিয়ে যেতো বিকাল।
এই টিলার কি নাম কেউ বলেনি আমাকে। এমন কি মোহাম্মদ আলী ভাইও না। শুধু জেনেছি এটি শালবন। জানার চেষ্টা করিনি হয়তো। জানা হয়নি তাই। তবে শালবন আমাকে ডাকতো। ঝরা পাতারা কানের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতো। নূপুরের আওয়াজ বাজতো মাথার ভিতর। সেখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করতো না। তাই প্রায়ই অন্ধকার এফুড় ওফুড় করে বাসায় ফিরতাম। এজন্যে আম্মা বকাঝকা করতেন মোহাম্মদ আলী ভাইকে। আববাও রাগ করতেন। আসলে অপরাধতো আমার। আমার জন্যে মাশুল দিতে হয় তাকে। একদিন দেরির কারণটা জানিয়ে দিলেন চুপিচুপি আম্মার কাছে। ঘটনা জেনেতো আম্মা চোখদু’টো আমড়া বানিয়ে ফেললেন। আব্বার সাথে পরামর্শ করলেন। তারপর শালবন যাবার দরজা আমার জন্য বন্ধ হয়ে গেলো। কোনো দুষ্টজিন শালবনে আমাকে আটকে রাখতে চায়। এমন একটা ভাবনা আম্মাকে কুকরে ফেলেছিল। মোহাম্মদ আলী ভাইও আম্মার ভাবনার পাশেই বসে থাকল। আব্বা থাকলেন নীরব। মাঝখান দিয়ে আমার বিকালটা হলো মাটি।
আমাদের বাসাটা ছিল পুরান ঢাকায়। লোহারপুলের আশেপাশে কোথায় যেনো। আব্বার কাছেই শুনে ছিলাম লোহারপুল নামটি প্রথম। সেই পুল দেখতে ইচ্ছে জাগত বারবার। কিন্ত যাওয়া হয়নি সেখানে। আম্মার বারণ, পানি আছে পুলের তলায়। তাই বিপদ হতে পারে। আম্মা বলতেন একটুকুন বাচ্চার পুলের ধারেকাছে হাঁটাহাঁটি ঠিক নয়। বড় হলে যাবে। কবে বড় হবো আর কবে বা পুল দেখতে যাবো তাও আবার লোহার পুল। মাঝে মধ্যে আম্মার উপর রাগ হতো। কান্না আসতো, কে বলে আমি ছোট?
এইতো বেশ কটা অক্ষর চিনে ফেলেছি। দু’তিনটা ছড়াও মুখস্থ। আর আম্মা বলতেন আমি নাকি এখনো ছোট। আব্বাকে এসব কথা জানালে আব্বা শুধু হাসতেন। আব্বার এই হাসি আমাকে কাহিল করে তুলতো। পুল দেখার ইচ্ছাটা আরো বাড়িয়ে দিত। বাড়াবাড়ির চাপে কখন যে লোহার পুলের নাম ভুলে গেলাম, মাথার ভেতর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। লোহার পুলের নাম মুছে গেল। একঝাঁক বানর এসে দখল করল সে জায়গা। ছাদভর্তি বানর। ঘরের চালগুলোতেও বানরের দৌড়ঝাঁপ। গাছের ডালে বানর দোল খায়। হৈ চৈ করে। দেখতে মজাই লাগে। দিনের অনেকটা সময়ই পেছনে ফেলে আসি এভাবেই। আম্মা আড়চোখে আমার অবস্থা মেপে যান। ছোট হলেও বুঝতে পারি। আম্মা আমার ভাবনা চিন্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছেন। বানরের চেচাঁমেচির পরও শালবন এসে হাজির হয় চোখের তারায়, মনে হঠাৎ হঠাৎ। লোহার পুল শব্দ করে চলে যায়।
ভূতের গলি নাম শুনলেই রক্ত হিম হয়ে আসে। কি আশ্চর্য সেই গলিতেও নাকি কিছু সময় বসবাস করেছি আমরা। ভূতের গলিতে তো থাকবে ভূত, তাদের আন্ডাবাচ্চা। সেখানে মানুষ? ভাবতে গিয়ে মাথা ঝিমঝিম করে। এরপরও সত্য হলো ভূতের আড্ডাখানায় আমরা ছিলাম। আম্মা জানিয়ে ছিলেন একদিন। আমি নাকি তখন অনেক ছোট। শুধু ফ্যালফ্যাল করে এদিক সেদিক নজর ঘুরাই। কোনটা মানুষ আর কোনটা ভূত কি করে বুঝবো!
পুরান ঢাকার মৈশুন্ডির ধারেকাছে নাকি ভূতদের সেই গলিটি। যে পথ ধরে ভূতরা চলাফেরা করতো। এখানেও জিন-ভূতের উঁকিঝুঁকি। শালবনে, শালপাতার আড়ালে আবডালে। এমনটা অবশ্য আম্মার চিন্তা-ধারণা। এসব ব্যাপারে আব্বা বরাবরই নিরব থাকতেন। নীরবতাই ছিল তার সাথী। মাঝে মাঝে বই আনতেন। রঙিন ছবিঅলা বই। ছবির তলায় দু’লাইন চার লাইনের ছড়ার কবিতা। অবশ্য সে সময়ও বুঝতে শিখিনি কোনটি ছড়া আর কোনটি কবিতা। বইয়ের পাতা উলটাতে উলটাতেই সময় চলে যায়। আম্মা পড়েন আর আমি শুনি। এমনি একটা রুটিন চালু হয়ে গেছে বাসায়। শুনতে শুনতে দু’একটা মজার লাইন মাথায় আটকে থাকে। সেই আটকে থাকা লাইনগুলো এক সময় বেড়িয়ে আসে শব্দ করে ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে। এমনি দু’টি লাইন এতদিন পরেও মনের বাক্স থেকে হারিয়ে যায়নি। ‘ফরহাদ যাবে গাঁয়ে/লাল জুতা পায়ে।’ এ রকম আরো লাইন, ছবি। দেখে দেখে সময় যে কখন ফুরিয়ে আসতো।
ফুরিয়ে যাওয়া সময়কে দৌড়ে ধরতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠতো কোনো কোনো দিন। সূর্য যখন লালরঙ ছিটাতে শুরু করতো পশ্চিম আকাশে তখন মোহাম্মদ আলী ভাই এসে খুব নরম গলায় বলতেন ভাইয়া হাঁটতে যাবেন না! তখনই মনের চনমনে ভাবটা জেগে উঠতো। আম্মার সাবধান বাণী কোত্থেকে যেনো দৌড়ে চলে আসতো এ সময়। আর অমনি ছোট হয়ে যেতো আনন্দের পৃথিবী। বাইরে যাওয়া যাবে তবে শালবনের দিকে নয়। ঘরে ফিরতে হবে মাগরিবের আজানের সাথে সাথে। এর যেনো হেরফের না ঘটে।
মোহাম্মদ আলী ভাই ঘাড় কাত করে সায় দিতেন। আম্মার সাবধানী বাণীগুলোর পিছে পিছে হাঁটতেন। আমি শুধু মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এভাবেই বিকালটা ভাগ হয়ে যেতো আমার। পাখির ডানা ঝাপটানি বাগানে ফুলের বাহারি রঙ-গন্ধ, গাছের ফাকফোঁকর দিয়ে চলে যাওয়া বাতাস, কখনো ঠান্ডা কখনো গরম, মাঠের পর মাঠ। এত কিছুর পরও কিসের যেন একটা অভাব নিয়ে ঘরে ফিরতাম, আম্মার বেঁধে দেওয়া সময় মতো। শালবন, হলুদ শালপাতার মর্মর শব্দ কোনো কোনো দিন ঘরের দরজা পর্যন্ত চলে আসত। কিন্তু ওদের দিকে তাকাতে বারণ। বুকের ভিতর একটা কষ্ট আটকে রেখে দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়তাম।
চারপাশের বাড়িগুলোর ছাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতো অন্ধকার। ততক্ষণে ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতো আজানের শব্দগুলো। ঝমঝম আওয়াজ করে। সন্ধ্যাপূজার ঘন্টা বাজতো কোনো কোনো বাড়িতে। ফুলের গন্ধে মাখামাখি হতো বাতাস। এভাবেই প্রতিদিনের আঁধার নামতো ছাদে, উঠানে। নামাজের আয়োজন করছেন আব্বা-আম্মা, ঘরে ঢুকেই দেখতাম। এমনিই ছিল সন্ধ্যার পরিবেশ। আশপাশের বাড়িঘর থেকেও ভেসে আসতো বাতাস। খুব সাবধানে হাঁটতো। এরই ফাঁকে জ্বলে উঠতো বাতি-হারিকেন। তখন আঁধার ফুটো করে ছড়িয়ে পড়তো আলোর ঝিলিক। নীরবতা নামতো পাড়ায়-পথে।
একটি কি দু’টি রিক্সা ঘোড়ার গাড়ি শব্দ করে চলে যাচ্ছে পাশের সড়ক দিয়ে। ঘোড়ার খুড়ের ঠকঠক আওয়াজ। টুং টাং রিক্সার ঘন্টি। লাইট পোস্টের আগায় ঝুলতো বাল্ব, পিটপিটে আগুনের চোখ দিয়ে। বানরের দৌড় ঝাঁপ কোথায় যেন মিলিয়ে যেতো। মোট কথা এক অন্যরকম চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো রাতের ঢাকা, আমার সামনে। দিনের ঢাকা ছিলো অবশ্য ভিন্নরকমের। চোখে মুখে আনন্দের হুল্লুড়। যদিও চারপাশে গরিবি গরিবি ভাব দেখে দুঃখের বৃষ্টি মনে। আমি তখন পঞ্চাশ দশকের মাঝের দিনগুলিতে ঢুকে পড়েছি।

পাঁচ.
আব্বা অফিস থেকে ফিরতেন সূর্য যখন কিছুটা ঝুলে পড়তো পশ্চিমাকশে। আম্মা ব্যস্ত হয়ে যেতেন খাবারদাবার পরিবেশনের আয়োজনে। ফরাশ বিছানো হতো মেঝেতে। তার উপর থাকতো দস্তরখান। হাত ধোয়ার জন্য চিলমচি। দস্তরখানা ছিল এখনকার সময়ের বনপ্লেট। নানান রঙের কাপড় দিয়ে তৈরি হতো সেসব দস্তরখানা। তখনতো আর বেসিন জাতিয় তেমন কিছু ছিল না, চিলমচিই ছিল সে জামানার বেসিন। ভদ্র এবং শিক্ষিত পরিবারগুলোর খাবারের পরিবেশনটি ছিল মোটামুটি এরকমের। মেহমানদারি হতো খাট বা চৌকির বিছানায় বসিয়ে। দাদা-নানাদের দেখেছি তারা বরাবরই বিছানায় বসে খানাদানা করতেন। কারণ তখনো ডাইনিং টেবিলের রেওয়াজ চালু হয়নি ঘরে ঘরে। ফরাশে বসে পরিবারের সবাই মিলে খানাপিনার সরাফতিটা ছিল আলাদা। একেবারেই অন্যরকম।
কেউ কেউ বসতো পিঁড়িতে। পিঁড়ির চলটা ছিল বিশেষভাবে গ্রামের দিকে। গরিব পরিবারে। শহরেও কোনো কোনো বাড়িতে পিঁড়িটিড়ি ছিল। দুপুরের খাবারের পর কিছুটা বিশ্রামে যেতেন আব্বা-আম্মা। তা চলতো আসর পর্যন্ত। ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতাম আমিও, মাঝে মধ্যে। তবে বেশির ভাগ সময়গুলো কাটতো নির্ঘুম, আমার। তখন সঙ্গী হতো মোহাম্মদ আলী ভাই। ছাদে চলে যেতাম খুব সাবধানে, আমরা দু’জন। সেখানে চলতো দুস্তদুশমন খেলা বানরের সাথে। বানররাও বিশ্রামের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে যেতো।
ঝুলে পড়া সময়টিতে দু’একটা ধাড়ি বানরই দৌড়ঝাঁপ দিতো এ ছাদ থেকে অন্য ছাদে। গেইটের ধার ঘেঁষে একটি নিমগাছ, বেশ বড়সড়। ঝিমধরা নিমপাতার ফাঁক দিয়ে ঝুলতো অনেকগুলো লেজ। মাঝেমধ্যে কিচ কিচ করে লাফিয়ে চলে যেত এক ডাল থেকে অন্য ডালে। অবাক হয়ে দেখতাম। বানররাও পিটপিটে চোখে লক্ষ্য করতো আমাদের গতিবিধি। মোহাম্মাদ আলী ভাই লাঠি রাখতেন সাথে। শুনসান সময়। জনমানুষের আনাগোনা কমে আসে তখন। যে কোনো সময় আক্রমণ করতে পারে, ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। আব্বা বলেছিলেন, ওদের সুযোগ দিতে নেই। সুযোগ দিলেই নাকি মাথায় চেপে বসে। মোহাম্মদ আলী ভাই ঘরের বাইরে গেলেই সঙ্গে থাকতো লাঠি। তাই ছাদেও লাঠি তার সঙ্গী। দেখেছি লাঠির প্রতি ভয় খুব বানরদের। যে জন্যে ধারেকাছে ঘেঁষতো না। বানর আর আকাশ দেখে দেখেই কাবার হতো সময় আমাদের। ভয়ে ভয়ে ছাদ থেকে নিচে নামতাম।
দু’তলা বাসায় এলেন নানা। তিনি এলে তো আনন্দের হুড়াহুড়ি শুরু হয়ে যায় বাসাজুড়ে। খুশি যেনো লাফিয়ে লাফিয়ে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ঢুকে পড়ে। এমনি একটা গন্ধমাখা আনন্দ চারপাশে। কারণ নানার উপস্থিতি। যদিও থাকতেন এক বা দু’দিন। এই এক দু’দিনেই রাজ্যের গল্প-কাহিনী জমা হয়ে যেতো।
ছবিওয়ালা ছড়ার বইগুলো এনে দেখাতাম নানাকে। ভুলভাল দু’একখানা ছড়া শুনিয়েও দিতাম। নানা ঠিকঠাক করে সাজিয়ে দিতেন লাইনগুলো। প্রজাপতির মতো উড়তাম নানার কথার পিছন পিছন। আমার এই খলবল অবস্থা দেখে তৃপ্তির হাসি হাসতেন। আনন্দের ফুলগুলোতে চোখ রাখতেন। কোল ঘেঁষে বসতাম। নানার হাতের তালু তখন আমার মাথা ও পিঠে। আম্মা চক্কর দিতেন এ ঘরে। বুঝতাম তার শাসনের থাবা লাফিয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু উপায়হীন। কারণ নানা।
আম্মার এই অসহায় ভাবখানা আমাকে দুঃখের দীঘিতে নামিয়ে আনতো। আবার বিজয়ের পতাকাটিও উড়তো পতপত পাশাপাশি। দুঃখ আর বিজয়কে এক পকেটে রেখেই গল্পের উঠানে জড়ো হতাম। ধারেকাছে থাকতো মোহাম্মদ আলী ভাই। সুযোগ বুঝে লোহারপুল আর শালবনের কথা জানালাম নালিশের সুরে। নানা শুনলেন। কি জানি একটা বলতে চাইছিলেন আম্মা। তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন ছোটদের ঘরে আটকে রাখতে নেই। এমনটা ঠিক নয়। বাইরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনতে হয়। বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। তা না হলে জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনা কোনোটারই স্বাস্থ্য সুন্দর হয় না।
নানুভাই অবশ্যই লোহারপুল দেখতে যাবে। আমি নিয়ে যাবো। এ ব্যাপারে আর কোনো আপত্তি চলবে না। আমি তো লাফিয়ে উঠলাম। নানুর গলা জড়িয়ে থাকলাম। আমার এমন আনন্দ দেখে আম্মা হাসলেন। নানুভাই আম্মার কথাও কিন্তু শুনতে হয়, মানতে হয়। আমার চোখের ভিতর নানুর চোখ। আমি আম্মার দিকে তাকিয়ে থাকলাম অপলক। একটা অন্যরকমের উত্তেজনায় কাটলো সময়। লোহারপুল দেখার উত্তেজনা।
নানু বললেন কোনো কিছু দেখার আগে তার ইতিহাস জেনে রাখা ভালো। জানা থাকলে দেখায় ভিন্ন রকম মজা আসে। তৃপ্তিও পাওয়া যায় অনেক। এই যে লোহারপুল যা দেখতে যাবো আমরা, সে পুলের কাজ শুরু হয়েছিল ১৮২৮ সালে। শেষ করতে সময় লেগেছিল পুরো দু’বছর। এপাড়ে ফরাশগঞ্জ আর ওপারে গেন্ডারিয়া। মাঝখানে ধোলাইখাল। এখালের উপরই তৈরি হলো লোহারপুল।
পুলতো তৈরি হলো, এটি কতটা মজবুত হয়েছে তা কি করে বুঝা যাবে? উপায় ধরা দিলো। পাঁচটি বড় বড় হাতি তুলে দেয়া হলো পুলে। হাতিগুলো হেলে দোলে হাঁটতে হাঁটতে পার হয়ে গেল পুল। আর অমনি হৈ হৈ করে উঠলো দুই পাড়ের মানুষ, খুশিতে। এ পুল তৈরির সব লোহালক্কর আনা হয়েছিল সেই সুদূর ইংল্যান্ড থেকে। মিস্টার ওয়ালটার্স রাত-দিন পরিশ্রম করে এই পুল তৈরির আয়োজন করেছিলেন। ওয়ালটার্স ছিলেন তখনকার ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট। এর আগেও অবশ্য ধোলাইখালে একটি পুল ছিল। তৈরি করেছিলেন মোগল সুবেদার মীর জুমলা। সেটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই নতুন আয়োজন। নানার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনছিলাম। আর লোহারপুল দেখার ইচ্ছাটা দৌড়ে এসে আছড়ে পড়ছিল মনের দেয়ালে। চোখের পর্দায়ও।

ছয়.
নানা চলে যাবেন তাই সকাল সকাল উঠা। আম্মার কান্না কান্না চেহারা। সারা ঘরজুড়ে যেন তেমনি একটা পরিবেশ দাঁড়িয়ে আছে। কখন যেন মোহাম্মদ আলী ভাই একটি ঘোড়ার গাড়ি এনে রেখেছেন বাড়ির সদর দরজায়। উড়ে আসছে ঘোড়ার চিঁ চিঁ শব্দ। দৌড় দেবার জন্য উসখুস করছে ঘোড়া দু’টি। কেবল আদেশের অপেক্ষা। এরি মধ্যে তৈরি হয়ে নিয়েছেন নানা। সাদা পাঞ্জাবী সাদা পায়জামা, মাথায় খয়েরি রংয়ের উঁচুমতো টুপি, টুপির পাশে ঝুলছে এক গোছা কালো ঝালর।
এসব বিশেষ ধরনের টুপির নাম নাকি তুর্কি টুপি। কেউ কেউ বলেন রুমি টুপি। ইরানের বিখ্যাত কবি মওলানা রুমি এরকম টুপি মাথায় রাখতেন। নানাকে দেখেছি বরাবরই এই টুপিতে। পায়ে কালো পামসু। হাতে হাতির দাঁতের বাঁধানো কালো লাঠি। বুকপকেটে চেইনে আটকানো ঘড়ি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে সুগন্ধি আতর, পোশাক থেকে। নানা তার সরাফতি বেশভূষায় ঘোড়ার গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। তিনি এখান থেকে যাবেন ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন। তারপর ভৈরববাজার। সেখান থেকে নিজস্ব নৌকায় নানাদের গ্রাম আগানগর।
নানা চলে গেলেন। বাতাসে বাজল করুণ বাঁশি দু’চার দিন। এরপর আনন্দের প্রজাপতি উড়তে শুর করে আবার। বাঁশির সুরে খুশির বাদ্য। সময়ের আঙুল ধরে হাঁটছি সকাল-বিকাল। মাঝে মধ্যে ঝুলবারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। একটু দূরেই সদর রাস্তা। যাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, রিক্সা এক দু’টি গরুর ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে। দু একজন মানুষের আসা যাওয়াও থাকে তখন। সেসব দেখতে দেখতে আম্মার ডাক আসে।
বুঝতে পারি গোসলের সময় এখন। ঠিক তালুর উপর থাকতো সূর্যের আগুনের মতো চোখ। নিমগাছের তলায় শুয়ে থাকতো দু’টি কুকুর। ছায়ায় বসে হাফাতো। ডালের ফাঁক-ফোকরে ঝুলতো বানর। আব্বা-আম্মা ভাই-বোনসহ। ওদের গোসলের তাড়া নেই কেন? মোহাম্মাদ আলী ভাইয়ের সাথে কথা বলতে হবে এ ব্যাপারে। নানা চলে যাবার সপ্তাখানেকের মধ্যেই কেমন যেন একটা পরিবর্তেনের বাতাস ঘরের দরজা জানালায় এসে মাথা ঠুকছে। একটা ছাড়াছাড়া ভাব আব্বা-আম্মার কাজকামে, কথা-বার্তায়। চাচা-চাচি আসছেন ঘনঘন। ফিশফাশ করেন, পরামর্শ করেন। মোহাম্মাদ আলী ভাইও যোগ দেন এসব পরামর্শ সভায়।
এমন যখন এলোমেলো বাতাস বইছে ঘরে আমি কাছেপিছে থাকি। একবার আব্বার দিকে নজর ফেলি আর একবার আম্মাকে দেখি। কিন্তু তেমন কিছুই আন্দাজ করতে পারি না। তবে কিছু একটা যে ঘটতে যাচ্ছে তা বুঝে আসছে একটু একটু। এ কয়দিনে আম্মা পাঠ করে ফেললেন আমার মনের ভাবখানা। তাই ব্যাপারটা খোলাসা করলেন। আমরা ঢাকা ছাড়ছি সহসা। কারণ আব্বাকে নাকি বদলি করা হয়েছে কুমিল্লা ডাকবিভাগে। আমাদেরকে কুমিল্লা যেতে হবে। এ জন্যেই দ্রুত গোছগাছ, শলাপরামর্শ।
এরিমধ্যে একটা মায়ামায়া ভাব আটকে যাচ্ছিল মনের দেয়ালগুলোতে। ভিসতিওয়ালা শালবন, লোহারপুল ছাদ থেকে ছাদে বানরের লাফালাফি আর দোতালা বাসার পলেস্তার উঠা রুমগুলোর সোঁদা গন্ধের কথা মনে আসতেই কান্নারা নড়েচড়ে উঠে। মমতার পাপড়িগুলো ঝরতে থাকে ঝুরঝুর, হিজল ফুলের মতো।
আসলেই আমরা একদিন বিদায় জানালাম ঢাকাকে। পেছনে পড়ে থাকল লাল ইটের ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন। আম্মা আর আমি উঠেছি মহিলাদের বগিতে। রেলগাড়িতে পুরুষ আর মহিলাদের জন্য আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা। মহিলাদের বগির দরজায় একজন মহিলার মুখ আঁকা। জানালায় লোহার শিক বসানো। বাচ্চাদের জন্যে এমন ব্যবস্থা। ঘোড়ার গাড়ি এবং রিক্সায়ও সে রকমেরই নিয়ম। যে গাড়ি বা রিক্সায় মহিলা যাত্রী চড়তো সেটি ঢেকে দেওয়া হতো শাড়ি বা বিছানার চাদরে।
আমাদের ঘোড়ার গাড়িটিও আম্মার পুরানো শাড়ি দিয়ে পেচানো হয়েছিলো। একটা দমবন্ধ অবস্থায় পড়ে প্রতিবাদ করেছিলাম। আম্মা জানালেন এটিই নাকি রেওয়াজ। সরাফতির অংশ। চলতে চলতে আরো কয়েকটি বাহন দেখলাম পর্দা ঘেরা। বুঝলাম ওগুলোতেও আম্মার মতো মহিলারা যাচ্ছেন। ব্যাপারটা হাসি হাসি লাগে আমার কাছে। মহিলাদের অন্ধকারে থাকতে হবে কেন? কথা শুনে আম্মা খুশি খুশি চেহারা নিয়ে আমার দিকে নজর ফেলেন। পাশের বগিতে আব্বা আর মোহাম্মদ আলী ভাই। তাদের কাছে যাবার জন্যে মন উসখুস করে। কিন্তু কি ভাবে যাবো? একবগি থেকে আর এক বগিতে যাবার কোনো সুজোগ নেই। পথ নেই, দরজা নেই।
আমাদের বগিতে দু’তিনজন মহিলা। সাথে বাচ্চাকাচ্চাও আছে। একজন আমার সমবয়সী হবে হয়তো। উনারাও কি কুমিল্লা যাচ্ছেন? কুমিল্লা কেমন শহর কে যানে। আম্মাও বলতে পাড়লেন না, কুমিল্লা শহরের চেহারাটা কেমন? হুঁশ হুঁশ করে রেল চলছে। কালো ইঞ্জিনের মাথা থেকে বেড়িয়ে আসছে কালো ধোঁয়া। হুইসেল বাজছে। কখনো পার হয়ে যাচ্ছে পুল। নিচে নদী, নৌকা। দূরে গ্রাম, ঘরবাড়ি গাছপালা। সব চলে যাচ্ছে পিছনে।
রেলগাড়িতে একটা অন্যরকম আনন্দে ডুবে গেলাম। দৌড়াচ্ছে গাড়ি, দোলছে গাড়ি। এই দৌড়াদৌড়ি আর দুলুনিতে আম্মার কোলে ঘুমিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল একটা ঘুমপাড়ানি গানের রাজ্যে ঢুকে পড়েছে আমাদের রেলগাড়িটি। ‘ঝিকমিক টিকটিক হাসে গাড়ি ফিকফিক। চোখজুড়ে নামে ঘুম, ঝলমল ঝিকমিক।’ এমনি ঝিকমিক ঘুমরাজ্য পার হয়ে এলাম।
কত সময় ঘুমে ছিলাম কে জানে। আম্মার ডাকাডাকিতে জাগতে হলো। চোখ মেলে দেখি অন্যরকম ছবি। গাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে। লোকজন নামছে উঠছে, ফেরিওয়ালাদের ডাকাডাকি। কুলিদের মাথায় মাথায় মালপত্র। একটা হৈ চৈ অবস্থার মাঝখান দিয়ে আমরা বেড়িয়ে এলাম।
আব্বাকে দেখেই দু’তিন জন রিক্সাওয়ালা দৌড়ে এলো। মালপত্র সব সাজিয়ে নিলো রিক্সায়। তারপর গন্তব্যে রওয়ানা দিলো আমাদেরকে নিয়ে। ব্যাপার দেখে আমি তো অবাক। কোথায় যাব, পয়সাকড়িই বা কতো লাগবে এসবের কোনো ফয়সালা না করেই রিক্সা আগে বাড়তে থাকলো টুং টাং শব্দ করে। আব্বাকে ওরা কেউ ডাকছে মামা কেউ ডাকছে ভাইজান। বুঝলাম আব্বা রিক্সাওয়ালাদের কাছে আগে থেকেই জানাশোনা, পাড়াপড়শীও হবে হয়তো। পরে জেনেছিলাম ওরা আমাদের গ্রামেরই লোক।
জীবনঘুড়ির আকাশ দেখা খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক, কবি ও ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন খানের জীবনের গল্প (ধারাবাহিক চলবে)

