‘সরকার উল্টো রথে, উল্টো পথে চলছে’- মন্তব্য করে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে তা এক দফায় পরিণত করে রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রংপুর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের শান্তি ও স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ভুলে গিয়ে ‘এক এক করে উল্টো পথে’ হাঁটছে। তিনি বলেন, ‘যেই পথে হেঁটে শেখ হাসিনা দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিলেন, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি বর্তমান সরকারও সেই পথেই হাঁটছে। আপনারা যদি একই পথে হাঁটেন, তাহলে আপনাদের পরিণতিও একই হবে।’
জনগণের দাবির প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, ‘১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে আমাদের আট দফা এক দফায় পরিণত হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, দেশের সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের সংকটে ভুগছেন। তরুণদের কর্মসংস্থান নেই। সরকারি দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, জনগণের ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, গণভোটের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকলে ২০২৪ সালের গণআন্দোলন কোন সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘মানতে হলে সবটা মানতে হবে, আর বাদ দিলে সবটা বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে।’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তিস্তা বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাত মাসেও এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘জনগণকে বারবার ধোঁকা দেওয়া ঠিক হবে না।’ রংপুরসহ গোটা উত্তরাঞ্চলকে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুযোগ পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং নদীগুলোর প্রাণ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জে এক ব্যক্তির ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা দেন। এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটলে ১৮ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা বলেন জামায়াতের আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের প্রসঙ্গও বক্তব্যে উঠে আসে। তাঁকে ‘২৪-এর আন্দোলনের আইকন’ হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াত আমীর।
২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলকে কোরআন ও সুন্নাহবিরোধী দাবি করে সরকারকে সতর্ক করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি রাষ্ট্রপতির প্রতি এতে স্বাক্ষর না করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, আইনটি পাস হলে বাংলাদেশের মুসলমানেরা প্রতিবাদ করবে, এতে ঘরে ঘরে ঝড় সৃষ্টি হতে পারে। কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী আইন করার মূল্য সরকারকে দিতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মজলুম জননেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর সহকারী অঞ্চল পরিচালক মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর মহানগর আমির এ টি এম আজম খান, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, ছাত্রনেতা রেজাউল করিম শাকিল, সাবেক শিবির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল, সাবেক শিবির সভাপতি রাজিবুর রহমান পলাশ, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রংপুর মহানগর সভাপতি মাওলানা ইব্রাহীম খলিল, জাগপার কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, এনসিপির মহানগর আহ্বায়ক আব্দুল মালেক, জেলার আহ্বায়ক আল মামুন এবং বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহানগর সভাপতি শামসুদ্দিন রাজা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা প্রমুখ।
সমাবেশ সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি আল আমিন হাসান, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক এবং শিবিরের রংপুর মহানগর সভাপতি আনিসুর রহমান।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপিও সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, পুলিশ সংস্কার কমিশন না করা, গুম-সংক্রান্ত আইন এবং পুলিশকে বিরোধী দল দমনে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের চেষ্টা সফল হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা আর কাউকে স্বৈরাচারী হতে দেবে না। যদি কেউ স্বৈরাচারী হওয়ার চেষ্টা করে, রংপুরের মাটি থেকেই প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম বিপ্লবের আহ্বান আসবে।’ গণভোটের রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণ গণভোটে ভোট দিলেও সেই রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, দেশে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিচার নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। রংপুর অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে সার, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও এলাকায় দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসের অভিযোগও করেন তিনি।
১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সমাপনী এ সমাবেশে বিরোধী দলের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা বক্তব্য দেন। তাঁদের বক্তব্যে সরকারের নীতি, গণভোটের রায়, বিচারপ্রক্রিয়া, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং দ্রব্যমূল্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরা হয়।

