স্বাগতম ১৪৪৬ হিজরি

ধর্ম ও দর্শন প্রবন্ধ-কলাম
শেয়ার করুন

অধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট মাওলানা রফিক আহমদ চৌধুরী

আজ হিজরি ১৪৪৫ সনের শেষ দিন এবং আগামী কাল রোববার দক্ষিণ কোরিয়ার সময় অনুসারে ১৪৪৬ সনের প্রথম দিন। যদিও সৌদি আরব-সহ অনেক দেশে আজই হিজরী নববর্ষের সুচনা হয়েছে। দিন রাত মাস ও বছরের এ পরিক্রমা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক। তবে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণের বহু উপলক্ষ। কুরআনে কারীমে সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন- إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالأرْضِ وَاخْتِلافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لآياتٍ لأولِي الأَلْبَابِ অর্থাৎ “নিশ্চয়ই নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলী রয়েছে”।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- كُلّ النّاسِ يَغْدُو فَبَايِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا. প্রতিটি মানুষ সকাল যাপন করে; অতঃপর নিজেকে বিক্রি করে। এভাবে কেউ নিজেকে (আল্লাহর আনুগত্যে নিয়োজিত করে জীবনকে ধ্বংস থেকে) রক্ষা করে। আর কেউ (নফস ও শয়তানের আনুগত্যে নিয়োজিত হয়ে) নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে। – সহীহ মুসলিম

সৃষ্টির প্রারম্ভিক কাল থেকেই আল্লাহ তায়ালা বার মাসে বছর নির্ধারণ করেছেন। মাসগুলোর যে নাম ইসলামী শরীআতে প্রচলিত, তা মানবরচিত পরিভাষা নয়, বরং রাব্বুল আলামিন যেদিন আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিনই মাসের ধারাবাহিক নাম ও বিশেষ মাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুম আহকাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তার মধ্যে চারটি মাস হল নিষিদ্ধ মাস, যাতে বিশেষ করে লড়াই-ঝগড়া নিষিদ্ধ।

সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- اِنَّ عِدَّۃَ الشُّهُوۡرِ عِنۡدَ اللّٰهِ اثۡنَا عَشَرَ شَهۡرًا فِیۡ كِتٰبِ اللّٰهِ یَوۡمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ مِنۡهَاۤ اَرۡبَعَۃٌ حُرُمٌ ؕ ذٰلِكَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ۬ۙ فَلَا تَظۡلِمُوۡا فِیۡهِنَّ اَنۡفُسَكُمۡ وَ قَاتِلُوا الۡمُشۡرِكِیۡنَ كَآفَّۃً كَمَا یُقَاتِلُوۡنَكُمۡ كَآفَّۃً ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ مَعَ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۳۶﴾ অর্থাৎ “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট গণনার মাস বারোটি, আসমান-সমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন থেকে। এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না” ।

দুই ঈদ ছাড়া সাধারণত দিবস উদযাপনে ইসলাম অনুৎসাহিত করে বিধায় হিজরি নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। হিজরি সন সম্পর্কে অনেকেই জানারও চেষ্টা করেননা। এমনকি অনেকেই জানেননা না যে, মুসলিমদের নববর্ষ কোন মাসে হয়? অথচ হিজরি সনের হিসাব মুসলিম জাতির জন্য অপরিহার্য। শরিয়তের আহকামের ক্ষেত্রে চন্দ্রমাসই নির্ভরযোগ্য। চন্দ্রমাসের হিসেব মতেই রোযা, হজ ও যাকাত প্রভৃতি আদায় করতে হয়। – কুরতুবী

কুরআন মজীদে আল্লাহপাক চন্দ্রের মত সূর্যকেও সন-তারিখ ঠিক করার মানদন্ডরূপে অভিহিত করেছেন। সুরা আনয়ামের ৯৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন- فَالِقُ الۡاِصۡبَاحِ ۚ وَ جَعَلَ الَّیۡلَ سَكَنًا وَّ الشَّمۡسَ وَ الۡقَمَرَ حُسۡبَانًا ؕ ذٰلِكَ تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ ﴿۹۶﴾ অর্থাৎ “তিনি রঙ্গিন প্রভাতের উন্মেষকারী। আর রাত সৃষ্টি করেছেন শান্তি ও আরামের জন্য এবং সূর্য ও চন্দ্র (বানিয়েছেন) গণনার জন্য। এটা সর্বজ্ঞ পরাক্রমশালী কর্তৃক নির্ধারিত”। সূরা আর-রাহমানের ৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- اَلشَّمۡسُ وَ الۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ অর্থাৎ “সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী”।

সূরা ইউনুসের ৫নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন- هُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ الشَّمۡسَ ضِیَآءً وَّ الۡقَمَرَ نُوۡرًا وَّ قَدَّرَهٗ مَنَازِلَ لِتَعۡلَمُوۡا عَدَدَ السِّنِیۡنَ وَ الۡحِسَابَ ؕ مَا خَلَقَ اللّٰهُ ذٰلِكَ اِلَّا بِالۡحَقِّ ۚ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ﴿۵﴾ অর্থাৎ “তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময়, আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন”। অতএব চন্দ্র ও সূর্য উভয়টির মাধ্যমেই সন-তারিখ নির্দিষ্ট করা জায়েজ। তবে চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর অধিকতর পছন্দ।

মুহাররাম মাস ইসলামী পঞ্জিকার প্রথম মাস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সময়ে ও তার পূর্বে রোমান, পারসিয়ান ও অন্যান্য জাতির মধ্যে তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল। আরবদের মধ্যে কোনো নির্ধারিত বর্ষ গণনা পদ্ধতি ছিল না। বিভিন্ন ঘটনার উপর নির্ভর করে তারিখ বলা হতো।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতকালেও মুসলিমদের উদ্ভাবিত কোনো সনের ব্যবহার শুরু হয়নি। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকাল ছিল ইসলামের বিজয় ও সম্প্রসারণের স্বর্ণযুগ। এ সময় ইসলামী সাম্রাজ্য আরব বিশ্বের সীমানা পেরিয়ে সুদূর রোম ও পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। হিজরতের ১৭ বছর পরে প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরী (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হযরত উমার (রা)কে পত্র লিখে জানান যে, সরকারী ফরমানগুলিতে সন-তারিখ না থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়; এজন্য একটি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার প্রয়োজন।

খলিফা উমার (রা) সাহাবীগণকে একত্রিত করে পরামর্শ চান। কেউ কেউ রোম বা পারস্যের পঞ্জিকা ব্যবহার করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু অন্যরা তা অপছন্দ করেন এবং মুসলিমদের জন্য নিজস্ব পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এ বিষয়ে কেউ কেউ পরামর্শ দেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর বা জন্ম থেকে সাল গণনা শুরু করা হোক। কেউ কেউ তাঁর নুবুওয়াত থেকে, কেউ কেউ তাঁর হিজরত থেকে এবং কেউ কেউ তাঁর ওফাত থেকে বর্ষ গণনার পরামর্শ দেন। হযরত আলী (রা) হিজরত থেকে সাল গণনার পক্ষে জোরালো পরামর্শ দেন। খলিফা উমার (রা) এ মত সমর্থন করে বলেন যে, হিজরতই হক্ক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যের সূচনা করে; এজন্য আমাদের হিজরত থেকেই সাল গণনা শুরু করা উচিত। অবশেষে সাহাবীগণ হিজরত থেকে সাল গণনার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। হিজরকের মাধ্যমেই প্রথম মুসলিম সম্প্রদায় (উম্মাহ) প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোন্ মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করতে হবে সে বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়। কেউ কেউ রবিউল আউয়াল মাসকে বৎসরের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন; কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসেই হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন। ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি মদীনায় পৌঁছান। কেউ কেউ রামাদ্বান থেকে বর্ষ শুরুর পরামর্শ দেন; কারণ রামাদ্বান মাসে আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন। সর্বশেষ তাঁরা মুহারাম মাস থেকে বর্ষ শুরুর বিষয়ে একমত হন; কারণ এ মাসটি ৪টি ‘হারাম’ বা সম্মানিত মাসের একটি। এছাড়া ইসলামের সর্বশেষ রুকন হজ্জ পালন করে মুসলিমগণ এ মাসেই দেশে ফিরেন। হজ্জ পালনকে বৎসরের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ কর্ম ধরে মুহাররাম মাসকে নতুন বৎসরের শুরু বলে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এভাবে রাসূলুল্লাহ -এর ইন্তেকালের প্রায় ৬ বৎসর পরে ১৬ বা ১৭ হিজরী সাল থেকে সাহাবীগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে হিজরী সালগণনা শুরু হয়। যদিও হিজরত রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়, তবুও দুমাস এগিয়ে, সে বৎসরের মুহারাম থেকে বর্ষ গণনা শুরু হয়।’

যীশুখৃস্টের প্রায় ১৬০০ বৎসর পরে ১৫৮২ খৃস্টাব্দে পোপ অষ্টম গ্রেগরী তৎকালে প্রচলিত প্রাচীন রোমান জুলিয়ান ক্যালেন্ডার (Julian calendar) সংশোধন করে যীশুখৃস্টের জন্মকে সাল গণনার শুরু ধরে ‘ইংরেজি সাল’ (যা মোটেও ‘ইংরেজি’ নয়; বরং তা খৃস্টধর্মীয়) প্রচলন করেন, যা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার (Gregorian calendar) ও খৃস্টীয়ান ক্যালেন্ডার (Christian calendar) নামে পরিচিত। যীশুখৃস্টকে প্রভু ও উপাস্য হিসেবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে এতে বৎসরকে বলা হয় আন্নো ডোমিনি (anno domini) বা এ. ডি. (AD)। এর অর্থ আমাদের প্রভুর বৎসরে (in the year of our Lord)।

পশ্চিমা বিশ্বে হিজরী সনের তারিখগুলোর পেছনে এএইচ (লাতিন: Anno Hegirae, “হিজরতের বছর”) লেখা হয় যা খ্রিস্টীয় সাল (এডি), কমন এরা (সিই) এবং ইহুদি সাল (এএম) এগুলোর পশ্চিমা সংক্ষিপ্ত রূপের অনুরূপ। মুসলিম দেশগুলোতে কখনো ইংরেজিতে এইচ (H) এর আরবি শব্দ (سَنَة هِجْرِيَّة থেকে, সংক্ষিপ্ত করে ھ) হিসেবে লেখা হয়ে থাকে। ইংরেজিতে হিজরতের আগের বছরকে বিএইচ (“হিজরতের পূর্বে”) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন চাঁদ দেখে এই দুআ পড়তেন- اللهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالْيُمْنِ وَالْإِيمَانِ، وَالسَّلامَةِ وَالْإِسْلامِ، رَبِّي وَرَبُّكَ اللهُ. আয় আল্লাহ, আপনি এই নতুন চাঁদ কে আমাদের জন্য ঈমান ও ইসলাম এবং শান্তি ও বরকতের সঙ্গে উদিত করুন। আমার ও তোমার রব আল্লাহ। (জামে তিরমিযী,; মুসনাদে আহমাদ)।

নতুন মাস ও নতুন বছরের শুরুতে পড়ার দুআ اللّهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالأَمْنِ وَالِإيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالإِسْلَامِ وَجِوَارٍ مِنَ الشَّيطَانِ وَرِضوَانٍ مِنَ الرَّحْمنِ. হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মাঝে এ মাস/বছরের আগমন ঘটান- শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ঈমান ও ইসলামের (উপর অবিচলতার) সাথে; শয়তান থেকে সুরক্ষা ও দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে। (মুজামুস সাহাবাহ)।

ঈমান-ইসলাম, শান্তি-নিরাপত্তা ও রহমত-বরকতের সাথে নতুন বছরটি অতিবাহিত হোক। শয়তানের পথ পরিহার করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির পথ অবলম্বন করে জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলাই হোক আমাদের প্রত্যয় ও সংকল্প।

* অধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট মাওলানা রফিক আহমদ চৌধুরী প্রেসিডেন্ট- খাপ্পাই মসজিদ এন্ড ইসলামিক সেন্টার, দক্ষিণ কোরিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *