ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পুলিশের দমন অভিযান উপেক্ষা করে বৃহস্পতিবারও হাজারো তরুণ বিক্ষোভকারী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই ২০২৬) নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল জন্তর মন্তরে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার রাতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। চলতি সপ্তাহে পুলিশ দ্বিতীয়বারের মতো বিক্ষোভকারীদের দমনে এই অভিযান চালায়।
এর আগে, সোমবারও হাজারো বিক্ষোভকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সংসদের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে সেই বিক্ষোভ ছত্ভঙ্গ করে।
‘ককরোচ’ নামে পরিচিত এই আন্দোলনটি গত এক মাসেরও আগে থেকে শুরু হয়। মেডিকেল কলেজে ভর্তি ও সরকারি চাকরির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ আন্দোলনের সূচনা হলেও পরে এটি শুধু ওই ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধীরে ধীরে এতে পেশাজীবী ও পরিবারের সদস্যরাও যোগ দেন। ফলে আন্দোলনটি সামগ্রিক জনঅসন্তোষে রূপ নেয়।
এদিকে, গতকালের পুলিশি অভিযানের পর আজ সকালে পুলিশের কড়াকড়ি অমান্য করে বিক্ষোভকারীরা আবারও বিক্ষাভস্থলে জড়ো হতে থাকে। এ সময় তারা সড়কে থাকা ব্যারিকেড উপেক্ষা করে বিক্ষোভস্থলে ফিরে আসেন।
অপরদিকে, আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত করতে কর্তৃপক্ষ মধ্য দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখেছে।
প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি ভারতের লাখো তরুণের ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার ও প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
আজ ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি প্রশ্নফাঁস-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, ‘আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই!’
এদিকে, আন্দোলনের সূচনা করা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
আন্দোলনের ব্যঙ্গাত্মক ধারা বজায় রেখে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নিয়ে একটি মিম পোস্ট করেন। সেখানে প্রধানের ধর্মেন্দ্র ছবির সঙ্গে লেখা ছিল, ‘হাই, আমার নাম কিছু না।’
গত মে মাসে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণার মধ্য দিয়ে এই‘ককরোচ’ আন্দোলন শুরু হয়। পরে জুন মাসে দেশের বিভিন্ন শহরে ছোট ছোট বিক্ষোভের মাধ্যমে এটি রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দিয়ে টানা তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অনশন শুরু করলে আন্দোলনটি নতুন গতি পায়। গত সপ্তাহের শেষে পুলিশ ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

ভারতের অনেক তরুণের কাছে এই আন্দোলন ভিন্নমত প্রকাশের অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী কর্মী, বিরোধী রাজনীতিক ও জনসমাবেশের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলনটি দ্রুত বিস্তার করে তরুণ ভারতীয়দের বৃহত্তর জনআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। একইসঙ্গে আন্দোলনটি দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক সময়েরেও প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনে তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বর্তমানে ভারতে সরকারের জবাবদিহিতার অভাব, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এ কারণে এই আন্দোলন সব বয়সী ভারতীয়দের সমর্থন কুড়াচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত। প্রতি বছর লাখো তরুণ দেশটির শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ ও ভালো বেতনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। কয়েক বছর ধরে ভারতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও অনেক তরুণের অভিযোগ, তাতে তাদের ভবিষ্যতের তেমন উন্নতি হয়নি।
দেশটির সবচেয়ে বড় ভোটার গোষ্ঠীগুলোর একটি হলো তাদের তরুণ সমাজ। তাই নির্বাচনের আগে তরুণরা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউএনবি

