নির্বাচন কমিশনে যে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নিয়োগ নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তরায়: মিয়া গোলাম পরওয়ার

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/1272213291532970

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ একটি প্রতিনিধি দল আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এসময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নির্বাচন কমিশনে যে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নিয়োগ নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তরায়। একই সাথে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত। তিনি নির্বাচন কমিশনকে সরকারের প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ বাতিল-সহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু করতে একাধিক দাবি ও প্রস্তাব পেশ করেছেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানে সদ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, এমন কোনো ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারে। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে শামসুল আলমকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই এ নিয়োগের তীব্র প্রতিবাদ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছি।

তিনি বলেন, শামসুল আলম অতীতে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ অবস্থায় তাকে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব আপত্তি ও সাংবিধানিক অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

আজ বুধবার (২৯ জুলাই ২০২৬) বেলা ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের সাথে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি দলের বৈঠকে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে আলোচনায় অংশ নেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট জসিম উদ্দীন সরকার ও এডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির।

বৈঠক শেষে মিয়া গোলাম পরওয়ার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বর্তমান সরকারের আমলে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়েও আমরা নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নিজেদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। এতে নির্বাচনের মাঠে অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তাই আমরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছি।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সুপারিশেরও আমরা বিরোধিতা করেছি। দেশের নাগরিক হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদেরও সংবিধানসম্মত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অধিকার রয়েছে। অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকরা অংশগ্রহণ করেছেন। জাতীয় নির্বাচনেও তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অযোগ্য ঘোষণা করা হলে তা বৈষম্যমূলক হবে কি না। জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আগের বিধান বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কমিশন বিষয়টি পর্যালোচনা করার আশ্বাস দিয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলে সেই দলের পদধারী ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা মনে করি, কোনো ব্যক্তি যদি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বা পদে থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহলে সেটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি দলীয় প্রতীক ছাড়া ও অরাজনৈতিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের কোনো প্রার্থীর পক্ষে সভা, সমাবেশ বা প্রচারণায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক তৎপরতা হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের তফসিল ও তারিখ ঘোষণা করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সরকারের মন্ত্রীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নির্বাচন কখন হবে— এ বিষয়ে বিভিন্ন তারিখ ঘোষণা করছেন। নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়ে রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত থাকতে পারে; কিন্তু নির্বাচনের তফসিল, তারিখ ও সময়সূচি নির্ধারণ এবং ঘোষণা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই এ বিষয়ে কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধান তাকে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। কমিশনের উচিত সরকারের সঙ্গে তার সাংবিধানিক পৃথক সত্তা ও দায়িত্ব বজায় রেখে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করা। তিনি নির্বাচন কমিশনকে আরও সতর্ক ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা নির্ভর করে তারা কতটা নিরপেক্ষভাবে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে তার ওপর।

জামায়াত নেতা বলেন, চট্টগ্রামের একটি নির্বাচনী বিষয়ে আদালতের আদেশের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশ ও শপথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আদালতের আদেশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কীভাবে এত দ্রুত গেজেট প্রকাশ ও শপথের ব্যবস্থা করা হলো, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না, তা নিয়েও আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি।

জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দলীয় সংবিধান অনুযায়ী তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে বহিষ্কার সর্বোচ্চ সাংগঠনিক শাস্তি। ওই ব্যক্তিকে আমরা প্রকাশ্যে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। তিনি এখন আর জামায়াতের কেউ নন। তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না, সেটি সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয়। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের। আমরা এ বিষয়ে তাদের সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দিয়েছি।

সম্প্রতি যশোরে সংঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সত্য ঘটনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর কোনো আপত্তি নেই। তবে কোনো ঘটনা অতিরঞ্জিত করা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারও ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো ঘটনা প্রকাশের আগে বাস্তবতা যাচাই করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে হবে। তিনি এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন আমাদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছে এবং কয়েকটি বিষয় পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী আশা করে, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *