ডিজেল সংকটে বেড়েছে হারভেস্টারের ভাড়া, বিপাকে হাওরাঞ্চলের কৃষক

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সিলেট
শেয়ার করুন

সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও ডিজেল সংকট ও নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। সময়মতো ধান কাটতে না পারার আশঙ্কার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও ভাড়ার হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কৃষকদের দাবি, এক বছর আগেও প্রতি একর জমির ধান কাটতে যেখানে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হতো, বর্তমানে তা বেড়ে সাড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেলেও ধানের বাজারমূল্য সে অনুপাতে না বাড়ায় কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের চার জেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৪৭৩টি কম্বাইন হারভেস্টার সক্রিয় রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা এখনও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের কৃষক সেলিম রেজা চৌধুরী বলেন, এবার ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু কাটার সময় এসে আমরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছি। এক একর জমি কাটতে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে চাইলেও অনেক সময় হারভেস্টার পাওয়া যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, খরচ তত বাড়ছে। বৃষ্টি হলে বা আগাম বন্যা এলে ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় তো আছেই।

তিনি বলেন, ধানের দাম এখনও তেমন বাড়েনি। একদিকে সার, বীজ, সেচ— সবকিছুর খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে কাটাই ও মাড়াইয়ের খরচও দ্বিগুণ। সব মিলিয়ে হিসাব করলে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করেছেন, এখন সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে জানান তিনি।

একই উপজেলার আরেক কৃষক আবদুল করিম বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে অপেক্ষা করছি, কখন হারভেস্টার পাওয়া যাবে। অনেকেই আবার দলবেঁধে মেশিন বুকিং দিচ্ছেন, কিন্তু সংকট এত বেশি যে সময়মতো ধান কাটা যাচ্ছে না। এতে জমিতে পাকা ধান পড়ে থাকার ঝুঁকি বাড়ছে।

তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি এলাকার হারভেস্টার মালিক মঈনুল ইসলাম বলেন, আমাদেরও পরিস্থিতি ভালো নয়। ডিজেল ছাড়া মেশিন চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েও পর্যাপ্ত জ্বালানি মিলছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। আগে যেখানে নির্দিষ্ট দামে ডিজেল পাওয়া যেত, এখন সেখানে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বেড়েছে। সব মিলিয়ে ভাড়া না বাড়িয়ে আমাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব না।

হারভেস্টারচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দিনরাত কাজ করেও চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। অনেক জায়গা থেকে ফোন আসে, কিন্তু সময় মেলানো যায় না। ডিজেল সংকট থাকায় একটানা কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, জেলায় প্রকৃতপক্ষে কোনো জ্বালানি সংকট নেই, তবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে বিতরণে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। ইউএনবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *