কুরআন ধারণকারীরা একদিন সমাজের নেতৃত্ব দেবেন : গ্র্যান্ড ফাইনালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

পবিত্র কুরআন শুধু মুখস্থ করাই নয়, বরং এর শিক্ষা ও আদর্শ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ গঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, যাঁরা পবিত্র কুরআন বুকে ধারণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের সমাজে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। হাফেজদের মেহরাবের পাশাপাশি সমাজের নেতৃত্বের আসনেও দেখতে চান তিনি।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর ২০২৬) বিকেল ৩টায় রাজধানীর মিরপুরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে নগর উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত পাঁচ মাসব্যাপী ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ও নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

গত ১৬ জুলাই শুরু হওয়া প্রতিযোগিতায় ঢাকার ৮০০টি মাদরাসার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। পবিত্র কুরআনের ১০, ২০ ও ৩০ পারা- এই তিনটি বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে মোট ২৪৩ জন বিজয়ীকে নির্বাচিত করে পুরস্কৃত করা হয়। তাঁদের মধ্যে তিনটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী নয়জনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বিজয়ীদের জন্য রয়েছে ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল, অর্ধকোটি টাকা নগদ অর্থসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পুরস্কার। কুরআন হিফজে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা, হাফেজদের প্রতিভা বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে শুদ্ধ তিলাওয়াত ও কুরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই ছিল এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ও তুলে ধরা হয়।

নগর উন্নয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম এবং হাফেজ খালিদ সাইফুল্লাহ বকসির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ যায়নুল আবেদিন, হুফফাতুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন এমপি, বিশিষ্ট আলেম মুফতি আলী হাসান উসামা, ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের আয়োজন বিরল। এত বড় পরিসরে কুরআন প্রতিযোগিতা আয়োজন ও সফলভাবে সম্পন্ন করায় নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন-সহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। ছোটখাটো মতভিন্নতা ও বিভেদ দূরে রেখে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আমীরে জামায়াত।

প্রতিযোগিতার ১০ পারা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিশু রিদওয়ান বিন আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বিশেষ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “তার বাবা, মা ও উস্তাদকে আমার পক্ষ থেকে ওমরাহ করানো হবে, ইনশাআল্লাহ।” এ সময় ঢাকা মহানগরী উত্তরের মানুষের কল্যাণে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের প্রচেষ্টা কবুল করার এবং তাঁকে যথাযথ তাওফিক দানের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন সভাপতির বক্তব্যে বলেন, এ আয়োজন শুধু পুরস্কার দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনের আলোয় সমাজকে আলোকিত করা এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, হাফেজে কুরআনরা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ধারণ করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করবেন- এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। মাদরাসার নেসাব বা পরিচয়ে ভিন্নতা থাকতে পারে, মতামতের ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু পবিত্র কুরআনের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ।

মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন আরও বলেন, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কুরআনের আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। পাঁচ মাসব্যাপী এ আয়োজন সফল করতে যাঁরা শ্রম ও সময় দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তাঁদের প্রচেষ্টা মহান আল্লাহ কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দিন- এ দোয়াও করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, এ আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তিনি আনন্দিত। পবিত্র আল-কুরআন সমগ্র মুসলিম জাতির জীবনবিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার হাফেজে কুরআন তৈরি হচ্ছেন।

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, কুরআনের হাফেজদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাসব্যাপী প্রতিযোগিতার আয়োজন একটি স্মরণীয় ঘটনা। এ উদ্যোগ কুরআনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তিনি বলেন, কিয়ামত পর্যন্ত কেউ আল-কুরআন মুছে ফেলতে পারবে না। এটি মহান আল্লাহর বাণী এবং তিনিই এর সংরক্ষক। কুরআনের শিক্ষার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য হাফেজদের যোগ্য ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ভবিষ্যতে আলেমরা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন- এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে নুরুল ইসলাম বুলবুল এ আয়োজনের বার্তা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।

নগর উন্নয়ন ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মূসা বলেন, এ কুরআনি সমাবেশ থেকে তাঁরা বাংলাদেশকে কুরআনের আলোয় গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনের জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ অতিথি মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ আয়োজন যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশে হাফেজ ও আলেমদের মর্যাদা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি আরও বলেন, এ আয়োজনের প্রকৃত সার্থকতা আসবে তখনই, যখন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় মসজিদের নেতৃত্বসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অগ্রসর হাফেজ ও আলেমরা দায়িত্ব পালন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ও হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক এ আয়োজনের জন্য নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য দোয়া করেন।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ যায়নুল আবেদিন বলেন, যাঁরা কুরআন জানেন, কুরআনের বিধান মানেন এবং এর হুকুম-আহকাম অনুসরণ করেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। একই সঙ্গে কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শের আলোয় সমাজকে আলোকিত করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতা কুরআন হিফজের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করেছে। আয়োজকদের আশা, এ উদ্যোগের মাধ্যমে কুরআনের আলোয় আলোকিত, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে হাফেজে কুরআনরা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *