কচুরিপানার আগ্রাসনে নান্দনিকতা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাল শাপলার বিল। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা ডিবির হাওরের একাংশে অবস্থিত এই বিলটির প্রাণ–প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় অবিলম্বে সমন্বিত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনের নেতারা।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং সিলেট কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি প্রফেসর ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ওই শাপলা বিল ও জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ পরিদর্শন করে।

পরিদর্শক দলে আরও ছিলেন জার্মানপ্রবাসী লেখক ও ঐতিহ্য গবেষক সাকি চৌধুরী, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও ধরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, সংগঠনটির সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট গোলাম সোবাহান চৌধুরী।
পরিদর্শনকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জৈন্তিয়া ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ান করিম সাব্বির এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন মো. হানিফ প্রতিনিধি দলটিকে স্থানীয় উদ্যোগে বাস্তবায়িত ‘তরুছায়া প্রকল্প’ সম্পর্কে অবহিত করেন। এই প্রকল্পের আওতায় বিলের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ১৪ হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।
প্রায় দেড় ঘণ্টা শাপলার বিল এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় পরিদর্শক দলের সদস্যরা বলেন, কচুরিপানা যেভাবে বিলে বিস্তার লাভ করছে, তাতে অচিরেই শাপলার বিলের সার্বিক সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে।
এ সময় হাওর-সংলগ্ন সড়কের পাশজুড়ে রোপণ করা কিছু গাছ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মত দেন তারা।
মতবিনিময়কালে বিজয় সিংহের সমাধিসৌধ সংরক্ষণে প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়। একইসঙ্গে শাপলা বিলের প্রাণ–প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে কচুরিপানাসহ অন্যান্য জীবগত ও মানবসৃষ্ট আগ্রাসন প্রতিরোধে নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলা হয়। পরিবেশগত ভারসাম্য বিবেচনায় হিজল, করচ, তাল, সুপারি ছাড়াও দেশীয় বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ রোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশবিদরা।
২০১০ সালের দিকে প্রথম ডিবির হাওরের একাংশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে ভোরের আলোয় ফুটে ওঠা লাল শাপলা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে হাওরের জলজ পরিবেশে শাপলার বিস্তার বাড়লে ২০১৬ সালের দিকে বিষয়টি স্থানীয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ‘লাল শাপলার বিলের’ সৌন্দর্যের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশ–বিদেশ থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে।

জৈন্তা–খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এ শাপলা বিলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সূর্য ওঠার পর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ করা যায়। শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনে পর্যটকদের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে পর্যটকদের জন্য এখানে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সুযোগ–সুবিধা গড়ে ওঠেনি।
পরিদর্শক দলের নেতারা মনে করেন, লাল শাপলার বিলকে ঘিরে কেবল একটি প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রই নয়, বরং ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনশিল্পও বিকশিত হতে পারে। কারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই স্থান জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহের স্মৃতি বহন করছে।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৮৭ সালের দিকে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয় সিংহকে হরফকাটা ও ডিবির বিলের মধ্যবর্তী হাওরে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। সেই স্থানেই পরে তার সমাধিসৌধ নির্মিত হয়।
সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট এবং ধরা’র প্রতিনিধি দল দুই শতাধিক বছরের পুরোনো এই সমাধিসৌধ অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে মর্মাহত হন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা অবিলম্বে সমাধিসৌধটি সংরক্ষণের দাবি জানান। পাশাপাশি সিলেট ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে রাজা বিজয় সিংহের মর্মান্তিক প্রয়াণ এবং সংশ্লিষ্ট অসম প্রেমের ইতিহাস সংক্ষেপে তুলে ধরতে অচিরেই একটি তথ্যফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান।
পরিদর্শক দল শাপলার বিল ও এর চারপাশ পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও ময়লা–আবর্জনামুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে বলেন, প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যগত সম্পদ রক্ষায় সবার সচেতন ভূমিকা অপরিহার্য। ইউএনবি

