যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চলতি সপ্তাহেই ইরানের সাথে বৈঠকে বসার আশা করছে। একই সাথে ওয়াশিংটন সেখানেই ১৫-দফা চুক্তির বিষয়ে জবাব পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, “ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এই হামলা চালিয়েছে এবং এই আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কূটনীতির জন্য বাড়ানো সময়সীমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তিনি আরও যোগ করেন, ইরান এর জন্য “কঠিন মূল্য আদায় করবে।”
অপরদিকে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় অন্তত ১২ জন আমেরিকান সেনা সদস্য আহত হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তত দুজন সৈন্য ‘খুব গুরুতরভাবে আহত’ হয়েছেন এবং হামলার সময় তারা ঘাঁটির একটি ভবনের ভেতরে ছিলেন। তবে এর আগে বিবিসির মিডিয়া পার্টনার সিবিএস নিউজ একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে ১০ জন আহতের তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান সফলভাবে এগোচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র “ইরানকে চূর্ণ করছে”।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দেশটির বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেছেন, ইরানের দুটি বড় ইস্পাত কারখানা, একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বেসামরিক পরমাণু স্থাপনায় হামলা হয়েছে এবং তার দেশ এর যথাযথ জবাব দেবে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনা কোন পর্যায়ে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আগেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে যে এই সপ্তাহেই ইরানের সঙ্গে তাদের বৈঠক হতে পারে। মায়ামিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কথা বলছে। “আমরা মনে করি এই সপ্তাহে বৈঠক হবে, আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে আশাবাদী,” বলেছেন তিনি।
তিনি বলেন, “জাহাজ চলাচল করছে, এটা খুবই ভালো লক্ষণ,” স্টিভ উইটকফ আরও বলেন, ট্রাম্প একটি শান্তি চুক্তি চান। “আমাদের কাছে ১৫ দফার একটি চুক্তি রয়েছে, যা ইরান কিছুদিন ধরে বিবেচনা করছে। আমরা তাদের কাছ থেকে একটি জবাব আশা করছি।”
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলনের বাইরে সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলো স্পষ্ট এবং “আমরা খুবই আত্মবিশ্বাসী যে খুব শিগগিরই আমরা সেগুলো অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারবো।” তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল সেনা ছাড়াই তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।
আর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান কতদিন চলবে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা মাস নয়, সপ্তাহের কথা বলছি।”
সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কর্তৃক পরিচালিত এফআইআই ইভেন্টটি এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইরান দেশটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে, এবং পুরো অঞ্চলই যুদ্ধে বিপর্যস্ত।
ট্রাম্প সৌদি আরবের সমর্থনের প্রশংসা করেন, একইসঙ্গে নেটো দেশগুলোর সমালোচনা করেন—তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক অভিযানে তারা পর্যাপ্ত সমর্থন দেয়নি। তিনি বলেন, “নেটোকে নিয়ে আমি খুব হতাশ, তবে মধ্যপ্রাচ্যের আমাদের মিত্রদের নিয়ে আমি হতাশ হইনি”।
ইরান বলছে কূটনীতি ও হামলা সাংঘর্ষিক
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরায়েল ইরানের দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা, একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বেসামরিক পারমাণবিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “ইসরায়েল দাবি করছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এই হামলা চালিয়েছে এবং এই আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কূটনীতির জন্য বাড়ানো সময়সীমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তিনি আরও যোগ করেন, ইরান এর জন্য “কঠিন মূল্য আদায় করবে।”
এদিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত আরাক পানিশোধন কেন্দ্র হামলা করেছে। বিবিসি ভেরিফাই এর যাচাই করা ছবিতে দেখা গেছে, ওই স্থাপনার রিয়্যাক্টরের কাছাকাছি আগুনের গোলা ও ধোঁয়া উঠছে।
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে আরাক স্থাপনাটি আজ দু’বার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে তারা জানিয়েছে, এতে কোনো হতাহত বা তেজস্ক্রিয় দূষণের ঘটনা ঘটেনি।
কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে ইরান ও রাশিয়ার আলোচনা
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে যে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ইরান সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই মন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অযৌক্তিক আগ্রাসনের ফলে ইরানে বিস্ফোরিত হয়েছে।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তারা এই সংঘাতকে “আন্তর্জাতিক আইনসম্মত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং অঞ্চলের সব দেশের বৈধ স্বার্থ বিবেচনায় রাখার” বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, লাভরভ ইরানে রাশিয়ার পাঠানো সর্বশেষ মানবিক সহায়তার চালানের বিস্তারিতও তুলে ধরেন।
রাশিয়া ও ইরান একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যাতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—তবে এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।
সৌদি আরবে মার্কিন সেনা আহত
যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সৈন্য সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আহত হয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম জানিয়েছে। এই হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এই হামলায় অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও বেশ কয়েকটি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বেশ কয়েকটি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সূত্রগুলো নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত পেন্টাগন এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড গণমাধ্যমগুলোর মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। বিবিসি

