সাঈদ চৌধুরী :
“এ ম্যান অব অ্যাকশন: এ লাইফ সার্ভিং দ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি” কেবল একটি জীবনী গ্রন্থ নয়, যেন অর্ধশতাব্দীর গল্প। বিশিষ্ট সংগঠক, নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী ও সফল ব্যবসায়ী আহমদ উস সামাদ চৌধুরী জেপির জীবনপথ যেখানে ধরা দিয়েছে সময়ের স্রোত, সংগ্রাম আর সৃষ্টির আলোয়। ১৯৭২ সালে ব্রিটেনে তার আগমন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির ভিত গড়ে তোলার যে নিরলস যাত্রা- বইটি সেই পথচলার এক উজ্জ্বল দলিল।

আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর ‘আত্মকথা’ লিখেছেন তার পুত্র তাহমিদ চৌধুরী। পিতার জীবনের গল্প, ব্যক্তিগত অনুভূতি ও স্মৃতির বয়ান জেনে নিয়ে ইংরেজি ভাষায় সাজিয়েছেন তাহমিদ। গ্রন্থটিকে আবেগঘন ও ছন্দময় ভঙ্গিতে রূপ দিয়ে স্বার্থক পুত্র হিসেবে আমাদের কমিউনিটিতে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন এই লেখক।
গ্রন্থের ভাষা যেমন মসৃণ, তেমনি গভীর হয়েছে জীবনের কথা এবং তার ভাব আর চরিত্র। একজন কমিউনিটি নেতার মধ্য দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের সংগ্রামী জীবনের গল্প।
“এ ম্যান অব অ্যাকশন: এ লাইফ সার্ভিং দ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি” গ্রন্থটি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়েছে। এটি যেন একজন মানুষের কর্মযজ্ঞ থেকে এক সম্প্রদায়ের জাগরণের ইতিহাস। আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর জীবনগাথা এখানে ধরা দিয়েছে সময়, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য সিম্ফনিতে।
আহমদ উস সামাদ চৌধুরী আশাবাদী মানুষ। তিনি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ইতিবাচক দিক খুঁজে পান এবং জীবনের প্রতিটা বাধাকে পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস রাখেন। হতাশ না হয়ে সমস্যা সমাধানের পথ এবং নতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করেন। আর এটি তার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ইতিবাচক চিন্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনাই তার সফলতার চাবিকাটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
“এ ম্যান অব অ্যাকশন: এ লাইফ সার্ভিং দ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি” গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর বহুমাত্রিক সেবাধর্ম বর্ণনা করে বলেন গণমাধ্যম, ব্যবসা, শিক্ষা ও দাতব্যক্ষেত্রে তার অবদান যেন সমাজের প্রতি এক নীরব অঙ্গীকার, যা দায়িত্ব ও মানবিকতার শাশ্বত ভাষায় হয়েছে উচ্চারিত।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে চার বারের এক্সিকিউটিভ মেয়র লুৎফুর রহমান উপস্থিত অতিথিদের নিয়ে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন। তিনি আহমদ উস সামাদ চৌধুরীকে ‘ম্যান অফ কারেজ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রবল আত্মবিশ্বাস, ন্যায়পরায়ণতা এবং কারো বিপদের মুখে পিছপা না হওয়ার মানসিকতা প্রশংসার দাবি রাখে।

সভাপতির বক্তব্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসে একমাত্র বাংলাদেশী সদস্য ব্যারোনেস মঞ্জিলা পলা উদ্দিন বলেন, আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর জীবন স্মৃতির বয়ান তার পুত্র তাহমিদ চৌধুরী দারুণভাবে লিখেছেন।
বিভিন্ন সময়ের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে ব্যারোনেস উদ্দিন তার কর্মময় জীবনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, গত ৫০ বছরে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য আহমদ উস সামাদ চৌধুরী’র অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্রিটিশ সরকারের সাবেক এমপি কিথ বেস্ট ২০০২ সালে সিলেটে প্রতিষ্ঠিত ‘ইমিগ্রেশন এডাভাইজরি সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠায় আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর অবদান গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। যে প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে ব্রিটেনে আসা ইমিগ্রান্টদের বহুবিধ হয়রানি থেকে রক্ষা-সহ বিনামূল্যে সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি মি. চৌধুরীর সাথে সিলেট সফরের মধুময় স্মৃতিও রোমন্থন করেন।

জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাহী ফেরদৌস জলিল ২০০৭ সালে তার প্রতিষ্ঠিত ‘চ্যানেল এস’ টিভিতে আহমদ উস সামাদ চৌধুরীকে যুক্ত করে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব প্রদান করেন। তখন থেকে একসাথে পথচলার উনিশ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে স্মৃতিচারণ করে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মাহী জলিল বললেন, আহমদ উস সামাদ চৌধুরী বেশ আত্মমর্যাদা নিয়ে চলেন। তার এই আত্মসম্মানবোধ থেকে সৃষ্টি হয়েছে নিজের প্রতি সম্মান, আত্মবিশ্বাস এবং নীতি-নৈতিকতার প্রতি অবিচল থাকার এক অনন্য মানবিক গুণ। এটি মানুষকে অন্যায়, অসম্মান ও ব্যক্তিত্বহীনতার পথ থেকে দূরে রাখে।
ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিবিসিসিআই) সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক শাহাগীর বখত ফারুক বিবিসিসিআই ডাইরেক্টর হিসেবে আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর কর্ম তৎপরতা তুলে ধরেন।
বিবিসিসিআইর সাবেক প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান রেনু বলেন, বহুমুখি সেবা কর্মে তার অবদান সবার জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও অনুকরণীয় অনুপ্রেরণা।

বাবার আদর্শ ও বহুমুখী কর্মজীবন গ্রন্থবদ্ধ করা প্রসঙ্গে আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর পুত্র তাহমিদ চৌধুরী সূচনা বক্তব্যে বলেন, পিতার জীবনের বহুকর্ম আমাকে গ্রন্থটি লিখতে প্রবল শক্তি ও আগ্রহ যোগায়। যে জীবন-সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা সন্তান হিসেবে আমার কাছে এমনকি আমাদের প্রজন্মের অনেকের জন্য শিক্ষণীয়।

আত্বজীবনী সম্পর্কে আহমদ উস সামাদ চৌধুরী জেপি জানান, কর্মজীবনের সূচনাকালে ব্যবসা, সমাজসেবা ও মিডিয়ার প্রতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করে কাজ করেছেন। পরিবার ও সমাজের জন্য ভালো কিছু করার প্রত্যয়ে সারা জীবন সচেষ্ট ছিলেন। প্রবাসীদের কল্যাণে বিভিন্নভাবে সক্রিয় রয়েছেন। এক্ষেত্রে বহুমুখি ব্যবসার পাশাপশি ব্রিস্টল বাংলাদেশ সেন্টার ও শাহজালাল মসজিদ নির্মাণ এবং দেশের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জে স্কুল-কলেজ ও মসজিদ-মাদ্রাসা ইত্যাদির কথা আত্মতৃপ্তির সাথে উল্লেখ করেন।
নিজের অন্তর্নিহিত ভাবনা ও নিরলস প্রচেষ্টাই মানুষকে কাঙ্খিত স্তরে পৌঁছাতে সাহায্য করে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) লন্ডন এন্টারপ্রাইজ একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন চ্যানেল এস টেলিভিশনের হেড অব প্রোগ্রাম ফারহান মাসুদ খান এবং সানরাইজ স্পেকট্রাম বাংলা রেডিওর পরিচালক মিসবাহ জামাল। অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন বৃষ্টল জামে মসজিদের ইমাম আজিজুর রহমান খান।
বইটির সম্পাদক জনপ্রিয় সাংবাদিক তৌহিদ শাকিল, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের ফাউন্ডার সেক্রেটারি সাংবাদিক-কলামিস্ট নজরুল ইসলাম বাসন, লেখক ও গবেষক ফারুক আহমদ, টিভি সংবাদ পাঠক ড. জাকি রিজওয়ানা আনোয়ার, বাংলাদেশ ফিমেইল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা জামিল চৌধুরী, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী, দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক সাঈদ চৌধুরী, গ্লোবাল জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুহিবুর রহমান মুহিব, ব্যারিস্টার নাজির আহমদ, ডা. আলাউদ্দিন আহমদ প্রমুখ আত্মজীবনী থেকে আহমদ উস সামাদ চৌধুরীর বর্ণাঢ্য জীবনের ঘটনাবহুল ও বৈচিত্র্যময় বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মুকিম আহমদ, বিবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি বশির আহমদ বিইএম, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) সভাপতি ওলি খান এমবিই, বিসিএ’র সাবেক সভাপতি বজলুর রশীদ এমবিই, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি বেলাল আহমদ, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ব্রিস্টল-বাথ অ্যান্ড ওয়েস্ট’র সভাপতি আইনুল ইসলাম, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্ট্র্যাটেজিক এডভাইজার সাংবাদিক মোহাম্মদ জুবায়ের, গ্রেটার সিলেট কাউন্সিলের সভাপতি সালেহ আহমদ, সাবেক মেয়র কাউন্সিলর আতিকুল হক, সাবেক মেয়র কাউন্সিলর পারভেজ আহমদ, কার্ডিওলজিস্ট ডা. মনজুর শওকত, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. হাসান শহীদ, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি আকরাম হুসাইন, প্রেসক্লাবের ট্রেজারার আব্দুল হান্নান, ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের ড. এএসএম আশরাফ মাহমুদ-সহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

অনুষ্ঠানের বিশেষ তত্বাবধানে ছিলেন প্রকাশনা সাব কমিটির সদস্য মুহাম্মদ জুবায়ের, মিছবাহ জামাল, তারেক চৌধুরী, তৌহিদ শাকিল, আকরামুল হোসেন, ফারুক আহমদ, শাহ ইউসুফ, আব্দুল মুনিম জাহেদী কারল, মোহাম্মদ অহিদ উদ্দিন, রহমত আলি, মুহিব উদ্দিন চৌধুরী, রুপি আমিন, পলি রহমান, হাফসা ইসলাম, এম আলাউদ্দিন, রেজাউল করিম মৃধা, মুহি মিকদাদ প্রমুখ।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

