জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের গণরায় আদায়ে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, বিএনপি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করলেও জনগণের অধিকার আদায়ে জামায়াত তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। কোনো প্রলোভন কিংবা চোখ রাঙানিতে বিরোধী দলকে দমিয়ে রাখা যাবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর ২০২৬) বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি এবং এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ অন্য নেতারা।

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, বিএনপি জনগণকে অবমূল্যায়ন করছে এবং নিজেদেরই কেবল জ্ঞানী মনে করছে। তাঁর দাবি, একের পর এক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার পর এবার সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ওপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে যোগ্যদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার দাবিতেই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিল। অথচ এখন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পিএসসির সদস্যদের পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পিএসসিকে কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, চাকরির গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেত্রকে দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো এলাকার মানুষ একটি দলকে ভোট না দিলে সেই এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হবে না— এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
রংপুরে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো এলাকার মানুষ ভিন্ন দলকে ভোট দিলে তারা কি উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হবে? তাঁর মতে, রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়া অর্থ দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদানে গঠিত একটি সম্মিলিত তহবিল। তাই উন্নয়ন বরাদ্দকে কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব অর্থ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ধরনের বৈষম্য দূর করতেই ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগের স্বৈরাচারী শাসনের পথেই বর্তমান সরকার এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। জনগণ তাদের যে আসনগুলোতে নির্বাচিত করেছে, সেই প্রতিনিধিত্ব কাজে লাগিয়ে ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করবেন বিরোধী দলের ৮৯ জন সংসদ সদস্য।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় আদায়ের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তাঁদের আন্দোলনের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষা নয়; বরং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং একটি মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, দেশকে ভালোবাসার অর্থ সহিংসতা কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি করা নয়। ২০২৪ সালের আন্দোলন দেখিয়েছে, দেশপ্রেম ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিএনপির পতন তাঁরা চাননি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা বিএনপির সফলতা চেয়েছিলেন, কারণ একটি রাজনৈতিক সরকারের সফলতার সঙ্গে দেশের সফলতাও জড়িত। তবে জনগণের স্বার্থে বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণে বর্তমান সরকার ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, দেশের স্বার্থের আগে নিজেদের ও পরিবারের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কোনো সিন্ডিকেটের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়া হবে না বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
জামায়াত নেতা বলেন, তরুণ প্রজন্ম জেগে উঠেছে। পূর্ণ মুক্তি ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা থেমে থাকবে না। যুবসমাজকে সঙ্গে নিয়ে আরও শক্তিশালীভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি আবারও ঘোষণা দেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা অন্য কোনো দলের অবস্থান পরিবর্তন হলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের গণরায় আদায়ের প্রশ্নে তাঁরা আপস করবেন না।

