ব্রিটেনকে আরও শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও আশাবাদী দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার রূপরেখা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, শিল্প পুনর্গঠন, গুরুত্বপূর্ণ সেবায় জননিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল্যবোধভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি- সবকিছুকেই তাঁর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভিডিও নিউজ লিংক: https://www.facebook.com/reel/1584193123721589
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরকারের অবস্থান শুধু নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নয়। সাম্প্রতিক ইসরাইল-ফিলিস্তিন নীতিতেও তার একটি মূল্যবোধভিত্তিক দিক স্পষ্ট হয়েছে।
৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য-সহ ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের বসতি সম্প্রসারণ দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এরপর যুক্তরাজ্য ইসরাইলি বসতি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বসতি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম এই অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে বলেছেন- দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে শুধু বক্তব্য দিলেই হবে না, সেই সম্ভাবনা রক্ষায় বাস্তব পদক্ষেপও নিতে হবে। তিনি পশ্চিম তীরের বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতা এবং গাজায় মানবিক সংকট মোকাবিলায় আরও সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এসব ব্যবস্থা ইসরাইলি জনগণ বা ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়; লক্ষ্য হচ্ছে ইসরাইল সরকারের নির্দিষ্ট নীতি ও বসতি সম্প্রসারণ কার্যক্রম।
এর আগে ১ সেপ্টেম্বর হাউস অব কমন্সে দেওয়া প্রথম বড় নীতিগত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রিটেনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দুর্বলতার পেছনে অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, শিল্পখাতের অবক্ষয়, বেসরকারিকরণ, কৃচ্ছসাধন এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী স্থবিরতা ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, পরিবর্তনের জন্য শুধু সরকারের নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি বড় অংশ অঞ্চল ও স্থানীয় জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে।
সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বিদ্যুৎ বিলের ওপর ভ্যাট কমানো, সোশ্যাল ক্লাব ও লাইভ মিউজিক ভেন্যুর ব্যবসায়িক হার কমানো এবং ২০২৭ সালজুড়ে দুই পাউন্ড বাসভাড়া সীমা পুনর্বহালের মতো পদক্ষেপকে এর প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান বাড়াতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের কথা বলেছেন।
এই পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ইংল্যান্ডের যেসব অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত ডিভল্যুশন বা স্থানীয় ক্ষমতা নেই, তাদের সঙ্গে কাজ করবে ডাউনিং স্ট্রিটের নতুন নাম্বার টেন নর্থ (Number 10 North)। স্থানীয় সরকারকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ভাষায়, এর লক্ষ্য হলো ব্রিটেনের প্রতিটি অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা।
শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, গুরুত্বপূর্ণ জনসেবায় জনস্বার্থ ও জননিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবহন, পানি, জ্বালানি ও আবাসনের মতো খাতকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। লিভারপুল সিটি অঞ্চলে (Liverpool City Region) বসবাসে পুনরায় জননিয়ন্ত্রণে আসাকে তিনি এই নতুন নীতির একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বছরের শেষ দিকে প্রকাশিতব্য সরকারের ১০ বছরের পরিকল্পনায় পানি ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় আরও শক্তিশালী জননিয়ন্ত্রণের রূপরেখা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পুনঃশিল্পায়নকে (Reindustrialisation)- বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। স্থানীয় শিল্প কৌশল, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের সমন্বয় এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর লক্ষ্য- লন্ডনকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে নিজস্ব অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়া।
প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তাকেও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ইউক্রেনকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের অবস্থানের পরিবর্তন হবে না এবং দেশের প্রতিরক্ষা তাঁর সরকারের প্রথম অগ্রাধিকারগুলোর একটি। সীমান্ত নিরাপত্তা ও ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া ঠেকাতেও ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ফলে প্রধানমন্ত্রীর সামগ্রিক রাজনৈতিক দর্শনে দুটি বিষয় পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে- দেশের ভেতরে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ জনগণ ও অঞ্চলের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া, আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিটেনের মূল্যবোধ ও নীতিগত অবস্থানকে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকাশ করা।
বার্নহ্যামের পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় বার্তা হলো- ব্রিটেনকে শুধু ওয়েস্টমিনস্টার (Westminster)-কেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং অঞ্চল, স্থানীয় সরকার, ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় ও জনগণের সম্মিলিত শক্তির ওপর দাঁড় করানো। তাঁর ভাষায়, আগামী দশককে আগের দশকের চেয়ে ভালো করতে হলে প্রতিটি অঞ্চলে ক্ষমতা, বিনিয়োগ ও সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অর্থনীতি পুনর্গঠন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিল্প ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, জনসেবায় জননিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ও মূল্যবোধভিত্তিক অবস্থান- এই ছয়টি স্তম্ভের ওপরই গড়ে উঠছে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সরকারের নতুন ব্রিটেনের পরিকল্পনা।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সারকথা- শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিতেই পরিবর্তন আনা; শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এভাবেই আগামী দশককে আরও ভালো করার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বৈদেশিক নীতিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
* সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

