এমজেএইচ জামিল সিলেট থেকে :
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেশ ছেড়ে পালানোর নিরাপদ রুট ছিল সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত। দালালের মাধ্যমে পালাতে গিয়ে বিভিন্ন সীমান্তে অনেকে যেমন আটক হয়েছেন, আবার পালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনাও ঘটেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছরের মাথায় এবার দেশে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে সিলেট সীমান্তকেই বেছে নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, সিলেট সীমান্তবর্তী ভারতের শিলংয়ে জড়ো হচ্ছেন শতাধিক পলাতক নেতাকর্মী।
আগামী ২৩ জুন ঘিরে সিলেট নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শতাধিক স্পটে ঝটিকা মিছিলের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে শিলং থেকে। এটা সমন্বয় করছেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান।
ট্রায়াল হিসেবে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে সিলেট নগরীর নবাব রোড এলাকায় পুলিশের সামনে মিছিল বের করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খানের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মিছিলে দলের প্রায় ৫০ জন নেতাকর্মী অংশ নেন। এই সময় স্থানীয় জনতা মিছিল থেকে আটক করে ৪ জনকে পুলিশে সোপর্দ করেন।
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এসএমপির কোতোয়ালী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ২৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৪০/৪৫ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়।
শুক্রবার পর্যন্ত মামলার ৬ জন এজাহারভুক্ত আসামীকে পুলিশ আটক করেছে। তারা সকলেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সিলেট নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীরা। মিছিল নির্বিঘ্নে করতে পুলিশ প্রশাসনে আওয়ামী সমর্থিত ও সুবিধাভোগি কতিপয় কর্মকর্তার সাথে দেশে থাকা দলটির আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে যোগাযোগ করছেন দলটির নেতারা। এক্ষেত্রে কতিপয় পুলিশের গ্রিন সিগন্যাল রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এডভোকেট নাসির উদ্দিন খান সীমান্ত হয়ে চোরাইপথে দেশে ফিরেছেন। সীমান্তবর্তী উপজেলার একটি গ্রামে অবস্থান করছেন। যেদিন তিনি দেশে ফিরেন সেদিনই প্রশাসনের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে নগরীতে মিছিলের আয়োজন করান তিনি। যদিও এই সূত্রের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের কাছেও এই ধরনের কোন তথ্য নেই বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা নাসির এখনো দেশে ফিরেননি। তবে তিনি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোন কারণে ২৩ জুনের মধ্যে ফিরতে না পারলে আগস্টের আগেই দেশের ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। দেশে ফিরে কয়েক শতাধিক নেতাকর্মীকে নিয়ে রাজপথের প্রকাশ্য কর্মসুচী পালন করে স্বেচ্ছায় কারাবরণের প্রস্তুতিও রয়েছে তাঁর। এটি বাস্তবায়ন করতে সিলেটের আদালত প্রাঙ্গনে কর্মরত দলটির বেশ কয়েকজন আইনজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বর্তমানে অ্যাডভোকেট নাসির সিলেট সীমান্তবর্তী ভারতের শিলংয়ের জুয়াই এলাকার একটি বাড়ীতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই দলীয় নেতাকর্মী, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও দলীয় সুবিধাভোগী সাংবাদিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন তিনি।
বিভিন্ন উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে কর্মসুচী বাস্তবায়নে নিয়মিত মনিটরিং করছেন। যোগাযোগ হচ্ছে ওয়াটসআপ-টেলিগ্রামে। চলতি মাসের শুরুতে ঐ বাড়ীতে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সিলেটের কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা বিভিন্ন ভিসায় ভারতে যান বলে সুত্রটি জানিয়েছে।
এদিকে গত মাসে দক্ষিণ সুরমায় সাবেক এক কাউন্সিলারের বাড়ীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। খবর পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা পালিয়ে যায়। এছাড়া সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জড়ো হওয়ার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। সূত্র মতে, গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে একাধিক বৈঠক পণ্ড হয়েছে বলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
জানা গেছে, ফেইসবুক পেইজ ভয়েস অব বিএসএল থেকে চলছে প্রচারণা। পেইজটি থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, সাবেক সিলেট সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নাজমুল ইসলামসহ দলীয় নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য কোটেশন আকারে ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় দেশে থাকা দলটির নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন নিস্ক্রিয় থাকলেও সম্প্রতি তাদের সক্রিয় হতে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসুচী চলাকালে সিলেট নগরীতে ছাত্র-জনতার উপর প্রকাশ্য অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক বার প্রকাশিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২ বছর পূর্ণ হতে চললেও প্রশাসন আজ অবধি সেইসব অবৈধ অস্ত্রের একটিও উদ্ধার করতে পারেনি।
একজন চিহ্নিত অস্ত্রধারী শুটার আনসারকে র্যাব গ্রেফতার করলেও তার ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। অথচ জুলাইয়ে শুটার আনসার প্রকাশ্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার উপর গুলী ছুড়ে। অস্ত্র হাতে তার একাধিক ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠনের ঝটিকা মিছিলে সেই অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। জানা গেছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার উপর হামলার মামলায় আটক অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের জামিনে বেরিয়ে ফের রাজপথে সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এমনকি সিলেটে মিছিল থেকে আটক এক ছাত্রলীগ নেতা জামিনে বের হয়ে ঢাকায় গিয়ে মিছিল করার সময় ফের আটকের ঘটনা ঘটেছে।
ফলে দিন দিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলে কর্মীদের উপস্থিতি বাড়ছে। এছাড়া বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় বেকার যুবকদের টাকার লোভ দেখিয়ে মিছিলে নেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এক্ষেত্রে জুয়াড়ি ও মাদকসেবীদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাজনীতি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। গণহত্যার দায়ে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের যে কোন তৎপরতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বিএনপি নেতাকর্মীদেরকেও সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পতিত লীগের মিছিলে প্রশাসনের কোন যোগাযোগ আছে কি না সেটার তদন্ত করে দেখা উচিত।
এব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত (সিটিএসবি) মো. আফজাল হোসেন বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের যে কোন তৎপরতা রুখে দিতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। চলতি মাসে দুয়েকটি জায়গার তাদের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেলে ডিবি পুলিশ তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে তাদের বৈঠক পণ্ড হয়ে যায়। এছাড়া নগরীতে নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিলের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
২৩ জুন ঘিরে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে ডিবি পুলিশ কাজ করছে। তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোঃ যাবের সাদেক বলেন, সীমান্ত এলাকায় কে আসছে এরকম গুঞ্জন আমরাও শুনি। তবে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। এরপরও সীমান্ত এলাকার জন্য বিজিবি রয়েছে। কেউ যদি অবৈধভাবে দেশে আসেন তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সিলেট জেলার প্রতিটি উপজেলায় পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের যে কোন ধরনের অপতৎরতা বন্ধে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।
সিলেট ব্যাটালিয়ান ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ নাজমুল হক বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও এরকম কিছু ঘটতে পারে বলে আমরাও গুঞ্জন শুনেছি। তাই বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে।

