এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে জালিয়াতি, ‘নির্বিকার’ কুমিল্লা বোর্ড!

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাবিকুন নাহার ঝুমা। দশম শ্রেণিতে মেয়েটির রোল ছিল ১২। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী নির্বাচনি পরীক্ষায় সকল বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার তোফাজ্জল হোসেন ঢালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

ঝুমার বাবা ফার্নিচারের কাজ করেন, মা গৃহিণী। প্রথম সন্তানের ফলাফল আসবে, এ নিয়ে উচ্ছ্বাসের সীমা ছিল না তাদের। তার ওপর সামনের সারির শিক্ষার্থী। জিপিএ ৫ পাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু বিধি বাম! ঝুমার ফলাফলই আসেনি।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর ঝুমা আবিষ্কার করে, তার রোল নম্বরের জায়গায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের এক শিক্ষার্থীর ফল এসেছে। তাও তিন বিষয়ে অকৃতকার্য। মুহূর্তেই ঝুমার জীবনে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় পুরো পরিবারের।

এ নিয়ে মতলব দক্ষিণের বাসিন্দা এই শিক্ষার্থীর পরিবারে হাহাকার নেমে এলেও তাদের কর্তৃপক্ষ কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড এখনও নির্বিকার অবস্থায় রয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছেন। নামমাত্র তদন্ত কমিটি হলেও তাতে কমিটির সদস্যদের শুধু সই নেওয়া হয়েছে, বিস্তারিত তাদেরও জানানো হয়নি।

তবে ঝুমার পরিবার প্রতিবাদ করতেই বেরিয়ে আসে অন্য গল্প। শুধু ঝুমা নয়, এমন আরও ২০ জনের ফলাফলে গরমিল দেখা গেছে। তারা যে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরে পরীক্ষা দিয়েছিল, সেই রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ফল আসে অন্য শিক্ষার্থীদের, যাদের কেউই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি।

ঝুমার মা শাহিদা আক্তার জানান, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কয়েকবার কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে যান তারা। তদন্ত শেষে ২০ জনের ফল পরিবর্তনও হয়, ফল পরিবর্তন হয়নি শুধু তার মেয়ের।

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের একটা বছর নষ্ট হলো। সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল। এর দায় কে নেবে?’

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০১৩ সালে আলহাজ তোফাজ্জল হোসেন ঢালী উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি উপজেলার খাদেরগাঁও ইউনিয়নের খাদেরগাঁও গ্রামে অবস্থিত। ওই ইউনিয়নের প্রথম বিদ্যালয় এটি। বিদ্যালয়টি নিয়ে গ্রামের সবার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া।

বিদ্যালয়টির দাতা সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, এক একর জমির ওপর এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। আমি এখানে ২২ শতাংশ জায়গা দান করি। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর দারুণভাবে চলছিল। এখানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ২০২২ সালে যোগ দেন মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম। আগে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে ভালোই ছিলেন, তবে প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর তার মাথায় লোভ কাজ করা শুরু করে। তিনি রাত ১১টা পর্যন্ত অফিস কক্ষে বসে থাকতেন। কোনো কাজই অন্যদের দিয়ে করাতেন না।

বিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাহাঙ্গীর ঢালীর দাবি, প্রধান শিক্ষক জালিয়াতি করে নিয়মিত ২০ শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ করেননি। তার পরিবর্তে টাকা খেয়ে তিনি অন্য দুর্বল ও অনিয়মিত ২০ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ ও রেজিস্ট্রেশন করেন। অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্রকে ফটোশপে এডিট করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নাম-পরিচয় বসিয়ে দেন। এটা দিয়েই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, যার কারণে ফল আসে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করা দুর্বল ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের।

তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গেই বোর্ডকে জানাই। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের নিয়ে দুবার বোর্ডে যাই। বোর্ড পরবর্তীতে আগের ফল বাতিল করে নতুন ফল দেয়।’

এদিকে, সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু সাবিকুন নাহার ঝুমা নয়, খাদিজা আক্তার নামে বিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষার্থীও জালিয়াতির শিকার হয়েছেন। তারও ফল শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি।

বিদ্যালয়টির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্বাস উদ্দিন বলেন, ২০২৫ সালে ৭৪ জন পরীক্ষার্থী ছিল। এর মধ্যে ২০ জনের ফলে এমন গরমিল দেখা দেয়। এবার ৯৯ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। আমরা প্রতিষ্ঠানের সম্মান ফেরাতে কাজ করছি। এ ঘটনায় বোর্ড একটি তদন্ত করেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে প্রধান করে আরও একটি তদন্ত চলছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডেরও দায় আছে। এক-দুজন নয়, একই প্রতিষ্ঠানের ২০ জন শিক্ষার্থী অন্যের রোল-রেজিস্ট্রেশন নম্বরে পরীক্ষা দিয়েছেন, প্রাথমিক অবস্থায় বোর্ডের তা দৃষ্টিগোচর হয়নি। পুরো বোর্ডে এমন অসংখ্য জালিয়াতি হতে পারে।

তারা আরও বলেছেন, বোর্ড কর্তৃপক্ষ এতবড় জালিয়াতির ঘটনায় কী তদন্ত করেছেন, তদন্তের ফলাফল কী, তা স্পষ্ট করেননি। বোর্ড থেকে ওই বিদ্যালয়ের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি; ফেরত দেওয়া হয়নি বঞ্চিত একাধিক শিক্ষার্থীর ফলাফল।

তাদের দাবি, তদন্ত কমিটিতে যে ছয়জন রয়েছেন, তদন্তের ফলাফলের অনুলিপি তাদের সরবরাহ করা হয়নি। ইংরেজি ‘এস’ অদ্যাক্ষরের দুই কর্মকর্তার এতে যোগসাজস রয়েছে।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য অভিযুক্ত সাবেক প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলামের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক রুনা নাছরীন বলেন, ‘এ ঘটনায় একমাত্র অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক। স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রধান শিক্ষক এমনভাবে জালিয়াতি করেছেন যা কল্পনাকেও হার মানায়। তিনি রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর যেভাবে নকল করেছেন, তা যে কারও পক্ষে ধরা মুশকিল। তারপরও তদন্তের পর যে কয়জনের খাতা পাওয়া গেছে, তাদের ফল সংশোধন করা হয়েছে। যাদের পাওয়া যায়নি, তাদেরটা সংশোধন করা যায়নি।’ ইউএনবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *