উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব: কার কতটা বেড়েছে বা কমেছে

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যাক্তি ও তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদের বিরবণী প্রকাশ হয়েছে। যে বিবরণী অনুযায়ী বেশিরভাগ উপদেষ্টা এবং তাদের স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণই বেড়েছে।

অর্থবছর অনুযায়ী ৩০শে জুন ২০২৪ থেকে ৩০শে জুন ২০২৫ এই সময়ের সম্পদের হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী প্রায় আট মাসের হিসেব এখানে দেওয়া হয়নি।

সম্পদের বিবরণীতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মোট আর্থিক সম্পদ বেড়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি।

এছাড়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমান এবং বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদ কমলেও বেশ বেড়েছে তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার মোট সম্পদও।

সঞ্চয়পত্র নগদায়ন, সঞ্চয়ী বা মেয়াদী আমানতে বৃদ্ধি এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ারের কারণে প্রধান উপদেষ্টার মোট সম্পদ বেড়েছে বলে বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও তার স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের নন ফাইনান্সিয়াল সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও মোট সম্পদের পরিমাণ কমেছে কোটি টাকার কাছাকাছি।

এছাড়া উপদেষ্টাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। মোট হিসেবে সব থেকে বেশি অর্থ-সম্পদের মালিক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।

তার পরেই রয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান।

মি. রহমান এবং স্ত্রীর সম্পদের হিসাব একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবরণ অনুযায়ী তাদের বেশিরভাগ সম্পদই দেশের বাইরে।

শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেওয়া সদস্যদের মধ্যে আসিফ মাহমুদ এবং মাহফুজ আলমের সম্পদের হিসাব এই বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থেকে উপদেষ্টা হওয়া নাহিদ ইসলামের তথ্য, দায়িত্ব থেকে সরে দাড়ানোর সময় তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন।

সম্পদের বিবরণে যা রয়েছে

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উপদেষ্টা পরিষদে থাকা মোট ২৭ জন এবং তাদের স্ত্রী বা স্বামীর সম্পদের হিসেব উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পদের বিবরণ অনুযায়ী, উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদ কিছু কমলেও দেড় কোটি টাকার বেশি সম্পদ বেড়েছে তার স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার। তার কোটি টাকার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায়ও দেখানো হয়েছে।

মিজ তিশার মোট সম্পদ এক কোটি ৪০ লক্ষ ৮১ হাজার ৮৬০ টাকা থেকে দুই কোটি ৯৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫০১ টাকা হয়েছে।

মোট সম্পদ বেড়েছে উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের। যা ৯৮ লক্ষ ২২ হাজার সাত টাকা থেকে বেড়ে দুই কোটি ৫২ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৯ টাকা হয়েছে।

অর্থাৎ দেড় কোটি টাকার সম্পদ বেড়েছে মি. রহমানের। তার স্ত্রীর সম্পদও ৬৫ লক্ষ টাকার কাছাকাছি বেড়েছে।

প্রায় দেড় কোটি টাকার সম্পদ বেড়েছে উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের। চার কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা থেকে তার মোট সম্পদ হয়েছে পাঁচ কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা। তার স্ত্রী সম্পদও বেড়েছে ২৫ লক্ষ টাকার কিছু বেশি।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মোট সম্পদের পরিমাণ ছয় লাখ টাকার কাছাকাছি বাড়লেও তার স্ত্রী মিজ পারভীন আহমেদ এর মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। এই এক বছরে তার ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক দায়ও বেড়েছে।

কোটি টাকার বেশি সম্পদ বেড়েছে উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের। ব্যাংক আমানত থেকে পাওয়া মুনাফা, ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থেকে আয়- এসব কারণে তার সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এর এই এক বছরে প্রায় বারো লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে। আর তার স্ত্রী শীলা আহমেদ এর বেড়েছে ৪৩ লক্ষ টাকার সম্পদ।

প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের।

তবে তার স্ত্রীর সম্পদ কমেছে। আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মোট সম্পদের পরিমাণ ষোল লক্ষ টাকার মতো বাড়লেও তার স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে দুই লক্ষ টাকার কিছু বেশি।

শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এর ৫৫ লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে। আর তার স্ত্রীর প্রায় বেড়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার সম্পদ।

উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৫ লক্ষ টাকার মতো বেড়েছে। তার স্ত্রীর বেড়েছে ১০ লক্ষ টাকার কিছু বেশি।

এই সময়ে উপদেষ্টাদের মধ্যে সম্পদ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের। কোটি টাকার বেশি সম্পদ কমেছে তার।

আর্থিক বিবরণের শুরুতে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি ২৫ লক্ষ ৬৫ হাজার ৫৫ টাকা হলেও সবশেষ হিসেবে এক কোটি ১২ লক্ষ ৭২ হাজার ৯২৪ টাকার উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তার স্বামীর মোট সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।

উপদেষ্টা ফারুক ই আজম এর সম্পদ এক কোটি ৭৬ লক্ষ থেকে দুই কোটি দুই লক্ষ হয়েছে। তার স্ত্রীরও তিন লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে।

উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সম্পদ বাড়লেও কমেছে তার স্ত্রীর। মি. হোসেনের ২৬ লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে।

একইভাবে নিজের সম্পদ কিছু বাড়লেও কমেছে উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এর স্বামীর মোট সম্পদ। বিবরণ অনুযায়ী, দেড় কোটি টাকার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায় রয়েছে তার স্বামীর।

সম্পদ বেড়েছে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এবং তার স্বামীর। মিজ আখতারের মোট সম্পদ ৮১ লক্ষ থেকে এক কোটি দুই লক্ষ হয়েছে বলে বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ এর মোট সম্পদ প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা বাড়লেও তার স্বামী হুমায়ুন কাদের চৌধুরির মোট সম্পদ কোটি টাকা বেড়েছে। যদিও তার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায় কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।

মোট সম্পদের পরিমাণ ৮৮ লাখ টাকা থেকে এক কোটি ১৩ লাখ টাকা হয়েছে উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেনের। তার স্ত্রী সম্পদও কিছু বেড়েছে। উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা এবং তার স্ত্রী উভয়ের মোট সম্পদ কমেছে।

টাকার হিসেবে উপদেষ্টাদের মধ্যে সবথেকে ধনী বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তার মোট সম্পদ ৯১ কোটি ১০ লক্ষ ৯৮ হাজার ৮৪২ টাকা থেকে ৯১ কোটি ৬৫ লক্ষ ১০ হাজার ৮৯৫ টাকা হয়েছে। প্রায় তিন লক্ষ টাকার সম্পদ বেড়েছে তার স্ত্রীরও।

প্রধান উপদেষ্টা বিশেষ সহকারী, দূত এবং উপদেষ্টাদের অনেকের আর্থিক বিবরণও দেওয়া হয়েছে। যেখানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ এবং তার স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর সম্পদের হিসেব বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি।

এক্ষেত্রে অধ্যাপক আলী রীয়াজ ২০২৫ সালের নভেম্বরে উপদেষ্টার পদমর্যাদায় যোগদান করেছেন। এতে করে এই বিবরণীর মধ্যে তার সম্পদের হিসাব দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

আর প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী অবৈতনিক হওয়ায় তিনি সরকারের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমানের সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে। যদিও তার মোট সম্পদের বেশিরভাগই দেশের বাইরে।

বিবরণ অনুযায়ী মি. রহমান এবং তার স্ত্রীর দেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ ২২ লক্ষ টাকা। আর ৪৬ লক্ষ ৩৫ হাজার ৮৫০ মার্কিন ডলারের মোট সম্পদ রয়েঝে দেশের বাইরে। এছাড়া ১২ লক্ষ মার্কিন ডলারের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক দায় রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী উপদেষ্টাদের বিষয়ে যা জানা গেল

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে তিনজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধিকেও যুক্ত করা হয়েছিল।

উপদেষ্টাদের সম্পদের যে বিবরণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে সেখানে উপদেষ্টা পরিষদে থাকা ছাত্র উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণও দেওয়া হয়েছে।

সম্পদের বিবরণ অনুয়ায়ী, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার মোট সম্পদের পরিমাণ ১৫ লক্ষ ৩৪ হাজার ৭১৭ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তার ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন না থাকায় আগে তার সম্পদের পরিমাণ কত ছিল সে বিয়ষে উল্লেখ করা হয়নি।

আরেক শিক্ষার্থী উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলমের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। বিবরণী অনুযায়ী চার লক্ষ ২০ হাজার টাকা থেকে এক বছরে তার সম্পদ হয়েছে ১২ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮৭৯ টাকা।

উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সম্পদের হিসেব এই বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করার পর গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

ওই সময় তিনি জানিয়েছিলেন, “উপদেষ্টা পদে যোগদানের আগে আমার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। ২১শে অগাস্ট উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালনের জন্য সম্মানী গ্রহণের লক্ষ্যে সরকারিভাবে সোনালী ব্যাংকে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলি।”

ওই অ্যাকাউন্টে ২১শে অগাস্ট ২০২৪ থেকে ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত হিসাবে দশ লক্ষ ছয় হাজার ৮৮৬ টাকা জমা হয়েছে এবং নয় লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার ১৮০ টাকা উত্তোলিত হয়েছে বলে জানান তিনি। সোনালী ব্যাংকের এই অ্যাকাউন্ট ছাড়া তার অন্য কোনো অ্যাকাউন্ট নেই বলেও ওই সময় জানিয়েছিলেন মি. ইসলাম। বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *