সাড়া জাগিয়েছে ছাত্রশিবিরের ‘আল-খাওয়ারিজমি সায়েন্স ফেস্ট’!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

দুই দিনব্যাপী আল-খাওয়ারিজমি সায়েন্স ফেস্ট (Al Khwarizmi Science Fest 2025) অনুষ্ঠান শিক্ষার্থী ও সুধী মহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। “Inspired by History, Innovating the future” – এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান বিভাগের অনুষ্ঠানটি বেশ সফল ও প্রভাব বিস্তারকারী আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

২৯ ও ৩০ জানুয়ারি রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (KIB) কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত এই বিজ্ঞান উত্সবে সুধী সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ধরনের আয়োজন শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে খুবই সহায়ক। এটা শিক্ষার্থীদের মানসপটে পরিবর্তন আনবে বলে উপস্তিত অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

চিন্তা থেকেই সৃজনশীলতা বিকশিত হয়। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। শিশু মনে যে ভিত্তিভূমি তৈরি হচ্ছে, তারা আগামী দিনে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এমন চিন্তা-চেতনায় তারা সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠলে আগামী দিনের বিশ্ব হবে সুন্দর ও শান্তিময়।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুই দিনব্যাপী ‘আল-খাওয়ারিজমি সায়েন্স ফেস্ট ২০২৫’ সমাপ্ত হয়। ৩০ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে উৎসবের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইন্টেল কর্পোরেশনের (Intel) সাবেক সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ড. মাসুদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম, সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবং নর্থরোপ গ্রুম্যান (Northrup Grumman)-এর ডিজাইন আর্কিটেক্ট আহমেদ এস মজুমদার।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। সঞ্চালনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বাচিক শিল্পী সাইফুল আরেফিন লেলিন। দায়িত্বশীলদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক ডা. নাঈদ তাজওয়ার, মানবাধিকার সম্পাদক সিফাত উল আলম, গবেষণা সম্পাদক ফখরুল ইসলাম, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহীসহ কেন্দ্রীয় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

দুই দিনব্যাপী এই মেলায় মোট ১৮০টি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট প্রদর্শিত হয়, যার মধ্যে সিনিয়র গ্রুপে ১২০টি এবং জুনিয়র গ্রুপে ৬০টি প্রজেক্ট ছিল। গণিত অলিম্পিয়াডের ৩টি ক্যাটাগরিতে (জুনিয়র, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি) ১৪০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক ‘ক্যাপচার দ্য ফ্ল্যাগ’ (CTF) প্রতিযোগিতায় প্রিলিতে ২৬৮টি টিমে মোট ৬৮১জন অংশগ্রহণ করে এবং ফাইনাল রাউন্ডে বাছাইকৃ ৩৫টি টিমে মোট ১৩৭ জন অংশ নেয়।

এছাড়াও রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতায় ৭০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিজয়ীদের মাঝে নগদ অর্থ পুরস্কার, মেডেল, সার্টিফিকেট ও টি-শার্ট, গিফটব্যাগ প্রদান করা হয়,। প্রজেক্ট ডিসপ্লেতে প্রথম স্থান অধিকারী দলকে ৬০,০০০ টাকা এবং পরবর্তী স্থানগুলোকে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৪০, ৩০ ও ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।

উৎসবের দ্বিতীয় সেশনে বুয়েটের ন্যানো মেটেরিয়াল এন্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফখরুল ইসলাম এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুর রব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পেশ করেন।

এ সময় ‘বাংলার ম্যাথ’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ শাহরিয়ার শুভ এবং ‘লার্ন উইথ পাভেল’ এর পরিচালক পাভেল মোহাম্মাদ এক বিশেষ প্যানেল ডিসকাশন পরিচালনা করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য মেলা প্রাঙ্গণে ছিল ফিজিক্স, বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, রোবোটিক্স ও কুরআনিক সায়েন্স জোনসহ নানা আকর্ষণীয় আয়োজন।

এর আগে দ্বিতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন সকাল ৯টায় শুরু হয়। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাঈদুল ইসলাম। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল ওয়াটার রকেট উৎক্ষেপণ এবং সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় মনোজ্ঞ ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এবারের ফেস্টের অন্যতম আকর্ষণ ‘প্রজেক্ট ডিসপ্লে’ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ৬০,০০০ টাকা নগদ অর্থ ও সম্মাননা জিতেছে টিম ‘ইনক্রিবো’ (প্রজেক্ট: স্মার্ট গ্রোসারি স্টোর)।

প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে টিম ‘সোলভেন’ (প্রজেক্ট: নিউ সিটি), তৃতীয় স্থান টিম ‘মিসাওয়াশ এক্স’ (প্রজেক্ট: প্রতিরোধ বায়োকিট), চতুর্থ স্থান টিম ‘এ্যাবসলিউট জিরো’ (প্রজেক্ট: মাল্টিপারপাস রিভোট ভার্সন ৮) এবং পঞ্চম স্থান অধিকার করে টিম ‘ঈসাইন’ (প্রজেক্ট: ভার্টিকাল এক্সিস উইন্ড টারবাইন উইথ পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন)।

রুবিক্স কিউব প্রতিযোগিতায় দ্রুততম সময়ে সমাধান করে প্রথম স্থান অধিকার করেন মুনতাজিম বিল্লাহ। এ ইভেন্টে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন যথাক্রমে আব্দুল্লাহ, মুশফিকুল ইসলাম, দ্বীপ সরকার ও ফারহান তানভীর।

গণিত অলিম্পিয়াডের তিনটি ক্যাটাগরিতে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থীকে গোল্ড, সিলভার ও ব্রোঞ্জ মেডেল প্রদান করা হয়। এর মধ্যে জুনিয়র ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন শামসুক হক খান স্কুলের ইফাজ আরমান খান, নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের মাহির মোহাম্মদ শাহরিয়ার, মোহাম্মদপুর প্রিপ্রেটরি স্কুলের রাইয়ান সোহান, গভ. ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের ইলহাম চৌধুরী এবং সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের নওশাদ জামান।

সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল জয় করেন বিডিসি একাডেমির মো. মুহতাদি আহরার, বিএল সরকারি হাইস্কুলের পার্থ মণ্ডল, ঢাকা শিক্ষাবোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল এণ্ড কলেজের জায়েদ মুস্তাকিন, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সাঈফ মিহনান সাবির এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের ইজতিহাদ মুহাম্মদ ফাহাদ।

হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরিতে গোল্ড মেডেল পান নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী তাশদিক আহমেদ তন্ময়, আল ওয়াহিদ ও রিমন আহসান, ঢাকা কলেজের কাজী রায়হান উদ্দিন এবং ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জুনাইদ আহমেদ।

গণিত অলিম্পিয়াডের তিনটি ক্যাটাগরির মধ্যে সর্বাধিক নম্বর প্রাপ্তি এবং সার্বিক নৈপুণ্যের ভিত্তিতে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী তাশদিক আহমেদ তন্ময়কে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ‘শহীদ ওসমান হাদী এওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।

সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *