উত্থানের পথে বাংলাদেশ, মূল্যবোধ ফেরানো ও জাতি গড়ার স্বপ্ন || ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

তিন.

১৯৭০ দশকের শেষ দিকে নিয়তি আমাকে ব্রিটেনে নিয়ে আসে। এটি ছিল আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং। এতে করে যে কেবল আমার পেশাগত পরিস্থিতি বদলে যায়, তা নয়; বরং আমি ব্রিটিশ সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত হয়ে পড়ি। আমার জার্নিটা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে ক্রানওয়েলস্থ রয়াল এয়ার ফোর্স কলেজে একজন বিএএফ (বাংলাদেশ এয়ার ফোর্স) অফিসার হিসেবে এক বছরব্যাপী ট্রেনিং গ্রহণের মধ্য দিয়ে।

১৯৮০ দশকের শুরুর দিকে বিএএফ ছেড়ে দিয়ে আমি ইউকে-তে ফিরে যাই। সেখানে শুরু হয় আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। আমি সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ফিজিক্সের ওপর আমার ডক্টরেট পড়াশোনা শুরু করি। তবে আমি কেবল অ্যাকাডেমিক অ্যাক্টিভিটি নিয়ে পড়ে থাকিনি। সাথে সাথে সমাজ ও সংস্কৃতিবিষয়ক বহু অ্যাক্টিভিটিতে আমি ইনভলভড হয়ে যাই। পরবর্তী বছরগুলোতে সেখানকার একাধিক সংস্থার সাথে জড়িত হয়ে পড়ি।

যুব, সামাজিক ও নাগরিক বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিতে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ মুখ্য হয়ে ওঠে। ব্রিটেনে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী গোষ্ঠী, ব্রিটিশ মুসলিম কমিউনিটি ও ব্রিটিশ সচেতন নাগরিক সমাজ ইত্যাদি সংগঠন আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ফলে তখন আমার গন্তব্য আর এক জায়গায় আটকে থাকে না।

জার্নিটা শুরুর দিকে ছিল অ্যাকাডেমিক ও রিসার্চের। কিন্তু দ্রুতই সেখানে আরও একটি মিশন যুক্ত হয়। আমি চেয়েছিলাম, পড়াশোনার পাশাপাশি আমি যেই কমিউনিটিতে বাস করি, সেটির উন্নয়নকল্পে কাজ করব। সেখানকার মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও উত্তম বোঝাপড়া তৈরিতে ভ‚মিকা রাখব। সেই যে জড়িয়ে পড়লাম, তখন থেকে এখন অবধি বহু দশক ধরে আমি এসব ক্ষেত্রে আমার স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি।

বহু বছর ধরে বিভিন্ন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের সাথে আমি যুক্ত হয়ে আছি। যেমন : সিটিজেনস ইউকে, দ্য মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন, ঐতিহাসিক ইস্ট লন্ডন মসজিদ (এই মসজিদ লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যকার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ) ইত্যাদি। তখন থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত আমি ব্রিটিশ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির কাজে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।

কেউ হয়তো ভাবতে পারে, যেহেতু আমি বাংলাদেশি, তাই ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আমি এসব করছি। ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। আমার এই স্বেচ্ছাশ্রম কেবল বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য নয়; বরং আমি চাই, ব্রিটেনে বসবাসরত প্রতিটি কমিউনিটি নিয়ে এখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে উঠুক। যেখানে প্রত্যেক কমিউনিটি যার যার মতো করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

ইউকে-তে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এখানকার জীবনযাপন মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। যদিও বাংলাদেশিরা অন্যান্য কমিউনিটির তুলনায় বেশি পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু হয়ে থাকে, তবুও তাদের চ্যালেঞ্জের শেষ ছিল না। বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে মানুষ আসে মূলত অর্থনৈতিক কারণে।

যদিও ব্রিটেন তাদের জন্য একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত জায়গা। এখানে একসাথে বাস করে বহু সংস্কৃতিধারী মানুষ। তবুও তারা প্রতিনিয়ত ভালো সুযোগের সন্ধানে ঘুরে ফেরে। অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মতো করে বাংলাদেশিরাও এখানে এসে অর্থনৈতিক কষ্টে ভোগে। থাকে বিভিন্ন রকম সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বৈষম্য। ফলে বিদেশের মাটিতে তাদের জীবনটা হয়ে ওঠে ভীষণ দুর্বিষহ। তাদের যাপন করতে হয় এক সংগ্রামী জীবন।

একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমাকেও যে এসবের মুখোমুখি হতে হয়নি, তা কিন্তু নয়। তবুও আমি সব সময় ভেবেছি- কী করে এখানকার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বোঝাপড়া সৃষ্টি করা যায়। কী করে একই সমাজে বসবাসরত লোকেদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও পার্টনারশিপ গড়ে তোলা যায়। আমার মন সব সময় ঘুরে ফিরত, এমন একটি সমাজের আশায়, যার মূলভিত্তি হবে পারস্পরিক সুন্দর সহাবস্থান ও সৌহার্দ।

আমার সৌভাগ্য ছিল যে, আমি সেখানকার কিছু যুবকের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তাদের মধ্যে পুরুষ-নারী উভয়েই ছিল। তাদেরও মিশন ছিল আমার মতো সমাজ সংস্কারমূলক। আমরা সবাই মিলে একটি বেটার ব্রিটেন গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছিলাম। এমন ব্রিটেন, যেখানে মানুষে মানুষে ভিন্নতা পার্থক্যের দেওয়াল তৈরি করবে না; বরং প্রতিটি ভিন্নতা মিলে তৈরি হবে একটি ব্রিজ তথা সেতুবন্ধন। এজন্য আমরা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে কাজ শুরু করেছিলাম।

আন্তঃধর্মীয় আলাপচারিতা ও বিভিন্ন নাগরিক সংশ্লিষ্টতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল আমাদের কার্যক্রম। এই কাজ যে আমাদের দ্বারাই শুরু হয়েছিল, তা নয়; বরং আমাদেরও আগে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে যারা অন্য জায়গা থেকে ব্রিটেনে এসেছিল, তারা মূলত এ কাজের ভিত্তি রচনা করেন। এক্ষেত্রে আমরা তাদের আমাদের অগ্রবর্তী সিনিয়র মানি। কারণ, তারাই এই সংস্কারমূলক কাজের অবকাঠামো তৈরি করে গিয়েছিলেন। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে তারা এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তী জেনারেশনের জন্য একেকটি পিলার হিসেবে কাজ করেছিল।

প্রথম দিককার এই মানুষগুলো অক্লান্ত শ্রম দিয়েছিলেন এই ক্ষেত্রে। তাদের আশা ছিল, পরবর্তী যুব প্রজন্ম তাদের এই অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণাঙ্গতা দান করবে। একদিন তারাই কাঁধে তুলে নেবে নেতৃত্বের দায়ভার। তাদের হাত ধরে সমাজ নতুন স্বপ্ন দেখবে। তৈরি তৈরি হবে নতুন নতুন পেশার ক্ষেত্র। তারা তাদের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রসারিত করবে। এগুলোর সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিচালনা নিশ্চিত পূর্বক ব্রিটেনে বসবাসরত প্রবাসী সম্প্রদায়কে সমাজ গঠনে কাজে লাগাবে।

এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ছিল সিনিজেনস ইউকে। এর গোড়াপত্তন হয় ১৯৯০ দশকের মাঝের দিকে লন্ডনে। প্রতিষ্ঠার শুরুর লগ্ন থেকেই এর সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয় আমার। এই প্রতিষ্ঠানের একটি অন্যতম কাজ ছিল তৃণমূল পর্যায় থেকে নাগরিক সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বে গড়ে ওঠে একটি চমৎকার প্রজেক্ট। নাম রিয়াল লিভিং ওয়েজ ক্যাম্পেইন। এর প্রধান কাজ ছিল অল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। ইস্ট লন্ডনে বসবাসরত প্রবাসিগোষ্ঠীকে যেন যথাযথ আবাসন ও প্রয়োজনীয় সরজ্ঞাম সরবরাহ করা হয়, এটা বাস্তবায়নে কাজ করত এই প্রজেক্ট।

এ রকমই আরও একটি প্রতিষ্ঠান ছিল মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন। ব্রিটেনে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল একটি বটবৃক্ষ। এটি সমাজের সর্বস্তরে মুসলিমদের ন্যায্য ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করত। স্থানীয় সরকার ও সভ্য নাগরিক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায় এই প্রতিষ্ঠান।

তবে ৯/১১-এর পর গোটা বিশ্ব নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। পৃথিবীর সার্বিক পরিস্থিতির ওপর এই সন্ত্রাসযুদ্ধ একটি অপচ্ছায়া বিস্তার করে। আর এর প্রভাব সারা বিশ্বের মুসলমানদের বয়ে বেড়াতে হয়। এক্ষেত্রে ব্রিটেনে বসবাসরত মুসলমানদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৫ সালের জুলাইয়ে লন্ডন বম্বিং ব্রিটেনের মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান পরিপূর্ণরূপে বদলে দেয়। এটি ৭/৭ হিসেবে পরিচিত।

এরপর থেকে ব্রিটেনে বসবাসরত মুসলিমদের সর্বদা সন্দেহের চোখে দেখা হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশি মুসলমানদের প্রতি তাদের এই সন্দেহ ছিল তুলনামূলক বেশি প্রকট। উক্ত ঘটনার পরে ব্রিটেনজুড়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী সংগঠন গড়ে ওঠে। তারা মুসলমানদের টার্গেট করে বিভিন্ন পলিসি ও ধারা প্রণয়ন করে। স্বাভাবিকভাবেই এসব মুসলমানদের অস্তিত্ববিরোধি ছিল। এককথায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা মুসলমানদের ভুল বুঝত।

এই পরিস্থিতি প্রবাসী মুসলিম জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের ওপর ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মুসলমানদের প্রতি রাষ্ট্রীয় এই তিসংবেদনশীলতা স্থানীয় নাগরিক ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্বাসহীনতার জন্ম দেয়। একটা সময় স্থানীয় নাগরিক সমাজ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত যেসব সংগঠন মুসলিম প্রবাসীদের কল্যাণে কাজ করত, তারাও পিছু হটতে শুরু করল।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ব্রিটেনের প্রভাবশালী মুসলিম সমাজ, ট্রেড ইউনিয়ন, সচেতন নাগরিক সমাজ সবাই মিলে মুসলমানদের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মুসলমানদের ওপর সার্বিক পরিস্থিতির নেগেটিভ প্রভাব কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়। তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পাশে দাঁড়াত। অক্লান্ত শ্রম দিয়ে তারা মুসলমানদের সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে কাজ করত। তাদের এই প্রচেষ্টার ফলে মুসলমানরা শান্তিপূর্ণভাবে ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বসবাস করার অধিকার কিছুটা হলেও ফিরে পেতে শুরু করে। (ধারাবাহিক চলবে)

ড. মুহাম্মাদ আবদুল বারী ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *