মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত ১০ হাজার স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন ইরানের সাথে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পথ খুঁজছেন, ঠিক সেই সময়ে নিজের হাতে আরও শক্তিশালী ‘সামরিক বিকল্প’ রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল সৈন্য বহর পাঠানোর মূল লক্ষ্য হলো তেহরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করা। অতিরিক্ত এই বিশাল বাহিনীকে ঠিক কোথায় বা কোন দেশে মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এর আগে ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক হামলা স্থগিতের মেয়াদ আরও ১০ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, তেহরানের অনুরোধের প্রেক্ষিতে এই স্থগিতাদেশ আগামী ছয়ই এপ্রিল, ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
ট্রাম্পের দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বর্তমানে “খুব ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা চলছে। ফক্স নিউজের ‘দ্য ফাইভ’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরান সরকার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সাত দিন সময় চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাদের ১০ দিন সময় দিয়েছি।”
এই নমনীয়তার কারণ হিসেবে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে পাওয়া একটি ‘উপহারের’ কথাও উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আলোচনার নিদর্শন হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার বা জাহাজকে নির্বিঘ্নে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, স্থগিতাদেশটি সোমবার, ছয়ই এপ্রিল রাত আটটা পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর আগে তিনি পাঁচ দিনের স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন, যা চলতি সপ্তাহেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে একটি ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পেশ করেছে। তবে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। যদিও ট্রাম্পের দাবি, ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যম’ যাই বলুক না কেন, আলোচনা ‘বেশ ভালোভাবে’ এগোচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা কোনো স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেয় নাকি সংঘাত আরও ঘনীভূত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত রবার্ট ম্যালি।
বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিতের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প স্থল অভিযানের নির্দেশ দেবেন না।”
ম্যালির মতে, কোনো বড় চুক্তির চেয়ে বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের ওপর ভিত্তি করেই ট্রাম্প তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে, ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। এশিয়ার প্রধান শেয়ার বাজারগুলোতেও বড় ধরনের দরপতন লক্ষ্য করা গেছে।
বৃহস্পতিবার সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৮ ডলারে স্থির হলেও, ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের এক ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় এক ডলার কমে যায়। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়িক প্রতিবেদক নাটালি শেরম্যান জানিয়েছেন, সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকলেও চাহিদার পূর্বাভাসে কিছুটা পরিবর্তনের কারণেই এই সামান্য পতন বলে মনে করছেন তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে আলোচনা বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিতের কথা বললেও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান-ইসরায়েল। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে শুক্রবার ‘ব্যাপক হামলা’ চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ। এছাড়া লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি শহরেও হামলা হয়েছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের মধ্যে নিজ দেশের জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা আরও হারিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই কঠিন সময় পার করছেন তিনি। বিবিসির উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা অ্যান্থনি জার্চার জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই মার্কিন জনজীবনে এর তীব্র প্রভাব অনুভূত হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে গ্যাসের দাম লাফিয়ে বেড়ে বর্তমানে প্রতি গ্যালন গড়ে চার ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই ঊর্ধ্বমূল্য সরাসরি আঘাত হেনেছে প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তায়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তার হার বর্তমানে মাত্র ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে অর্থাৎ ২৮শে ফেব্রুয়ারি ৪২ শতাংশ আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহ পর সেই ইতিবাচক রেটিং আরও কমে বর্তমানে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
যদিও অধিকাংশ আমেরিকান শুরু থেকেই এই সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছিলেন, তবুও ট্রাম্পের একটি শক্ত সমর্থক গোষ্ঠী তাকে এখনো টিকিয়ে রেখেছে।
কুইনিপিয়াকের সাম্প্রতিক জরিপ অনযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এক চরম রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ রিপাবলিকান ইরানে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন।
কিন্তু সাধারণ নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টো; সেখানে সমর্থনের হার মাত্র ৩৯ শতাংশ এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট মাত্র ৩৪ শতাংশ ভোটার। বিবিসি

