আদালত ঢালাও শুল্ক ‘অবৈধ’ ঘোষণার পর আবার ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা ট্রাম্পের

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী ঢালাওভাবে আরোপ করা শুল্ক বা গ্লোবাল ট্যারিফ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়কে ‘ভয়াবহ’ অভিহিত করে বাতিল হয়ে যাওয়া শুল্কের বদলে নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। তার বাণিজ্যনীতি প্রত্যাখ্যানকারী বিচারকদের ‘মূর্খ’ বলেও সমালোচনা করেন তিনি।

উচ্চ আদালত রায় দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন “প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না”। রায়ে বলা হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য সংরক্ষিত আইনকে ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প তার কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রম করেছেন।

সংবিধান অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে বলেন, প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের মতো অসাধারণ ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন দেখাতে হবে। তিনি তা করতে পারেন না।

গত এপ্রিল মাসে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের পণ্যের উপর ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মি. ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় একে ‘অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। রায় প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, “আমি আদালতের কিছু সদস্যকে নিয়ে লজ্জিত। আমাদের দেশের স্বার্থে সঠিক কাজটি করার সাহস দেখাতে না পারায় আমি তাদের নিয়ে পুরোপুরি লজ্জিত”।

সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়ে যাওয়া শুল্কের বদলে তিনি নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন। শুল্ক আরোপকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক বলে দাবি করে তিনি আরও বলেন, তিনি অন্য আইন ব্যবহার করে শুল্ক আরোপ চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে বিকল্প আছে— দারুণ বিকল্প— এবং এতে আমরা আরও শক্তিশালী হব।”

বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট নয়, বরং শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রয়েছে কংগ্রেসের। প্রেসিডেন্ট যে আইনের উপর ভিত্তি করে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, ১৯৭৭ সালের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন, তাতে ট্রাম্পকে এত ব্যাপক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়নি।

আদালতের এই সিদ্ধান্তকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের জন্য বড় জয় হিসেবে দেখা হয়েছে— যারা এই শুল্ককে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
উচ্চমাত্রার শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে বা চুক্তি করতে বাধ্য করার যে অবস্থানে ছিলেন ট্রাম্প, আদালতের এই সিদ্ধান্ত তার সেই অবস্থানকে দুর্বল করবে।

প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত হওয়ার পর এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদাররাও আরও সাহসী হয়ে উঠতে পারে। আবার সুপ্রিম কোর্টের রায় এই সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে যে গত এক বছরে আদায় করা শুল্ক রাজস্বের বড় একটি অংশ ট্রাম্প প্রশাসনকে ফেরত দিতে হতে পারে। এই রায় ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হলেও প্রশাসন অন্য আইনও ব্যবহার করতে পারে এবং হোয়াইট হাউস থেকে বড় নীতিগত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।

এমন বিশ্লেষণ করছেন বিবিসির আন্তর্জাতিক ব্যবসা বিষয়ক সংবাদদাতা থিও লেগেট। কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে শুল্ক আরোপ করতে গেলে কংগ্রেসের অনুমোদন বা বাণিজ্য দপ্তরের তদন্ত প্রয়োজন হতে পারে, যা বেশি সময় নিতে পারে। ফলে এই রায় একদিকে নিশ্চিত করেছে যে, প্রেসিডেন্ট এই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শুল্ক আরোপ করতে পারবেন না।

অন্যদিকে নতুন অনিশ্চয়তাও সৃষ্টি করেছে। কারণ মার্কিন আমদানিকারকরা ইতিমধ্যে যে শুল্ক পরিশোধ করে ফেলেছেন, তা ফেরতের ক্ষেত্রে কী হবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়। সে শুল্ক ফেরত দিতে হলে মার্কিন সরকারের জন্য বিশাল অর্থ খরচ হতে পারে।

বিচারকদের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষায় ক্ষোভ

শুক্রবারের এই রায় ছিল “অত্যন্ত হতাশাজনক”, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সঙ্গে যারা একমত হয়েছেন, তাদের উচিত “সম্পূর্ণ লজ্জিত” হওয়া এবং তারা “সঠিক কাজটি করার” মতো সাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন–– বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তার এই প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত সমমর্যাদার নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে এক ধরনের আক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

রায় প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পর হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে ৪৫ মিনিট ধরে ট্রাম্প রায়টির সমালোচনা করেন এবং যুক্তি দেন যে তিনি অন্যান্য দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ অব্যাহত রাখতে অন্য পদ্ধতি খুঁজে বের করবেন। তবে পুরো বক্তব্যজুড়ে তিনি বারবার বিচারকদের প্রসঙ্গে ফিরে আসেন—যা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি এই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত পেয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—কেউকেই ছাড় দেননি।

ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল করা ছয়জন বিচারক সমানভাবে আদালতের উদারপন্থি এবং রক্ষণশীল উভয় শাখা থেকেই এসেছেন। এর মধ্যে তিনজন— এলেনা ক্যাগান, সোনিয়া সোটোমেয়র এবং কেটাঞ্জি ব্রাউন জ্যাকসন—ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের মনোনীত। বাকি তিনজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের মনোনীত। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত লিখেছেন, তাকে জর্জ ডব্লিউ বুশ মনোনীত করেছিলেন। আর নিল গরসাচ ও অ্যামি কোনি ব্যারেটকে মনোনীত করেছিলেন ট্রাম্প নিজেই, তার প্রথম মেয়াদে। ট্রাম্প তাদের সবাইকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।

রায় কার্যকর হবে কীভাবে

সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের কিছু বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বাতিল করার আগেই, কিছু বড় মার্কিন কোম্পানি ইতোমধ্যে পরিশোধ করা অর্থ ফেরত পেতে মামলা করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের রায় কীভাবে কার্যকর হবে, সেটাও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। আইন প্রতিষ্ঠান পিলসবারি-এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের প্রধান স্টিভ বেকার বিবিসিকে বলেন, আদালতের রায় কীভাবে কার্যকর হবে- তা নির্ধারণের দায়িত্ব থাকবে কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের ওপর।

আবার ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে অন্য আইনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপের বিকল্প পরিকল্পনা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করছেন মি. বেকার। তিনি উদাহরণ দেন, এখন তিনি এমন একটি আইন ব্যবহার করতে পারেন, যা প্রেসিডেন্টকে ১৫০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয়। সেক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্ট দেশ বা খাতকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।

আদালত আবার কিছু শুল্ক বহালও রেখেছে, যেগুলো নির্দিষ্ট দেশ থেকে নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর আরোপ করা হয়েছিল। এতে প্রশাসনের সামনে শুল্ক নীতি পুনর্গঠনের একটি সম্ভাব্য পথ রয়ে গেছে।

যাই হোক, ট্রাম্প এই ইস্যু সহজে ছেড়ে দেবেন—এমন সম্ভাবনা কম। হোয়াইট হাউসে প্রার্থী হওয়ার অনেক আগ থেকেই তিনি শুল্ক নিয়ে সোচ্চার।
সুপ্রিম কোর্ট তার এককভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত করলেও, তিনি এই অবস্থান সহজে ত্যাগ করবেন না বলে ধারণা দিচ্ছেন বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা ড্যানিয়েল বুশ।

১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা

ডোনাল্ড ট্রাম্প এরইমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়ে যাওয়া শুল্কের বদলে নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করেছেন। শুক্রবার ট্রাম্প ‘সেকশন ১২২’ নামে আগে কখনও ব্যবহৃত না হওয়া একটি আইনের আওতায় নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এ আইন অনুযায়ী, কংগ্রেস হস্তক্ষেপ করার আগে সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যায়। এটি ২৪ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হবে।

শুক্রবার হোয়াইট হাউজে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, শুল্ক ফেরতের বিষয়টি দীর্ঘ আইনি লড়াই ছাড়া হবে না। তার প্রত্যাশা, এই বিষয়টি আদালতে বহু বছর জটিল অবস্থায় আটকে থাকবে।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তারা পূর্বে আলোচনায় নির্ধারিত শুল্কের বদলে এখন সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মুখোমুখি হবে। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন আশা করে এই দেশগুলো তাদের বাণিজ্য চুক্তির অধীনে করা ছাড়গুলো মানতে থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউস আরও কিছু প্রক্রিয়া বিবেচনা করতে পারে—যেমন সেকশন ২৩২ ও সেকশন ৩০১—যা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি ও অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার মোকাবিলায় আমদানি শুল্ক আরোপের সুযোগ দেয়। গত বছর ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ির মতো খাতে যে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, সেগুলো এই ধরনের আইনি কাঠামো ব্যবহার করে আরোপিত হয়েছিল এবং সেগুলো সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রভাবিত হয়নি।

ওয়াশিংটনে সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র ফেলো জিওফ্রি গার্টজ বলেন, “আজ পরিস্থিতি আরও জটিল এবং আরও বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নিরুত্তাপ ছিল। ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্র ওলফ গিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়টি নোট করেছি এবং এটি সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করছি।”

সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে আইইইপিএ আইনের আওতায় কমপক্ষে ১৩০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত প্রতিষ্ঠান—যার মধ্যে রয়েছে খুচরা বিক্রেতা কস্টকো, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদক আলকোয়া এবং টুনা ব্র্যান্ড বাম্বল বি— শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় মামলা দায়ের করেছে।

তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে শুল্ক ফেরতের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, যা সম্ভবত এই প্রশ্নটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতের কাছে ফিরিয়ে দেবে— কীভাবে এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *