মুকতাবিস উন নূর সিলেট প্রেসক্লাবে সপ্তমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সাঈদ চৌধুরী

সিলেটে সহিত্য-সাংবাদিকতায় কিংবদন্তি পুরুষ মুকতাবিস উন নূর সিলেট প্রেসক্লাবে সপ্তমবারের মতো সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) বিকেলে প্রেসক্লাব ভবনে ভোটগ্রহণ শেষে ফল ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি পদে তিনি পেয়েছেন ৫৪ ভোট। প্রতিদ্বন্ধি সদ্য প্রাক্তন সভাপতি ইকরামুল কবির পেয়েছেন ৩৬ ভোট। সাধারণ সম্পাদক পদে দৈনিক সিলেটের ডাকের চীফ রিপোর্টার মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম পেয়েছেন ৫৮ ভোট। প্রতিদ্বন্ধি ইয়াহইয়া ফজল পেয়েছেন ৩২ ভোট।

এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৯২ জন। এর মধ্যে ৯১ জন ভোট প্রদান করেছেন। বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। রাত ৮টার দিকে ফলাফল ঘোষণা করেন নির্বাচনের প্রিসাইডিং অফিসার এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম। সাথে ছিলেন নির্বাচন কমিশনের অপর সদস্য মো. ইরফানুজ্জামান চৌধুরী ও সনতু দাস।

এবারে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন দৈনিক সিলেট বাণীর সম্পাদক এম এ হান্নান। প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন দৈনিক প্রভাতবেলা সম্পাদক কবীর আহমদ সোহেল। সহ-সভাপতি পদে জয়ী হয়েছেন দৈনিক শুভ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মো: ফয়ছল আলম। প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন কামাল উদ্দিন আহমেদ, মো. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী এহিয়া ও কবির আহমদ। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে বিজয় লাভ করেন দেশ টিভির সিলেট প্রতিনিধি খালেদ আহমদ। প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন সাকিব আহমদ মিঠু। কোষাধ্যক্ষ পদে সফল হয়েছেন ইনকিলাবের সিলেট প্রতিনিধি ফয়সাল আমীন। প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন গোলজার আহমেদ। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন ডেইলী স্টারের চিত্র সাংবাদিক শেখ আশরাফুল আলম নাসির। প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন শফিক আহমদ শফি। পাঠাগার সম্পাদক পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন মুহিবুর রহমান। সদস্য পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছেন বাংলাদেশ বেতারের নগর সংবাদদাতা মুহাম্মদ আমজাদ হোসাইন, দৈনিক সিলেটের ডাকের সিনিয়র রিপোর্টার আনাস হাবিব কলিন্স ও মোহনা টিভির সিলেট ব্যুরো প্রধান আব্দুল আউয়াল চৌধুরী শিপার।

সপ্তমবারের মতো নির্বাচিত সভাপতি মুক্তাবিস-উন-নুর সিলেটের সহিত্য-সাংবাদিকতায় কিংবদন্তি পুরুষ। সৎ, নির্ভীক ও পেশাদার সাংবাদিক। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলার সাহস বা সত্যনিষ্ঠতা থেকে বিচ্যূত হননি কখনোই।

মাত্র ২৫ বছর বয়সে মুকতাবিস-উন-নূর সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৩৩ বছর বয়সে। ২০ বছর বয়সে সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠের সম্পাদক হন। সম্ভবত তিনিই তখন দেশের কনিষ্টতম সম্পাদক। সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য হন ১৯৮১ সালে। ৮২ সালের ডিসেম্বরে (৮৩-৮৪ সনের জন্য) সিলেট প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। ৮৪ সালে (৮৫-৮৬ সালের জন্য) নির্বাচিত হন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। দুই দফা সহ-সভাপতি (১৯৮৭-৮৮ ও ৮৯-৯০) এবং ৬দফায় (৯৩-৯৪, ৯৫-৯৬, ৯৯-২০০০, ২০০১-২০০২, ২০০৫-২০০৬, ২০০৭-২০১০) ১৪ বছর নির্বাচিত সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

আলোকিত সমাজে মুকতাবিস-উন-নূর একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। যার সততা, নিষ্ঠা ও সত্য বলার সৎ সাহস সত্যিই অনুকরনীয়। নির্ভীক ও নির্মোহ এই দুটি শব্দ তার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মানে সচেতন ও দ্বায়িত্বশীল সম্পাদক হিসেবে তিনি সকল মহলে সমাদৃত। তার পরিচ্ছন্ন সমাজচিন্তা ও ক্ষুরধার লেখনি আমাদের অনুপ্রানিত করে।

মুকতাবিস-উন-নূর সম্পাদিত দৈনিক জালালাবাদে আমরা একঝাক তরুন কাজ করেছি। শতভাগ সঠিক সংবাদ প্রচারের জন্য তিনি আমাদের উৎসাহিত করতেন। বলতেন, সততা একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় গুণ। অনেক যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকলেও সততার অভাবে অর্জিত সম্মান ধুলোয় মিশে যেতে পারে। এটা তার সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশবিশেষ, বিশেষ ভূষণও বটে।

মুকতাবিস-উন-নূর যখন সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের চেয়ারম্যান তখন আমি সংলাপের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রেসক্লাবেও তার সাথে নির্বাহী পরিষদ সদস্য হিসেবে তারুণ্যের উদ্যম আর উদ্ভাবনী চিন্তা ধারায় কাজ করেছি। নুর ভাইয়ের তাৎক্ষনিক লেখা ছড়া ও কবিতায় আমরা মুগ্ধ হতাম। অনিকেত বৃত্তির বিপক্ষে সত্য ও সুন্দরের স্বপক্ষে নতুন লেখিয়েদের গড়ে তোলার জন্য তার নেতৃত্ব ও প্রানান্ত প্রয়াস আমাদের সামনের পথে এগিয়ে যেতে সাহস যোগায়।

মুকতাবিস-উন-নূর জন্মগ্রহণ করেছেন সিলেটের ভার্থখলায় ১৯৬০ সালের ২০ জুন। তিনি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম মাওলানা ইব্রাহিম আলীর ছোট ছেলে। মা মরহুম জহুরুন নেছা। দাদা মুনশি এলাহি বখশ ইসলামি চিন্তাবিদ ছিলেন। হজরত শাহজালাল (র) এর তিনশ ষাট আউলিয়ার অন্যতম হজরত কুতবুল আলম হলেন তার পূর্বপুরুষ। দাদা মুনশি এলাহি বখশ দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারে বসবাস করতেন। কুতুবপুরের মাজার বাড়ি ছিল মুনশি সাহেবের বসতভিটা। এখান থেকে স্থানান্তর হন বিশ্বনাথের আতাপুর গ্রামে।

দৈনিক জালালাবাদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত অনলাইন দৈনিক সময়ের প্রধান সম্পাদক মুক্তাবিস-উন-নুর একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবি। তিনি সিলেটে মানবসেবায় অনন্য প্রতিষ্ঠান ইকরা প্রতিবন্ধী শিশু হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থা ইকরা ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান। এছাড়া ইসলামিক ব্যাংক ফাউন্ডেশন সিলেটের সভাপতি, কুদরাত উল্লাহ জামে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি, ফুল কুড়ি আসর ও সিলেট সংস্কৃতি কেন্দের সহ-সভাপতি, কবি দিলওয়ার পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মুকতাবিস-উন-নূর রচিত বহুল প্রত্যাশিত ‘সময়-অসময়’ এবং ‘আমার দেখা সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান’ গ্রন্থ দুটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। প্রথম গ্রন্থে রয়েছে ওয়ান-ইলেভেনের নানা ঘটনা এবং দ্বিতীয় গ্রন্থে বাংলাদেশের খ্যাতিমান দুই রাজনীতিককে নিয়ে স্মৃতিচারণ।

‘সময়-অসময়’ গ্রন্থটির পাতায় পাতায় রয়েছে উত্তেজনা। লেখকের নির্মোহ ভাষায় সুনিপুণ উপস্থাপনা সত্যিই অসাধারণ। তিনি দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একেবারে কাছ থেকে দেখেছেন। মিশেছেন কিংবদন্তীতূল্য ব্যক্তিদের সাথে। তার স্মৃতিচারণমূলক দু’টি গ্রন্থই ইতিহাসের উপাদান হিসেবে অম্লান হয়ে থাকবে। স্মৃতিগুলো গ্রন্থবদ্ধ হওয়ায় তা কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়ার শংকা থেকে রক্ষা পেলো। এগুলো নতুন প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাবে।

‘সময়-অসময়’ ওয়ান-ইলেভেনের লোমহর্ষক ঘটনা প্রবাহের খন্ড চিত্র। লেখক-সংগঠক ও দৈনিক জালালাবাদ সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর তখন সিলেট্ প্রেসক্লাবের সভাপতি আর দৈনিক সিলেট প্রতিদিন সম্পাদক আহমদ নুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। এই দুই নুরের সাথে ঘটে যাওয়া মর্মস্পর্শী লাঞ্চনা ও গঞ্জনার এক অজানা ইতিহাস ‘সময় অসময়’ ।

সত্য কথন, ভাষাশৈলী ও সাবলীল উপস্থাপনায় বইটি ইতিহাসের এই কঠিন সময়ের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে অনন্তকাল। সেই সাথে গ্রন্থের লেখক মুকতাবিস উন নূর সত্য ও সাহসিকতার সাথে মাথা উচু করে দাড়াবার জন্য নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। ‘সময় অসময়’ সিলেটের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি মাইল ফলক হিসেবেই বিবেচিত।

মুকতাবিস উন নুর রচিত আমার দেখা সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান গ্রন্থটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিপরীত মেরুর দুই বিশাল ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা এক অসাধারণ গ্রন্থ। জাতীয় ক্ষেত্রে বরেণ্য সিলেটের দুই কৃতি পুরুষের জীবনের অনেক না জানা তত্ব ও তথ্যের সমাহার ঘটেছে কালজয়ী এই ইতিহাস গন্থে। টুকরো টুকরো স্মৃতিচারণ মূলক বর্ণনায় এক ভিন্ন রকম সাহিত্যের স্বাদ আস্বাদন করা যাবে বইটিতে।

সামাদ আজাদ ও সাইফুর রহমান দুই কিংবদন্তী পুরুষের নাম৷ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুজনই সফল মন্ত্রী ছিলেন। মানুষ, মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশের মানুষের মনে আত্মপরিচয়ের আকাংথা নতুন করে জাগিয়ে দেয়ার সাধনায় ব্রতী ছিলেন। গনতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে সামাদ আজাদ রাজনীতির জটিল ছক কষে নানামুখী কৌশল গ্রহন করলেও ব্যক্তিগত জীবনে খুবই অমায়িক ও হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। সাইফুর রহমান রাজনীতির মারপ্যাচ অংক কষে রপ্ত না করলেও উন্নয়নের রাজনীতিকে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মননে গেঁথে দিয়েছেন।

দক্ষ সম্পাদক ও মেধাবী সাংবাদিক মুকতাবিস উন নুর বরেণ্য এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সামগ্রীক কর্মকান্ড, ব্যক্তিগত জীবনবোধ ও চিন্তা-ভাবনাকে সুক্ষ দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন এবং সুনিপুন বর্ণনায় হৃদয়গাহী করে তুলে ধরেছেন। ছয় ঋতুতে যত রকমের রূপ রং আর গন্ধে মন ভরানো চোখ জুড়ানো ফুলের বাহার থাকে- এই দুই মনিষার জীবন থেকে সবই তিনি আহরণ করেছেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল লিখেছেন … আমি এই যায়গাটিতে মুকতাবিস-উন-নূরের প্রতি একটু পেশাগতভাবে ঈর্ষাকাতর হচ্ছি; কারণ আমাদের জাতীয় রাজনীতির এই দুই প্রাজ্ঞজনের সাথে আমার বা আমার মত অনেক সাংবাদিকের ঘনিষ্টতা কম নয়, কিন্তু তা এতটা আস্হা বা নির্ভরতার জায়গায় পৌছায়নি যতটা হয়েছে মুকতাবিসের বেলায়।

শতবর্ষের সাংবাদিকতার স্মারক প্রতিষ্ঠান সিলেট প্রেসক্লাবে প্রায় ১৫ বছর পর নুর ভাই আবার সভাপতি হয়েছেন। মাঝখানে প্রেসক্লাবে বিভক্তি ঘটেছে দেখে প্রবাস থেকে কষ্ট পেয়েছি। আশা করি সেই আগের মতো আবারো সিলেটের সকল পেশাজীবী সাংবাদিকদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে আমাদের প্রিয় প্রেসক্লাব।

সাঈদ চৌধুরী দৈনিক সময় ও মানব টিভি সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *