* ২০২৫ সালে ৩৪ বাংলাদেশী খুন, ৩৮ জন গুলিবিদ্ধ * ১৪ জন অপহরণ ও ২৪৩৬ জনকে পুশইন
আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
সারা বছর বছরজুড়ে (২০২৫ সাল) সিলেটসহ দেশের ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তে হত্যা, গুলি, অপহরণ ও পুশইনের তাণ্ডব চালিয়েছে ভারত। এ সময়ে ভারতীয় বিএসএফ ও সশস্ত্র খাসিয়াদের গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩৪ জন নিরীহ বাংলাদেশী। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বাংলাদেশের ৩৮ জন নাগরিক। এ বছরে ভারতীয়রা ১৪ বাংলাদেশীকে অপহরণ করলেও চারজন ভাগ্যক্রমে ফিরে এসেছেন। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ভারতীয়রা দুই হাজার চার শ’ ৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে।
সিলেটের তিন শ’ কিলোমিটার জুড়ে ছিল তাদের বিশেষ টার্গেট। এক বছরে শুধু সিলেট সীমান্ত এলাকায় ভারতের গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৩ জন বাংলাদেশী। সাম্প্রতিক পুশইনের ৭০ শতাংশ ঘটনাও ঘটেছে সিলেটে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সীমান্ত সূত্রগুলো থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও ভারতের নাগরিকদের হাতে বাংলাদেশীদের হত্যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। গত বছর সীমান্তে ৩৪ বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলের সীমান্তেই ১৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
বিজিবির একজন শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতি বছরই সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয় প্রতিবেশী দেশটি। কিন্তু তারা কখনো কথা রাখে না
২০২৫ সালে সিলেটসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা, ভারতীয় ও বাংলাদেশী নাগরিককে বাংলাদেশের বর্ডারের ভেতরে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশী নিহত হন, এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের ফলে মারা যান। আগের বছরগুলোতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২০২৪ সালে ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮। এ ছাড়া ২০২৫ সালে সিলেট সীমান্ত এলাকায় ভারতের নাগরিকদের, বিশেষ করে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের হাতে অন্তত ১৩ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন।

আসকের তথ্য অনুযায়ী, একই বছরে আরো অন্তত ৩৮ জন বাংলাদেশী গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হন এবং ১৪ জনকে বিএসএফ অপহরণ করে, যাদের মধ্যে মাত্র চারজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে ভারত কর্তৃক ‘পুশইন’-এর ঘটনায়। বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ভারত অন্তত দুই হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে, যাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গারাও রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় ড্রোন উড়ানো, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা দুই দেশের সম্পর্ক এবং সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। চার হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তে টানা প্রাণহানির ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের মধ্যে।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান গণমাধ্যমকে বলেছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে গুলি করে মারার জন্য ভারতের বাহিনীর যে আনন্দ, তা উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অবশ্যই এ বিষয়ে দাঁড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি ব্যবস্থায় ভারতের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশের মামলা করা উচিত। কারণ বাংলাদেশের মানুষ যদি ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে যায়, তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সমর্পণ করবে। দুই দেশের মধ্যে এটি নিয়ে চুক্তিও আছে। নির্বিচারে গুলি করে মারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এ জন্য ভারতকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
তিনি বলেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর মদদে বিএসএফ গুলি করে শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ, কৃষক-শ্রমিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে হত্যা করেছে। পৃথিবীর কোনো সীমান্তে এমন নির্বিচারে হত্যার উদাহরণ নেই। ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমকে মদদ দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই ভাষা কিন্তু পাল্টে গেছে।
শেখ হাসিনা এখন ভারতে পালিয়ে থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে বিএসএফ প্রতিনিয়ত ভারতীয় জনগণকে উত্তেজিত করে সীমান্তে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করছে। আমরা যখন বেড়া তৈরি করতে যাচ্ছি বাধা দিচ্ছে, আমাদের সীমানায় স্থাপনা নির্মাণেও বাধা দিচ্ছে। এক ধরনের উসকানির মধ্যে তারা যাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডও অব্যাহত রেখেছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) মো: শামীম কামাল বলেছেন, সীমান্তে আমাদের দেশের মানুষ যখন বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় তখন তা কেবল একটি মৃত্যু নয়, তখন তা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। আমরা কারো সাথে বৈরিতা চাই না কিন্তু বন্ধুত্বের নামে সীমান্তে লাশের মিছিলও মেনে নেব না। বিএসএফকে আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন সময় এসছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার।

