দেশপ্রেম ও সংগ্রামের অবিস্মরণীয় মহাকাব্য বেগম খালেদা জিয়া : আবদুল হাই শিকদার

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

সকালের আলো তখনো ফোটেনি। গাঢ় কুয়াশা আর হাড় হিম করা শীতের নিচে জবুথবু দেশের মানুষের ঘুম তখনো ভাঙেনি। গেরস্তবাড়ির মোরগ চিৎকার করে উঠল- জাগো, ওঠো, তোমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়নেত্রী, দেশনেত্রী, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া চলে যাচ্ছেন। শোকে, কষ্টে ককিয়ে উঠল ভোরের দোয়েল। হৃদয়কে দলিত, মথিত করা সেই আর্তনাদ আছড়ে পড়ল শহীদ মিনারে, জাতীয় স্মৃতিসৌধে। শহর-বন্দর-গ্রাম-প্রান্তর পেরিয়ে-১৮ কোটি মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। আকাশ, বাতাসকে হাহাকারে ভরিয়ে তুলল-সর্বস্বহারা রোদন-ধ্বনি, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আর নেই।

জাতির দুঃসময়ের কান্ডারি, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক, হাঙরের, কুমিরের ঢেউয়ের বিরুদ্ধে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ টালমাটাল দুঃসময়ের বিরুদ্ধে অনন্য সাধারণ অবিস্মরণীয় সংগ্রামের আপসহীন মহানায়ক বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন।

এমন অনেকবারই তো হয়েছে, তিনি অসুস্থতাকে জয় করে আবার ফিরে এসেছেন তার আত্মার চেয়ে প্রিয় জনগণের কাছে। সবাই ভেবেছিল, এবারও হয়তো তেমনই হবে। কিন্তু না, ডাক্তারদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পরম দয়াময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর কাছে চলে গেলেন তিনি।

দেশ ও জাতির চরম ক্রান্তিকালে যখন তার মতো মহিমাময়ী অভিভাবক, মমতাময়ী মায়ের সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, সেই সময় পুরো জাতিকে শোক আর অশ্রুর সাগরে ভাসিয়ে দেশমাতা যাত্রা করেছেন সেই অনন্ত অসীমের পথে।

মহামানবরা ইতিহাসের সৃষ্টি, আবার তারাই সৃষ্টি করেন ইতিহাস। দেশ ও জাতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেন বিরামহীন সংগ্রামে। তাদের সংগ্রাম, তাদের লড়াই, তাদের অবদানে ইতিহাস মুক্তির ছন্দে দুলে ওঠে। নিজকে তিলে তিলে শেষ করে তারা জগতকেই নতুন আলোয় উজ্জ্বল করে তোলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির মানচিত্রে বেগম খালেদা জিয়া এমনই এক নাম। তার জীবনটা এক মহাকাব্যিক দ্যোতনাময় আর অকুতোভয় সংগ্রামের সংমিশ্রণ। তিনি শুধু লড়াই করেননি, জয়ও ছিনিয়ে এনেছেন। খালেদা জিয়া মানে শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, খালেদা জিয়া মানে পুরো বাংলাদেশ। ইতিহাসের পাতায় তার নাম লেখা থাকবে এমন এক রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে, যিনি হার মানতে শেখেননি। প্রতিকূলতার ঝড়ে তার আঁচল বারবার উড়েছে আশা, আস্থা ও আশ্বাসের নির্ভার পতাকা হয়ে। অন্যরা স্বার্থের কাছে, ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন সব অকল্যাণের বিরুদ্ধে অটল, অবিচল, নিঃশঙ্ক অভ্রংলিহ মিনার।

তাই তো তার না-ফেরার দেশে চলে যাওয়াটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তার এই প্রস্থান শুধু একটি দলের শীর্ষ নেত্রীর বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আপসহীন অধ্যায়ের অবসান। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি যেমন ইতিহাস গড়েছিলেন, তেমনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তার অবিস্মরণীয় ভূমিকা তাকে ভূষিত করেছিল ‘আপসহীন নেত্রী’ ও ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে। তার মৃত্যুতে জাতি আজ শোকাচ্ছন্ন; টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আজ এক গভীর শূন্যতায় স্তব্ধ। যে মানুষের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা তিনি অনুভব করেছেন গভীর সহানুভূতির সঙ্গে, যে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি উৎসর্গ করে গেছেন তার জীবন, সেই মানুষ আজ কাঁদছে।

খালেদা জিয়া-যার কণ্ঠে ছিল সাহস ও দৃঢ়তা, চোখে ছিল আত্মমর্যাদা। রাজপথের উত্তাপ, সংসদের বিতর্ক, প্রতিকূল সময়ের চাপ-সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজেকে পাহাড়ের মতো স্থির রেখেছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতির নিষ্ঠুরতা তাকে আঘাত করেছে, তার সন্তানদের ওপর চালানো অবর্ণনীয় নির্যাতনে তার রক্তক্ষরণ হয়েছে, বন্দিত্ব তাকে বেদনার্ত করেছে, অসুস্থতা তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল করেছে, কিন্তু দেশ ও জাতির প্রতি অঙ্গীকার থেকে তাকে এক ইঞ্চিও সরাতে পারেনি; তার মনোবলে সামান্যতম চিড়ও ধরাতে পারেনি। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের দীর্ঘপথে তিনি যে ধারণাতীত ত্যাগ স্বীকার করেছেন-তা এককথায় অনন্য, অতুলনীয়।

বেগম খালেদা জিয়ার না-ফেরার দেশে যাওয়াটা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ এক গভীর সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ফলে তার শূন্যতা রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতি পদে অনুভূত হবে, সন্দেহ নেই। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, ফ্যাসিস্টবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রাম-প্রতিটি মোড়ে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। গত শতকের আশির দশকে যখন দেশের গণতন্ত্র অবরুদ্ধ ছিল, তখন তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। দলের চরম সংকটে হাল ধরে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নেতৃত্বের জন্য শুধু বংশীয় পরিচয় নয়, বরং সাহসিকতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই প্রধান শক্তি। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে প্রধান শক্তিই ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৯ বছরের সেই আন্দোলনে তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন, গৃহবন্দি হয়েছেন; কিন্তু ক্ষমতার মোহ বা ভয়ভীতির মুখে কখনোই স্বৈরশাসকের সঙ্গে হাত মেলাননি, অপশক্তির সঙ্গে আপস করার কথা চিন্তাও করেননি। তার এ দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তিনি দেশবাসীর কাছে হয়ে ওঠেছিলেন ‘দেশনেত্রী’।

পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। সমাজকে তিনি বুঝতেন, জানতেন। তাই কী প্রয়োজন, কী করণীয়, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন শঙ্কাহীন চিত্তে। নারী শিক্ষা প্রসারে ছাত্রীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা ছিল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ, যা আজ বাংলাদেশের নারী জাগরণের ভিত্তি হিসাবে স্বীকৃত। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বলয় তৈরিতে তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আনে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় কারাবাস, অন্তরীণ অবস্থা এবং অসুস্থতাকে সঙ্গী করেও তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শ থেকে কখনই বিচ্যুত হননি। সে কারণেই বর্তমানের এই সংকটময় মুহূর্তে তার মতো একজন অভিজ্ঞ ও সর্বজনমান্য অভিভাবকের শূন্যতা রাজপথ থেকে সংসদ-সবখানেই অনুভূত হবে। বিশেষ করে, জাতীয়তাবাদী শক্তির মূল স্তম্ভ হিসাবে তিনি যেভাবে কোটি কোটি মানুষের আস্থার স্থল ছিলেন, সেই জায়গাটি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তিনি ছিলেন এমন একজন নেত্রী, যার একটি ডাক টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অনুরণিত হতো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন রাজনৈতিক বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়া হচ্ছে, তখন তার অভাব আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। আপসহীন নেত্রীর এ অনুপস্থিতি শুধু বিএনপির জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি।

বেগম খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছেন; কিন্তু তিনি রেখে গেছেন তার অপরাজেয় অনুপ্রেরণার আদর্শ ও ইতিহাস। তার রাজনৈতিক জীবন আমাদের শেখায়, ক্ষমতা বা জেল-জুলুমের চেয়ে মানুষের ভালোবাসাই বড় শক্তি। ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এ স্লোগানকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি যেভাবে সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, তা আগামীর তরুণ প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে দেশপ্রেমের এক পাঠ্যবই। তিনি শিখিয়েছেন, কীভাবে পরাজয়ের গ্লানিকে শক্তিতে রূপান্তর করে জনগণের পাশে থাকতে হয়।

প্রতিহিংসা নয়, বরং দেশের স্বার্থে অবিচল থাকার যে দীক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা-ই হবে আগামীর রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। দেশ ও মানুষের জন্য তিনি যা করেছেন, সমকালীন ইতিহাসে তা বিরল। বাংলাদেশের মানচিত্র আর লাল-সবুজ পতাকার স্পন্দনে বেগম খালেদা জিয়ার নাম চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। ইতিহাসের পাতায়, মানুষের হৃদয়ে, সংগ্রামের মানচিত্রে খালেদা জিয়া রয়ে যাবেন জাতির সম্মান, মর্যাদা ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে। তার রাজনৈতিক দর্শন ধ্রুব তারকার মতো চিরকাল এ জাতিকে জোগাবে আলো ও অনুপ্রেরণা। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন এবং এই শোক কাটিয়ে উঠতে জাতিকে ধৈর্য দান করুন। যুগান্তর পরিবারের পক্ষ থেকে তার প্রতি রইল গভীর ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

আবদুল হাই শিকদার দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক. বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি, সাংবাদিক ও গবেষক, নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *