‘আমি একজন যুদ্ধবন্দি’- আদালতে নাটকীয় শুনানির সময় বললেন মাদুরো

সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

প্রথমবারের মতো নিউ ইয়র্ক সিটির আদালত কক্ষের দরজায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণ আগে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর পায়ে বাঁধা শিকলের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এরপরই তিনি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো সাংবাদিক এবং জনসাধারণের উদ্দেশে উপস্থিত হয়ে বলেন, তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে।

আদালত কক্ষে প্রবেশের কয়েক মিনিট পরই, বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টেইন মাদুরোকে তার পরিচয় নিশ্চিত করতে বলেন যাতে বিচার শুরু করতে পারেন। “আমি, স্যার, নিকোলাস মাদুরো। আমি ভেনেজুয়েলা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এবং আমি তেসরা জানুয়ারি থেকে অপহৃত হয়ে এখানে আছি,” একজন দোভাষী আদালতের জন্য অনুবাদ করার আগে বেশ শান্তভাবেই আদালতে স্প্যানিশ ভাষায় এ কথা বলেন তিনি।

“ভেনেজুয়েলার কারাকাসে আমার বাড়ি থেকে আমাকে বন্দি করা হয়েছিল,” বলেন মাদুরো। ৯২ বছর বয়সী বিচারক দ্রুত মাদুরোকে বলেন, “এসব বিষয়ে আলোচনা করার জন্য একটি সময় এবং একটি জায়গা থাকবে।”

সোমবার বিকেলে ৪০ মিনিটের নাটকীয় এই বিচার চলাকালীন, মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। “আমি নির্দোষ। আমি একজন ভদ্র মানুষ,” বলেন মাদুরো। তার সঙ্গে ফ্লোরেসও দাবি করেন, তিনি “সম্পূর্ণ নির্দোষ”।

শনিবার ভেনেজুয়েলায় নিজেদের কম্পাউন্ড থেকে মার্কিন বাহিনী তাদের গ্রেফতারের পর ৬৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এবং তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। রাতভর এক আকস্মিক অভিযানের অংশ হিসেবে সেদিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছিল।

নীল ও কমলা রঙের জেল শার্ট এবং খাকি প্যান্ট পরা মাদুরো ও তার স্ত্রী দুজনই শুনানির সময় স্প্যানিশ অনুবাদ শোনার জন্য হেডফোন পরেছিলেন। তাদের মাঝখানে একজন আইনজীবী বসে ছিলেন। মাদুরো একটি হলুদ লিগ্যাল প্যাডে সূক্ষ্মভাবে নোট লিখেছিলেন যেটি শুনানির পরে নিজের সাথে যাতে রাখতে পারেন তা বিচারককে নিশ্চিত করতে বলেছিলেন।

ঠিক সেই একই ফেডারেল আদালত কক্ষেই আমেরিকান র‍্যাপার শন ‘ডিডি’ কম্বসের বিচার হয়েছিল এবং মাত্র কয়েক মাস আগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, মাদুরো যখন সেই কক্ষে প্রবেশ করলেন তখন তিনি দর্শকদের কয়েকজনের দিকে মাথা নাড়িয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে ঘুরে দাঁড়ালেন।

বিচার চলাকালীন এই শান্ত এবং অভিব্যক্তিহীন আচরণ বজায় রেখেছিলেন মাদুরো। এমনকি শেষের দিকেও, যখন জনসমাগমস্থল থেকে একজন ব্যক্তি হঠাৎ চিৎকার করে বলেন, মাদুরোকে তার অপরাধের জন্য ‘মাশুল’ দিতে হবে তখনও শান্তই দেখা গেছে তাকে।

স্প্যানিশ ভাষায় দর্শকদের সামনে থাকা লোকটির দিকে মাদুরো এ সময় চিৎকার করে বলেন, “আমি একজন প্রেসিডেন্ট এবং যুদ্ধবন্দি”। এরপর ক্রন্দনরত লোকটিকে ওই কক্ষ থেকে বের করে আনা হয়। বিচারিক কার্যক্রমটি আদালতের অন্যদের জন্যও আবেগঘন ছিল।

মাদুরোর প্রশাসনের খবর সংগ্রহ করেছেন ভেনেজুয়েলার এমন একজন প্রতিবেদক মাইবোর্ট পেটিট বলেছেন, মাদুরোকে গ্রেফতারের সময় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কারাকাসের ফুয়ের্তে তিউনার কাছে তার পারিবারিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মিজ পেটিট বলেছিলেন, তার সাবেক নেতাকে কারাগারের পোশাক পড়া অবস্থায় মার্কিন মার্শালদের আদালতে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অবাস্তব ছিল।

মাদুরোর স্ত্রী ফ্লোরেস অনেক বেশি শান্ত ছিলেন, তার চোখের কাছে ব্যান্ডেজ এবং কপালে ব্যান্ডেজ ছিল। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সপ্তাহের শেষে তাদের গ্রেফতারের সময় যে আঘাত পেয়েছিলেন তার জন্য চোখ ও কপালের এই অবস্থা।

সোনালী চুল খোঁপা বাঁধা ছিল ফ্লোরেসের। মৃদুস্বরে কথা বলছিলেন তিনি যখন তার আইনজীবীরা তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। এর মধ্যে সম্ভাব্যভাবে আঘাতপ্রাপ্ত পাঁজরের এক্স-রে এবং একটি ফ্র্যাকচারও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মাদুরো ও তার স্ত্রী শুনানি চলাকালীন সময়ে জামিনের আবেদন করেননি। তবে পরবর্তী সময়ে তা করতে পারেন, যেটির অর্থ এখন তারা ফেডারেল হেফাজতে থাকবেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, মেশিনগান এবং ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগান এবং ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে।

মাদুরোর সাথে তার স্ত্রী, ছেলে এবং আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে। আগামী ১৭ মার্চ এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করেছে আদালত। বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *