আল মাহমুদের সোনালি কাবিন ।। ড. ফজলুল হক তুহিন

শিল্প-সংস্কৃতি সাম্প্রতিক
শেয়ার করুন

এক.

আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬-১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম কবি। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বশেষ বড় কবির নাম। বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান, মৌলিক ও প্রতিনিধিত্বশীল কবি। আল মাহমুদ মানেই বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি ও প্রতিচ্ছবি। জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদ্দীনের পর ‘বাংলার কবি’ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পাঠকপ্রিয় ও প্রভাবশালী তিনি। তাঁর শ্রেষ্ঠ ও অমর কৃতি ‘সোনালী কাবিন’; বাংলা সাহিত্যে একটি অনিবার্য অধ্যায় এবং বাংলা কবিতায় স্পষ্ট বাঁক। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্য। এই একটি কাব্য কবিকে করেছে খ্যাতিমান। কবি প্রায় সাত দশকব্যাপী বাংলা সাহিত্যকে করেছেন ঐশ্বর্যমণ্ডিত।

আল মাহমুদের কবি পরিচয়ের সঙ্গে একজন শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক, সৃজনশীল প্রাবন্ধিক, সফল শিশুসাহিত্যিক, প্রভাবশালী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে আল মাহমুদ এককথায় অসাধারণ ও অসামান্য ব্যক্তিত্ব। তবে সবচেয়ে বড় পরিচয় আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতায় একজন মৌলিক এবং ঐতিহ্যবাদী কবিপ্রতিভা। সেইসঙ্গে কবি হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধি।

আল মাহমুদের আবির্ভাবের পূর্বাপর সময় বাস্তবতা ও বিবর্তনের সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর ইতিহাস জড়িত। আধুনিক বাংলা কবিতার সূচনা ও বিকাশধারা ভারতের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন, উপনিবেশিক কাঠামোয় পশ্চিমের ভাবাদর্শ ও সাহিত্য-প্রকরণের প্রভাব এবং জনমানসের আন্তঃসম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। উনিশ শতকে উপনিবেশিক আবহাওয়ায় বঙ্গীয় নবজাগৃতি, প্রথম মহাযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, দমন-পীড়ন, দাঙ্গা, মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদি এবং পাশ্চাত্য দর্শন, সাহিত্যান্দোলন ও সাহিত্যাদর্শের হাওয়া বাংলা কবিতার মূলস্রোতকে বিচিত্রগামী, সমৃদ্ধ ও প্রভাবিত করে। উপমহাদেশের এক উত্তাল সময়ে কবির আবির্ভাব।

“আমার কৈশোর কালটা কেটেছে বৃটিশ আমলে, একটা অংশ বৃটিশ আমলে কেটেছে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন, দেশ ভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ থেকে বাংলাদেশের উদ্ভব পর্যন্ত যে সময়টা আমি কাটিয়েছি সেটা একটা দুর্বহ জীবন। আমাদের ওপর দিয়ে গেছে বিশেষ করে পঞ্চাশ দশকের যারা কবি তাদের ওপর দিয়ে একটা দুর্বহ সময় বয়ে গেছে। তারা দেখেছে দাঙ্গা, ভ্রাতৃহত্যা, দেশভাগ, একটা স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যে কতগুলো ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা এসেছে, এতে তাদের মধ্যে একটা জিনিস তৈরী হয়েছে, সেটা কি? পঞ্চাশ দশকের কবিতার মধ্যে যাকে বলে স্বপ্ন, স্বপ্ন কম। রূঢ় বাস্তবতার কবিতা। পঞ্চাশের কবিরা, আসলে এক রূঢ় বাস্তবতা পার হয়ে আমরা এসেছি। আল মাহমুদও বাস্তবতারই এক কাহিনী।” (১)

সময় বাস্তবতার ভেতর দিয়েই কবির আত্মপ্রকাশ। দেশবিভাগের শক্ত বাঁধ এই ধারাকে কলকাতা ও ঢাকা এই দুটি স্রোতে প্রবাহিত করে। বায়ান্নোত্তর বাংলাদেশের কবিতা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিঘাতে অর্জন করে স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। আল মাহমুদের কবিতা একুশের ভাষা ও জাতীয়তা ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, চেতনা ও স্বরূপ প্রকাশের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করে। দৈশিক ও বৈশ্বিক পালাবদলের প্রেক্ষিতে আবহমান বাংলার গ্রামীণ সভ্যতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অনার্য বাঙালি নর-নারীর সম্বন্ধসূত্র, জীবিকানির্ভর প্রকৃতি, নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের জীবনচাঞ্চল্য, বিশ্বাসের বৈভব, স্বদেশের মুক্তিসংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের সন্ধান, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, লোকসংস্কৃতির অন্তর্বয়ন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাব, বিশ্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নিজস্ব আঙ্গিক তাঁর কবিতাকে করেছে অনন্য, বাংলা সাহিত্য হয়েছে সমৃদ্ধ। তাঁর কবিতার বিষয়ে বৈচিত্র্য অর্জিত হয়েছে কাব্যিক সুষমায় এবং কবিতার ভাববস্তু নির্মিত হয়েছে শৈল্পিক উৎকর্ষে। তাঁর কবিতার শিল্পলোকে সার্বক্ষণিক বিরাজ করেছে স্বাধীন মনোভাব এবং উত্তর-উপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। এই মনোভঙ্গির আলোকে তাঁর কবিতার ভাব, ভাষাশৈলী ও গন্তব্য নির্ণিত হয়েছে।

মানুষের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে কবিতা অন্যতম প্রধান শিল্পকর্ম। কবিতায় মানুষের চিন্তা, চেতনা, আবেগ, দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনা, দর্শন, আদর্শ, সৌন্দর্য, বিশ্বাস ইত্যাদি অর্থাৎ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কবিদৃষ্টি শিল্পময় হয়ে প্রকাশিত। প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্য বলতে কবিতাকেই নির্দেশ করে। আধুনিককালে কবিতা আধুনিক মানুষের মতো বিচিত্রগামী, পরিবর্তনশীল ও জীবনবাদী। উনিশ শতকে পাশ্চাত্য প্রভাবে ‘বঙ্গীয় নবজাগৃতি’র ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি সমাজে, ব্যক্তির মননে, ভাবনায়, জীবনদর্শনে ও সাহিত্যাদর্শে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। এই নতুন প্রেক্ষিতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩) আধুনিকতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা, কবিতায় বন্ধনমুক্তি, বিচিত্র আঙ্গিকের সৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম আধুনিক কবি হয়ে আছেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা কবিতায় সার্বিক সুসম্পন্নতা নিয়ে আসেন। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের আনন্দময় এক ভুবন নির্মাণে তিনি আজীবন একজন উদারনৈতিক মানবতাবাদী হিসেবে সৃষ্টিশীল সাধনায় মগ্ন থেকেছেন। অন্যদিকে পরাধীন ভারতে আত্মজাগরণ, আত্মমুক্তি ও ব্রিটিশ রাজশক্তির শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতা ও চির-অবনত মানবের জাগরণে বিদ্রোহের অগ্নিবীণা হাতে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) নতুন কাব্যলোক সৃজন করেন।

তিরিশোত্তর কালে জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৬), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪), বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২) প্রমুখ কবি রবীন্দ্র-জগতের বাইরে অন্য এক কাব্যধারা নির্মাণ করেন যা মৌলিকত্বে, বৈচিত্র্যে ও পশ্চিমাদর্শে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে একই সময়ে জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৬) লোকঐতিহ্যের ধারায় আবহমান বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির রূপায়ণে শৈল্পিক দক্ষতা ও দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। চল্লিশের দশকে দৈশিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতা, মানবিকতার বিপর্যয় ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কবিতায় নতুন প্রবাহ সৃষ্টি করে। তবে সাতচল্লিশের দেশবিভাগ কবিদের দুটি পৃথক দেশে বিভক্ত করে দেয়। ক্রান্তিকালীন সমাজ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় ও লেখকদের অধিকাংশ পূর্ব-পাকিস্তানে চলে আসেন। ঢাকাকেন্দ্রিক কাব্যচর্চা বেগবান হতে থাকে নবসৃষ্টির প্রেরণায়। কিন্তু ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধ ও সংঘাত থেকে জন্ম নেয় নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনা ও উদ্দীপনা। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ কাব্য সংকলন এই নতুন সময় ও কবিমানসের রক্তাক্ত দলিল। তাই বায়ান্নোত্তর পূর্ববাংলার কবিতা অর্জন করেছে প্রাতস্বিক চারিত্র্য ও রূপকল্প। ষাটের দশকে এই কাব্যস্রোত বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ে আরো বেগবান ও বিস্তৃত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাকে পূর্ণতার মোহনায় পৌঁছে দেয়।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। পাশ্চাত্য প্রভাবিত তিরিশোত্তর কাব্যাদর্শের মাঝে কবি আল মাহমুদের কাব্যসৃষ্টি নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। কাব্যযাত্রার সূচনা প্রভাবিত কাঠামোর ভেতর হলেও অচিরেই কবি ঔপনিবেশিক চিন্তা ও কাব্যচর্চার বিপরীতে স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেন। ফলে তাঁর কবিতা বাংলাদেশের সাহিত্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ও বৈচিত্র্য সৃজনে সাহসী ভূমিকা রাখে। আঙ্গিকের বড় ধরনের বদল না ঘটলেও বিষয়বৈচিত্র্যে, ভাষাশৈলী বা শব্দব্যবহারে স্বতন্ত্র স্বাক্ষর দৃশ্যমান। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রূপান্তর, নদীকেন্দ্রিক জনপদ, চরাঞ্চলের মানুষ ও প্রকৃতি, আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লৌকিক দর্শন ও সংস্কার, স্বাদেশিকতা ও রাজনৈতিক চৈতন্য নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়। বিশেষভাবে আধুনিক কবিতার ইমারতে লৌকিক উপাদানের শৈল্পিক কারুকাজ কবিকে আত্মআবিষ্কার, ঐতিহ্য-অন্বেষা ও বি-উপনিবেশায়নের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। সেইসাথে দীর্ঘ কাব্যযাত্রায় কবি বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন অনন্য উচ্চতায়।

বাংলা অঞ্চলে উপনিবেশের অধীনে সম্পন্ন উনিশ শতকের জাতীয়তাবাদী রেনেসাঁ থেকে তিরিশোত্তর আধুনিকতাবাদী সাহিত্যধারা পর্যন্ত বাংলা কবিতা প্রধানত পশ্চিমাকরণের পথে বিস্তৃত ও প্রবাহিত হয়। শেকড় ও স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলা আধুনিকতা বা পশ্চিমা সভ্যতা থেকে বি-উপনিবেশায়নের পথে অগ্রসর হয়ে কবি আল মাহমুদ আমাদের নিয়ে আসেন আবহমান গ্রামীণ সভ্যতায়। তাঁর কবিতাকে আধুনিকতাবাদী কবিতার বিপরীতে এভাবে সূত্রাবদ্ধ করা যায়: জাতি প্রশ্নে কবি আর্য নয় অনার্য; বর্ণে সাদার বদলে শ্যামলা/কালো; সামাজিকতায় একাকী নয় যূথবদ্ধ; ভাষার ক্ষেত্রে সংস্কৃতবহুল প্রমিত বাংলার বদলে লোকজ শব্দাবলী/বাক্ভঙ্গি; সংস্কৃতিতে পশ্চিমাচ্ছন্ন/নাগরিক নয় গ্রামীণ/লোকজ; সভ্যতা নির্মাণে পশ্চিমা আধুনিকতার বদলে আবহমান গ্রামীণ সভ্যতা; উৎপাদন ও বণ্টনে শোষণমূলক/পুজিঁবাদী নয় সাম্যবাদী/সুষম বণ্টনে আস্থা; নারীর প্রশ্নে অনার্য গ্রামীণ/খনার প্রতীক; রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে স্বাধীন/জাতীয়তাবাদী; বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোকেন্দ্রিকতার বদলে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং বাংলার আবহমান ইতিহাস-ঐতিহ্যে বিশ্বাসী। এ-প্রসঙ্গে কবির অভিমত গুরুত্বপূর্ণ:
“কবি হিসেবে সারাজীবন আমি সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করে এসেছি। যখন যে রাজনৈতিক বিশ্বাসে আবর্তিত হয়েছি এবং আপ্লুত হয়েছি, সব অবস্থানে দাঁড়িয়েই আমি নিপীড়ক, শোষক ঔপনিবেশিক আচরণের প্রতিবাদ করেছি।” (২)

কবির এই অবস্থান কাব্যযাত্রার সূচনাকাল থেকে একুশ শতকে এসে আরও বিস্তৃত হয়। বিশেষভাবে ‘সোনালি কাবিনে’ (১৯৭৩) কবি হয়ে ওঠেন বহুমাত্রিক ও শিল্পশিখরস্পর্শী।

‘সোনালি কাবিন’ কবি আল মাহমুদের অসাধারণ সৃষ্টি ও শ্রেষ্ঠ কাব্য। ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩) ও ‘কালের কলস’ (১৯৬৬) প্রকাশের পর কবি বাংলা কবিতায় এক মহৎ কাব্য রচনা করেন। বাংলাদেশের কাব্যে এ-গ্রন্থের স্থান অদ্বিতীয়। ‘সোনালি কাবিনে’র প্রধান প্রবণতা হলো- কবি যুগ্ম-বৈপরীত্যে অঙ্কন করেন ঐতিহ্য ও সমকালীনতা, প্রেম ও বিপ্লব, শস্য ও সংষর্ঘ, ইতিহাস ও বর্তমানতা, ক্লাসিক ও রোমান্টিক ভঙ্গি, লোকজতা ও নাগরিকতা, তৎসম ও আঞ্চলিক শব্দ, ধর্ম ও অবিশ্বাস, আধুনিকতা ও উত্তর-ঔপনিবেশিকতা। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তুমুল তরঙ্গে গণঅভ্যুত্থান থেকে স্বাধীনতা-উত্তর কাল পর্যন্ত সময়পর্বে কবি আসন্ন বিপ্লবের ইশতেহার রচনা করেন। জীবনানন্দ দাশ ও জসীমউদ্দীন থেকে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও কাব্যভাষা নির্মাণে এই কাব্য অনন্য। ‘সোনালি কাবিন’ সম্পর্কে কবির মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ:

জীবনানন্দ দাশ এক অসাধারণ মহৎ কবি প্রতিভা। তাঁর ‘রূপসী বাংলা’ বাংলার রূপ রস গন্ধ ও এক ধ্যানমগ্ন অবস্থারই কাব্যরূপ। এর সংক্রাম তার সমকালের বাংলা ভাষার কবি মাত্রকেই স্পর্শ ও প্রভাবিত করছে। আমাকেও। তবে কবি জীবনানন্দ দাশ তার ব্যক্তিগত মানসিক নিস্পৃহতা ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। সমগ্র কাব্যভাবনাটি এর সমস্ত চিত্ররূপময় সৌন্দর্যকে নিয়েই হয়ে পড়েছে ‘না-বাচক’। আমি ‘সোনালি কাবিনে’ অন্য এক বাংলার চিত্র যা সুদূর অতীতের হয়েও সমকালেও দৃষ্টিগোচর, বয়ন করার চেষ্টা করেছি। আমি প্রেম ও কামের সাথে মেলাতে চেয়েছি আধুনিক জীবনের দাবিকে যা ‘হাঁ-বাচক’।

উত্তরাধিকার বহন করেও কবি স্বাতন্ত্র্যে ও আত্মকৃতিতে আলাদা হয়ে যান স্বভাবতই। প্রাথমিক জীবনের দারিদ্র্য, হতাশা, নিঃসঙ্গতা ও আত্মদ্বন্দ্ব থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে আল মাহমুদ প্রকৃতি, নারী, গার্হস্থ্য জীবন, সমাজচেতনা ও ইতিহাসচেতনায় আশ্রয় খুঁজে পান। কবির এই মুক্তি জীবন, জগৎ ও শিল্পসৌকর্যে সম্পন্ন হয় ‘সোনালি কাবিনে’র মাধ্যমে। অন্যদিকে ‘আধুনিকতাবাদী’ কবি না হয়েও আল মাহমুদ আধুনিক মেজাজ ও প্রকরণে বাংলাদেশকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতালব্ধ অনুভূতিকে অন্তর্লীন করে নিয়েছেন। (চলবে)

* ড. ফজলুল হক তুহিন কবি ও গবেষক, কালজয়ী কবি আল মাহমুদের কবিতা ও কথাসাহিত্য নিয়ে পিএইচডি, শিল্প-সাহিত্যের কাগজ ‘নতুন এক মাত্রা’র নির্বাহী সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *