পাকিস্তানে কারাবন্দী ইমরান খানের দল পিটিআই কোন পথে এগোবে

এশিয়া
শেয়ার করুন

পাকিস্তানের সদ্য সমাপ্ত ১৬তম সাধারণ নির্বাচনের সবচেয়ে চমক হল, এবারে যে বিপুল সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই সমর্থিত প্রার্থী।

কারাবন্দী মি. খানের এই দলটি নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে পারলেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বড় বাধার মুখে পড়েছে। কেননা দেশটির নির্বাচন কমিশন তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে দলটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে, দলটির প্রার্থীরা তাদের দলের নির্বাচনী প্রতীক ব্যাট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। দেশটির সুপ্রিম কোর্টও এই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। দল বাতিল হওয়ার কারণেই মি. খানের সমর্থকরা এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

এরমধ্যে ইমরান খান তিনটি মামলায় কারাবন্দী আছেন। আবার অন্য কোন দলই এককভাবে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তা হল: পিটিআই সামনে কী করতে যাচ্ছে। পাকিস্তান নির্বাচনে এখন কী চলছে, পিটিআই এর সামনে বিকল্প কী।

জোট গঠন একমাত্র উপায়

প্রায় ২৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ পাকিস্তানে গত ৮ই ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়েছে। পাকিস্তান বেশ লম্বা সময় ধরেই অর্থনৈতিক সঙ্কট, রাজনৈতিক বৈরিতা ও জঙ্গি সহিংসতায় জর্জরিত। এমন অবস্থায় কারা সরকার গঠন করবে সেদিকে তাকিয়ে আছে দেশটির সাধারণ মানুষ।

পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের এখন পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক ফলাফল অনুসারে যেহেতু কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, ফলে জোট সরকার গঠনই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পার্লামেন্টে ২৬৬টি আসনের মধ্যে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে ২৬৪টি আসনে। দুটি আসনের ফলাফল অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি – কারণ এর মধ্যে একটি আসনের প্রার্থী গুলিতে নিহত হওয়ায় সেখানে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে এবং আরেকটি আসনের ভোটগ্রহণ শেষ হবে এই মাসের শেষের দিকে।

নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ন্যূনতম ১৩৪টি আসনের প্রয়োজন। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০১টি আসন জিতেছে। এরমধ্যে ৯৩ জনই ইমরান খান ও তার দল পিটিআই সমর্থিত প্রার্থী।
নওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ৭৫টি আসন পেয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছে ৫৪টি আসন। এছাড়া মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট -এমকিউএম ১৭টি, জামিয়তে উলেমা-ই-ইসলাম (জেইউআই-এফ) তিনটি। এবং বাকি আসন বিভিন্ন ছোট দল জিতেছে।

পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সেটা এককভাবে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। কোন দলই এককভাবে সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এক্ষেত্রে দলগুলোর জোট করা ছাড়া সরকার গঠনের আর কোন বিকল্প নেই।

পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বিকল্প কী?

পাকিস্তানের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ইচ্ছা করলে স্বতন্ত্র হিসেবে জাতীয় বা প্রাদেশিক পরিষদে থাকতে পারেন। আবার তাদের রাজনৈতিক দলে যোগদানের ক্ষেত্রে কোন আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে থাকেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকারের মতে, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী কয়েকটি কারণে রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে থাকে। প্রথমত, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে, দ্বিতীয়ত নিজেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করতে এবং সবশেষে পার্লামেন্টে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে।

তবে বিজয়ী হওয়ার পর এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হাতে তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা সময় থাকে যে সময়ের মধ্যে তাদের কোন একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে। এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়মানুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কেবল সেই দলে যোগ দিতে পারবেন যাদের নির্বাচনী প্রতীক ব্যালটে দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে অযোগ্য ঘোষণা করায় কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী এই দলে যোগ দিতে পারবেন না। তাই পিটিআই কে সমর্থন দেয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোন দলে যোগদান করবেন তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিস্ময়কর সাফল্যের ফলে, তারা দুটি প্রধান বিরোধী দল অর্থাৎ নওয়াজ শরীফের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ এবং বিলাওয়াল ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি থেকে যোগদানের প্রস্তাব পাচ্ছেন।

ওই দুই বিরোধী নেতারাও বলেছেন যে তাদের দলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করতে কোনও সমস্যা নেই। এখন এটি দেখার বিষয় পিটিআই এর নাম ও সমর্থন নিয়ে জয়ী হওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ইমরান খানের প্রতি অনুগত থাকেন কিনা। কারণ আইন অনুযায়ী কোন স্বতন্ত্র প্রার্থী পার্লামেন্টে আসন পেলে, দলের নিয়ম মানতে তারা বাধ্য নন।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ফারুক হাসনাত বলেছেন, পিটিআই-এর স্বতন্ত্র সদস্যদের অন্য দলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ এই প্রার্থীরা জানেন যে যদি তারা আনুগত্য পরিবর্তন করেন তবে এর পরিণতি তাদের পূর্বসূরিদের মতোই হবে। তবে ভিন্ন কথা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক রসুল বখশ রইস। তার মতে, পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনেকে বিক্রি হয়ে যেতে পারেন। কেউ কেউ তাদের আনুগত্য পরিবর্তন করতে পারেন।

তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি কোনো দলে যোগ না দেন তাহলে তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই পার্লামেন্টে থাকবেন। এক্ষেত্রে তারা জাতীয় পরিষদে বিরোধী দলীয় নেতার পদ পেতে পারেন। কিন্তু পিটিআই চাইবে না তার সমর্থিত প্রার্থীরা পাঁচ বছর স্বতন্ত্র থাকুক।

সরকার গঠনে এগিয়ে কারা

নির্বাচনের মাঠে পিটিআই এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনে তৎপরতা বেশি নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এন দলের। নির্বাচনের ফল প্রকাশের মধ্যেই লাহোরে দলের প্রধান কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে নওয়াজ শরিফ জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এজন্য তারা অন্যান্য দলের সাথে কথা বলছেন। এর আগে পিএমএল-এন জোট গড়েছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সঙ্গে। তাদের জোট পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) ক্ষমতায় বসেছিল। তবে এখন জোট সরকার গঠনের ব্যাপারে পিপিপিকে সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে।

বিলাওয়াল ভুট্টো বহুবার বলেছেন তার দল নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এন-এ যোগ দেবে না। কেননা বিলাওয়াল সেই প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চান যারা পিএমএল-এন-এর প্রতি অসন্তুষ্ট। তবে শেষ পর্যন্ত পিএমএল-এন এবং পিপিপি একসাথে সরকার গঠন করতে পারে, এমনকি অন্যান্য দলকেও জোটে ভেড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, যেহেতু এ নিয়ে আলোচনা চলছে, তাই যেকোনো কিছুই হতে পারে।

এক্ষেত্রে পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা এমন এক অবস্থায় আছে যেখানে একটি সরকার গঠন করা বেশ কঠিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এক্ষেত্রে পিটিআই এর সামনে দুটি পথ রয়েছে, এক, পিটিআই-পন্থী প্রার্থীরা একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীর আকারে থাকতে পারেন। দুই, তারা চাইলে বিলওয়াল ভুট্টোর দল বা অন্যান্য ছোট দলের সঙ্গে জোট গঠন করতে পারেন।

তবে পাকিস্তানের স্থানীয় গণমাধ্যম জিও নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান গহর আলী খান জানিয়েছেন, তারা পিএমএল-এন বা পিপিপির সঙ্গে জোট গড়বে না। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চাইলে নিজেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে পারবেন, তবে এজন্য তাদের ১৩৪টি আসন থাকতে হবে। তবে রফিউল্লাহ কাকার জানিয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিজেদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করাকে বাস্তবসম্মত মনে করা হয় না, তবে নিয়ে আইনে কোনো বাধা নেই।

এদিকে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশ পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর বড় প্রভাব রয়েছে। সে হিসেবে এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর পছন্দের প্রার্থী নওয়াজ শরীফ পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।

সংরক্ষিত আসন পেতে অযোগ্য, মামলায় কোণঠাসা পিটিআই

পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ৭০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। এই আসনগুলো বিভিন্ন দলকে তাদের শক্তি অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ যে দল যতো বেশি আসনে জয় পাবে তার দল ততো বেশি সংরক্ষিত আসন পাবে। সে হিসেবে মি. শরীফের দল ২০টির বেশি আসন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পাকিস্তানের নির্বাচনী আইনের অধীনে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পার্লামেন্টের ওই ৭০টি সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য নন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় অসুবিধা। এক্ষেত্রে পিটিআই এর সামনে একটি পথ হল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী কোন দলে যোগ দেয়া।

এদিকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁস, দুর্নীতি, বেআইনি বিয়ের মতো অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় ১০ মাস ধরে কারাগারে ইমরান খান। তিনটি মামলায় ২৪ বছর সাজা হয়েছে তার। কারাগারে থাকাকালীন কোন সরকারের অংশ হতে পারবেন না তিনি। এমন পরিস্থিতিতেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফের দল ও বিলাওয়াল ভুট্টোর দলকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ আসনে জয়ী হয়েছেন ইমরান খানের দল পিটিআই–সমর্থিত প্রার্থীরা।

বিশ্লেষকদের অনেকের অভিমত, স্বতন্ত্র এই প্রার্থীরা যদি কোনোভাবে সরকারে থাকেন, তাহলে মি. খানের কারাদণ্ডের সাজা বা তার সরকারি দায়িত্বে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করতে পারবেন। একইসঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইমরান খানের ওপর নিষেধাজ্ঞার যে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নিয়েছে, সেটিকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। – বিবিসি নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *